প্রকাশ: Monday, 27 March, 2023, 10:16 AM সর্বশেষ আপডেট: Monday, 27 March, 2023, 10:30 AM
র্যাব হেফাজতে নারীর রহস্যজনক মৃত্যু
নওগাঁয় আটকের পর র্যাবের হেফাজতে সুলতানা জেসমিন (৪৫) নামে এক নারীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শহরের মুক্তির মোড় থেকে তাকে আটক করা হয়। গত শুক্রবার সকালে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
সুলতানা নওগাঁ সদর উপজেলার চণ্ডীপুর ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ে অফিস সহকারী পদে চাকরি করতেন। র্যাবের দাবি, প্রতারণার অভিযোগের কারণে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সুলতানা জেসমিনকে আটক করা হয়। আটকের পর অসুস্থ হয়ে তিনি মারা গেছেন। তবে স্বজনদের অভিযোগ, হেফাজতে নির্যাতনের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।
নিহত সুলতানার মামা এবং নওগাঁ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর নাজমুল হক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, তার ভাগিনী বুধবার সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হয়। এরপর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মুক্তির মোড় থেকে একটি সাদা মাইক্রোবাসে র্যাবের লোকজন তাকে ধরে নিয়ে যায়। তবে তাকে র্যাবের কোন ক্যাম্পে নেয়া হয় সে ব্যাপারে তারা কিছুই জানতেন না। দুপুর ১২টার পর জানতে পারেন, সুলতানা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সেখানে গিয়ে তিনি র্যাবের লোকজনকে দেখেন। কিন্তু ভাগিনী তখন কোনো কথা বলতে পারছিল না। কিছুক্ষণ পর তাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার সকালে তার মৃত্যু হয়। তবে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে শনিবার দুপুরের পর।
এ বিষয়ে র্যাব-৫-এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর নাজমুস সাকিব সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সুলতানার বিরুদ্ধে আর্থিক প্রতারণার একটি অভিযোগ পায় র্যাব। তার ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগ ছিল। ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখে র্যাব এর সত্যতা পায়। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে র্যাবের হেফাজতে নেয়া হয়; কিন্তু আটকের পরপরই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। দ্রুত তাকে নওগাঁ সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর চিকিৎসকরা তাকে রাজশাহীতে নেয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু রাজশাহীতে নেয়ার পর তার অবস্থা আরো খারাপ হয়। শুক্রবার রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্ট্রোক করে তিনি মারা যান। আইনি প্রক্রিয়া শেষে শনিবার দুপুরে স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়।
নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মৌমিতা জলিল জানান, বুধবার দুপুরে র্যাবের লোকজন অসুস্থ অবস্থায় এক নারীকে নিয়ে আসেন। জরুরি বিভাগে তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়। প্রাথমিকভাবে ওই রোগী হৃদ্রোগে আক্রান্ত বলে শনাক্ত করা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাজশাহীতে পাঠানো হয়। ওই সময় তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না।
এ দিকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক এফ এম শামীম আহাম্মদ বলেন, তারা যতটুকু জানতে পেরেছেন, র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদের সময় ওই নারী পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পান। তারপর তাকে নওগাঁ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে রাজশাহী মেডিক্যালে আনা হয়। সিটি স্ক্যান করে তারা জানতে পেরেছেন, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে ওই রোগীর মৃত্যু হয়। তার মাথায় ছোট্ট একটি লাল দাগ ছিল। শরীরে অন্য কোথাও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
নিহত সুলতানার ছেলে শাহেদ হোসেন সৈকত সংবাদমাধ্যমকে অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার মা চক্রান্তের শিকার হয়েছেন। র্যাবের হেফাজতে থাকা অবস্থায় তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। যার কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।’
অভিযোগের বিষয়ে র্যাব কর্মকর্তা মেজর নাজমুস সাকিব বলেন, আটকের পর ওই নারীকে র্যাবের কোনো ক্যাম্পে নেয়া হয়নি। আটকের পরপরই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে নেয়ার পর থেকেই তার পরিবারের লোকজন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার সাথেই ছিলেন। নির্যাতনের যে অভিযোগ করা হচ্ছে, সেটি সঠিক নয়।
নিহত সুলতানার মামা নাজমুল হক জানিয়েছেন, ১৭ বছর আগে সুলতানার সাথে তার স্বামীর ছাড়াছাড়ি হয়। এরপর এক সন্তানকে অত্যন্ত কষ্ট করে বড় করছিলেন তিনি। শহরের জনকল্যাণ এলাকায় একটা ভাড়াবাড়িতে থেকে ছেলেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করাচ্ছিলেন। তিনি ভূমি কার্যালয়ের একজন সামান্য কর্মচারী। কোনো দিন তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ কেউ করেননি।