ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শনিবার ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ৫ বৈশাখ ১৪৩৩
সিদ্দিকবাজারে বিস্ফোরণ তিতাসের গ্যাস থেকে
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Friday, 10 March, 2023, 11:49 AM

সিদ্দিকবাজারে বিস্ফোরণ তিতাসের গ্যাস থেকে

সিদ্দিকবাজারে বিস্ফোরণ তিতাসের গ্যাস থেকে

তিতাসের পরিত্যক্ত লাইনের ছিদ্র থেকে বের হওয়া গ্যাস জমে পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজারে ভবনের বেজমেন্টে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের প্রাথমিক অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল বলছে, সিদ্দিকবাজারের কুইন স্যানিটারি মার্কেট হিসেবে পরিচিত সাততলা ওই ভবনের বেজমেন্টে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের একটি পরিত্যক্ত লাইনের অস্তিত্ব তারা পেয়েছে। বেজমেন্টে একসময় রান্নাঘর ছিল, আর নিচতলায় ছিল খাবারের হোটেল। এই রান্নাঘরে তিতাস গ্যাসের বাণিজ্যিক লাইন ছিল। ২০০১ সালে গ্যাস–সংযোগের লাইনটি রাইজার (গ্যাস সরবরাহের সংযোগস্থল) থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। তবে সংযোগ লাইন অপসারণ করা হয়নি। যে কারণে সেটিতে গ্যাসের সরবরাহ ছিল। ওই লাইনের ছিদ্র থেকে বেজমেন্টের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কোনো একটি কক্ষের বদ্ধ কুটুরিতে গ্যাস জমে ছিল। সেখান থেকেই ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে সিটিটিসি মনে করছে।

তবে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হারুনুর রশিদ মোল্লাহ বলেন, বেজমেন্টে বৈধভাবে গ্যাস–সংযোগ থাকার কোনো সুযোগ নেই। সিদ্দিকবাজারের ভবনটিতে এমন কোনো সংযোগ থাকার কথা তাঁর জানা নেই। তিতাসের একটি দল সেখানে কাজ করছে। এমন কিছু হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

যদিও বিস্ফোরণস্থল পরিদর্শন শেষে সিটিটিসির পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, সাততলা ভবনের পেছনের একটি রাইজার থেকে বেজমেন্টের দিকে ২০ মিটারের মতো একটি লাইন রয়েছে। সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) রহমত উল্লাহ চৌধুরী বলেন, বেজমেন্ট শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় এর কক্ষগুলো ছিল আবদ্ধ। বেজমেন্টে পাঁচটি দোকান ছিল। দোকানগুলো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় সেখানে বাইরে থেকে বাতাস চলাচলের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ফলে সেখানে গ্যাস জমা হওয়ার পর কোনোভাবে স্পার্ক (আগুনের স্ফুলিঙ্গ) হওয়ার পরই ভয়াবহ বিস্ফোরণের এ ঘটনা ঘটে।

অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিস বলছে, বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধারকারী দলের কর্মীরা গ্যাসের গন্ধ পান। দ্রুত তাঁরা তিতাস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তিতাসের কর্মীরা এসে ভবনের গ্যাসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

বিস্ফোরণের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্য ও এই সংস্থার ঢাকা বিভাগীয় উপপরিচালক দিনমনি শর্মা বলেন, তিতাসের দুজন কর্মকর্তা এসে যে সংযোগটি বন্ধ করেছেন, সেটি সাত দিন আগে মেরামত করা হয়েছিল। ঘটনার পরদিন (বুধবার) তিতাসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে বলেছিলেন, গ্যাসের গন্ধ পাওয়া যায়নি। কিন্তু গ্যাসের সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ার এক দিন পর সেখানে গ্যাসের গন্ধ না পাওয়াই স্বাভাবিক।

গত মঙ্গলবার বিকেল পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজারের একটি সাততলা ভবনের বেজমেন্ট থেকে দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণে গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ১১টা পর্যন্ত ২৩ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গতকাল দুপুরে ভবনের বেজমেন্টের দক্ষিণ পাশের সিঁড়ির নিচ থেকে মেহেদী হাসান নামে এক ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধার করেছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। রাত সাড়ে আটটার দিকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরাফাত ইয়াসিন নামের আরও একজন। তিনি ভবনে থাকা একটি স্যানিটারি দোকানের কর্মী ছিলেন। বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন শতাধিক ব্যক্তি। এর মধ্যে এখনো চিকিৎসাধীন আছেন ২৩ জন।

