|
করপোরেট প্রতিষ্ঠানের একাধিপত্যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কী হাল?
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() করপোরেট প্রতিষ্ঠানের একাধিপত্যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কী হাল? বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মোট কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা হবে ১২ কোটি ৫৮ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ। এ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করতে এখন থেকেই উদ্যোক্তা তৈরির কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে যারা উদ্যোক্তা হতে চান বা আগে থেকেই ক্ষুদ্র বা মাঝারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তাদের ভাষ্য একপেশে করপোরাটাইজেশনের চাপে নতুন ব্যবসায়ীরা উঠে দাঁড়াতে পারছেন না। শ্যামবাজারের ব্যবসায়ী আবদুস সালাম (৫২) ব্যবসার করপোরেটাইজেশন নিয়ে বলেন, এমন কোনো পণ্য নেই যা বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করছে না। স্বাধীনতার পর থেকে বড় প্রতিষ্ঠান মানে ছিল বড় মাপের পণ্য তৈরির কারখানা। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে এখন নাড়ু-মুড়ি, আচার-মিষ্টান্ন, মশলা-নিমকি থেকে সব ধরনের পণ্য তৈরি হচ্ছে। প্যাকেটজাত এসব পণ্য চলে যাচ্ছে সুপারশপে। এতে যারা ক্ষুদ্র ব্যবসা করে টিকে থাকতো তাদের হয়েছে বেহাল দশা। রাজধানীর উত্তর বাড্ডা এলাকার একজন নারী উদ্যোক্তা শামীমা আফরোজ (৪৩) হস্তশিল্পের নানা ধরনের পণ্য বিক্রি করেন প্রায় ১০ বছর ধরে। কিন্তু এসব হস্তশিল্পও বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পণ্যে পরিণত হওয়ায় শামীমার মতো ব্যবসায়ীরা হয় বাজার ছেড়ে চলে যাচ্ছেন; আর না হলে কোনো রকমের প্রতিযোগিতার দৌড়ে না টেকার মতো করে টিকে আছেন। শুধু ব্যবসায়িক পণ্য না, কৃষি পণ্যের করপোরেটাইজেশন বড় রকমের প্রভাব ফেলেছে বাজারে। অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, অসম করপোরেট প্রতিযোগিতা ও ক্ষমতার দৌড়ে এগিয়ে থাকা কোম্পানির সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটে একদিকে বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন কৃষকরা, অন্যদিকে বাজারের নৈরাজ্যের কবলে পড়ছেন ভোক্তারা। যখন করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতাসীনদের মধ্যে সুসম্পর্কের যোগসাজশে দেশের স্বার্থের বদলে ব্যক্তিস্বার্থকে মুখ্য করে দেখে তখন এ ধরনের প্রতিযোগিতায় বাজারে মোড়ল শ্রেণির উদ্ভব হয় বলে মত অর্থনীতিবিদদের। এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর সময় সংবাদকে বলেন, করপোরেটাইজেশনের ক্ষেত্রে মনোপলি এড়ানো খুব কঠিন। দেশের ভোক্তাপণ্যের বেশ কিছু হাতেগোনা কোম্পানি আছে যারা বিগত কয়েক দশকে অনেক বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এদের নিজস্ব জাহাজ আছে, সেই জাহাজে করে তারা সয়াবিন তেল, চিনি, আটা-ময়দার মতো নিত্যপণ্য আমদানি করে। এসব কোম্পানি হয়তো একবারে ৪০ হাজার টন পণ্য আমদানি করছে, সেখানে এখন মাঝারি মানের ব্যবসায়ী আমদানি করতে পারবেন ৪ হাজার টন। এ অবস্থায় মনোপলি বা অলিগোপলির এ প্রতিযোগিতায় এ মাঝারি মানের ব্যবসায়ীর টিকে থাকা অসম্ভব। এসব ক্ষেত্রে করপোরেট কোম্পানিগুলোর একাধিপত্য পুঁজিবাদী নীতির জায়গা থেকে অনেকটা স্বাভাবিক এবং এ ধরনের একাধিপত্যকে ন্যাচারাল মনোপলি বলা যায়। কেননা একবারে বেশি পণ্য ক্রয় করলে পণ্যের দাম কম পড়ে এবং বাজারে কম দামে পণ্য বিক্রি করা যায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে মার্কেট মনোপলি নিয়ে। যখন করপোরেট কোম্পানিগুলো সংঘবদ্ধভাবে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ায় এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে তখন দেশের মানুষ গোটাকয়েক এসব কোম্পানির হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে বলে জানান এ অর্থনীতিবিদ। শুধু আমদানি করা পণ্য না, অনেকক্ষেত্রে দেশীয় পণ্যে নিজেদের সিন্ডিকেট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়ানো বর্তমান বাজারে নিত্যকার ঘটনায় রূপ নিয়েছে। