নিজের বাল্যবিবাহ ঠেকানোর পর শুভসংঘের পক্ষ থেকে ফুলের মালা ও ফুল দিয়ে লামিয়াকে শুভেচ্ছা জানান শুভসংঘের সদস্য ছোঁয়া। ছবি : কালের কণ্ঠ
কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়ে ছিল আগেই। এসএসসি পরীক্ষার ফল ভালো হোক, খারাপ হোক, পরিবারের ঠিক করা পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হবে লামিয়াকে। লামিয়া মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ ৪.২৬ পেয়ে পাস করে। সে সিদ্ধান্ত নেয়, এখনই বিয়ে করবে না।
আরো পড়াশোনা করবে। কিন্তু নিজ পরিবার ও পাত্রপক্ষ তার কথা শুনতে নারাজ। উপায় না দেখে লামিয়া শরণাপন্ন হয় বিবিসির ১০০ অনুপ্রেরণাদায়ী ও প্রভাবশালী নারীর তালিকায় স্থান পাওয়া সানজিদা ইসলাম ছোঁয়ার। অবশেষে কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সদস্য ছোঁয়ার সহযোগিতায় নিজের বিয়ে বন্ধ করে লামিয়া। ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার আচারগাঁও ইউনিয়নের পূর্ব শিবনগর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
সূত্র জানায়, পূর্ব শিবনগর গ্রামের বর্গাচাষি আবুল কাশেম দুই মেয়ে ও এক ছেলে রেখে বছরখানেক আগে মারা যান। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির মৃত্যুতে স্ত্রী ফজিলা খাতুনের চোখে নেমে আসে অন্ধকার। এর মধ্যেই আর্থিক সংকটে তাঁর দুই সন্তানের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। ধারদেনা করে আরেক মেয়ে লামিয়া আক্তারকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করান ফজিলা। ফজিলা খাতুন জানান, অভাবের সংসারে কিভাবে কী করবেন। তাই পরীক্ষা চলার সময়েই তিনি মেয়ের জন্য খোঁজ করতে থাকেন পাত্রের। পেয়েও যান।
আলাপ-আলোচনার এক পর্যায়ে পাত্রপক্ষ থেকে শর্ত জুড়েদেওয়া হয়, মেয়ে পাস করুক আর ফেল করুক, ৫০ হাজার টাকা যৌতুকসহ বিয়ে হবে। শর্ত মেনেই বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করে রাখা হয়।
এরই মধ্যে পরীক্ষার ফল বের হয়। লামিয়া মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ ৪.২৬ পেয়ে পাস করে। সে পরীক্ষায় ভালো করেছে খবর পেয়ে আগে থেকে ঠিক করা বিয়ের তারিখ বদলে আরো দ্রুত সময়ে তার বিয়ের জন্য চাপ দেয় পাত্রপক্ষ। এ মাসেই বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বেঁকে বসে লামিয়া। এখনই বিয়ে করতে চায় না। আরো পড়াশোনা করতে চায় সে। তার কথা কোনোভাবেই মানতে নারাজ পাত্রের পরিবার। এ অবস্থায় বিষয়টি পাশের গ্রামের পূর্বপরিচিত ছোঁয়াকে জানায় লামিয়া। ছোঁয়া ও তাঁর মা লামিয়ার বাড়িতে গিয়ে ফজিলা খাতুন ও পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। ছোঁয়া আশ্বাস দেন যে এ ব্যাপারে লামিয়াকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে। তার পড়ালেখা করতে যা দরকার, তার সব কিছুই করবে শুভসংঘ। পরে লামিয়ার পরিবার ওই বিয়ে বন্ধ করে দেয়।
খবর পেয়ে গতকাল রবিবার বিকেলে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রেনুকে সঙ্গে নিয়ে লামিয়ার বাড়িতে যান ছোঁয়া। এ সময় ছোঁয়ার বাবা, মা, সাংবাদিকসহ এলাকার গণ্যমান্য কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। লামিয়ার সাহসিকতার জন্য তাকে ফুলের মালা দিয়ে শুভেচ্ছা জানান চেয়ারম্যান। শুভসংঘের পক্ষ থেকে একগুচ্ছ গোলাপ উপহার দেন ছোঁয়া। লামিয়া বলে, ‘আমি একা নই। আমার এখন অনেক সাহস বেড়েছে। পড়ালেখা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। আমাকে সাহস দেওয়ার জন্য শুভসংঘকে ধন্যবাদ জানাই। ’