বিস্ফোরণের ঘটনায় সাততলা ভবনটির মালিক ওয়াহিদুর রহমান ও মতিউর রহমান এবং ভবনের একটি দোকানের মালিক আবদুল মোতালিব হোসেনকে গত বুধবার আটক করা হয়েছিল। আর গতকাল তাঁদের ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে দুই দিনের জন্য রিমান্ডে নিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ‘ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ’ লেখা ব্যানার টানিয়ে রেখেছে। গতকাল সকালে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে তৃতীয় দিনের মতো উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। মূলত সকালের দিকে বেজমেন্টে জমে থাকা পানি অপসারণের কাজ চলে। এ পর্যন্ত কোনো ভারী যন্ত্র ব্যবহার না করেই উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস।

গতকাল দুপুরের দিকে রাজউকের কর্মকর্তারা ভবনটি পরিদর্শন করে জানান, এ ভবনে ২৪টি কলাম আছে, এর মধ্যে ৯টি কলাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যান্য কলামেও প্রভাবে পড়েছে। ওপরের তলাগুলো যাতে ধসে না পড়ে, সে জন্য রাজউকের তত্ত্বাবধানে গত রাত নয়টা থেকে ভবনের বেজমেন্ট থেকে প্রথম তলার ছাদ পর্যন্ত স্টিলের পাইপ বসানোর কাজ শুরু হয়। প্রতিটি পাইপের ব্যাস ৬ ইঞ্চি এবং উচ্চতা ২০ ফুট। এর আগে সন্ধ্যা সাতটার দিকে দুটি ভ্যানে করে নয়টি পাইপ সেখানে নিয়ে আসেন রাজউকের কর্মকর্তারা। সংস্থাটির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পাইপগুলো দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কলামে সাপোর্ট (ভার বহনের জন্য) দেওয়া হচ্ছে। যাতে ভবনটি ভেঙে না পড়ে।’

গত মঙ্গলবার বিস্ফোরণের পরের দিন বুধবার পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান শেষ করতে পারেননি ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটির বেজমেন্টে উদ্ধার অভিযান চালাতে প্রয়োজন শোরিং (ঠেক দেওয়ার) নামের বিশেষ যন্ত্রের, যা ফায়ার সার্ভিসের কাছে নেই।

তিতাসের কেন্দ্রীয় জরুরি গ্যাস নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে ঢাকা ও আশপাশের এলাকা থেকে প্রতি মাসে গ্রাহকেরা ৫০০ থেকে ৬০০ অভিযোগ করেন। এর মধ্যে পাঁচ শতাধিক গ্যাস লিকেজ–সংক্রান্ত। সরকারের চলমান উন্নয়নকাজের জন্যও বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস বিতরণ লাইনে লিকেজ হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার ঘটনাও বাড়ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে অগ্নিদুর্ঘটনা ২৮১টি এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে অগ্নিদুর্ঘটনা বেড়ে হয়েছে ৩১১টি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিতাসের অবহেলার কারণে লাইনের লিকেজ থেকে একর পর এক বিস্ফোরণ ঘটছে। তিতাসের কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে আড়াই বছরের ব্যবধানে নারায়ণগঞ্জের মসজিদে, ঢাকার মগবাজার, সায়েন্স ল্যাবরেটরি ও সিদ্দিকবাজারের ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছে। অথচ বারবার তিতাস দায় এড়িয়ে যাচ্ছে। গাফিলতিতে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

ফায়ার সার্ভিসের সাবেক পরিচালক (অপারেশনস) অবসরপ্রাপ্ত মেজর শাকিল নেওয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, আবাসিক–বাণিজ্যিক ভবন, গ্যাস–বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়ে তদারকির দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থাগুলো ঠিকমতো কাজ করেছে কি না, সেটি আগে খুঁজে বের করতে হবে। তদারকির কাজে যদি কারও গাফিলতি থাকে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status