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকার পর্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বাজারকেন্দ্রিক এ ধরনের মনোপলিতে সরকারের কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারা প্রসঙ্গে আহসান এইচ মনসুর বলেন, বড় বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সরকার যখন সুসম্পর্ক রেখে চলার সিদ্ধান্ত নেয় তখন কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একচেটিয়া মুনাফা তোলে। এতে করে বাজারে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। বাজারে মনোপলি রুখতে ২০১২ সালে সরকার প্রণয়ন করে প্রতিযোগিতা আইন। দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে ব্যবসা-বাণিজ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ উৎসাহিত করবার, নিশ্চিত ও বজায় রাখবার উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্রমূলক যোগসাজশ, মনোপলি ও অলিগোপলি অবস্থা, জোটবদ্ধতা অথবা কর্তৃত্বময় অবস্থানের অপব্যবহার সংক্রান্ত প্রতিযোগিতা বিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ বা নির্মূলের লক্ষ্যে এ আইন প্রণয়ন করা হয়। প্রতিযোগিতা আইন ২০১২ এ বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কোনো পণ্য বা সেবার ক্রয়-বিক্রয়, উৎপাদন, সরবরাহ, বিতরণ এবং ক্ষেত্রমত, পণ্যের গুদামজাতকরণের সংশ্লিষ্ট সব ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য হবে। মূলত যেসব বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান নিজেদের কর্তৃত্বময় অবস্থানের অপব্যবহার করে তাদের বিরুদ্ধে এই আইনের ক্ষমতাবলে ব্যবস্থা নিতে পারবে সরকার। এ ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ারের জায়গা থেকে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রতিযোগিতা কমিশন। তবে প্রতিযোগিতা কমিশন এখন পর্যন্ত বাজারে মনোপলি রুখতে উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি। এ প্রসঙ্গে নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা শিকার করে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য সওদাগর মুস্তাফিজুর রহমান সময় সংবাদকে বলেন, প্রতিযোগিতা কমিশন ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ করতে শুরু করেছে ২০২০ সাল থেকে। সে হিসাবে মাত্র চার বছরের মধ্যে নানা রকমের সীমাবদ্ধতা পাড়ি দিয়ে বাজারে মনোপলি রুখে দেয়া কমিশনের জন্য বেশ কঠিন একটি কাজ। তবে দিনকে দিন কমিশন মনোপলি ও অলিগোপলি রুখতে শক্ত ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছে। পণ্যের দাম নিয়ে ভোক্তা চাইলেই ভোক্তা অধিকারে অভিযোগ জানাতে পারে আবার মান নিয়ে কাজ করছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিএসটিআই। কিন্তু বাজারের মনোপলির সঙ্গে ভোক্তার সরাসরি সম্পর্ক না থাকায় তারা কীভাবে প্রতিযোগিতা কমিশনের কাছে অভিযোগ জানাবে বা কারা প্রতিযোগিতা কমিশনে অভিযোগ করতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে নিয়ম অনুসারে কমিশনের কাছে অভিযোগ জানাতে পারবেন আবার কমিশন নিজেও স্বপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নিতে পারবে। বাজারে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার সুস্থ পরিবেশ সৃষ্টি করতে কমিশন কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে এমন প্রশ্নের জবাবে আহসান এইচ মনসুর বলেন, এটি নির্ভর করে সরকারের সদিচ্ছার ওপরে। সরকার কমিশনকে শক্তিশালী করলে মনোপলি কমে আসবে, কমবে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের দৌরাত্ম্য। আর সরকার যদি করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে দিন দিন শক্তিশালী করে তাহলে কমিশন দুর্বল হয়ে পড়বে। বাজারে পুঁজিবাদি এ প্রতিযোগিতা থেকে বের হয়ে আসার উপায় প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ বলেন, ভারত তাদের কৃষিখাতের করপোরেটাইজশনে মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অনুসরণ করে, বাংলাদেশ চাইলে সেটি ব্যবহার করতে পারে। অন্যদিকে সবাই চীনের অর্থনীতিকে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি মনে করলেও এই মূলত মিশ্র অর্থনীতি। বাংলাদেশ এ ধরনের অর্থনীতিকে নিজেদের মতো করে অনুসরণ করলেও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর একপেশে মনোপলি থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
