|
ইরানের এখনো হাজার হাজার মিসাইল অক্ষত; যেকোনো সময় মেরামত করতে পারবে লঞ্চার: গোয়েন্দা রিপোর্ট
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() ইরানের এখনো হাজার হাজার মিসাইল অক্ষত; যেকোনো সময় মেরামত করতে পারবে লঞ্চার: গোয়েন্দা রিপোর্ট মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের সাথে পরিচিত কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের অস্ত্রাগারে এখনো হাজার হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে যা তারা ভূগর্ভস্থ সংরক্ষিত এলাকা থেকে লঞ্চারগুলো উদ্ধার করে ব্যবহার করতে পারে। এই মূল্যায়নটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্র একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার জন্য কাজ করছে যা হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করবে এবং ইরান, মার্কিন সৈন্য ও এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোকে পরবর্তী হামলা থেকে রক্ষা করবে। কিছু মার্কিন কর্মকর্তা আশঙ্কা করেছেন, ইরান লড়াইয়ের এই বিরতিকে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার পুনর্গঠনে ব্যবহার করতে পারে। প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এই সপ্তাহে সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি 'কার্যত ধ্বংস' হয়ে গেছে এবং তাদের লঞ্চার ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো 'ক্ষয়প্রাপ্ত, ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং প্রায় সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়'। তবে মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো যে চিত্র ফুটিয়ে তুলছে তা ইঙ্গিত দেয় যে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর কিছু অংশ পুনর্গঠন করতে পারে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের অর্ধেকেরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ধ্বংস, ক্ষতিগ্রস্ত বা ভূগর্ভস্থ এলাকায় আটকা পড়েছে, তবে কর্মকর্তাদের মতে অবশিষ্ট থাকা অনেক লঞ্চার মেরামত করা যেতে পারে বা ভূগর্ভস্থ কমপ্লেক্স থেকে খুঁড়ে বের করা হতে পারে। মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, সংঘাতের ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে, তবুও তাদের কাছে হাজার হাজার মাঝারি এবং স্বল্প-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে যা লুকানো জায়গা থেকে বের করা বা ভূগর্ভস্থ সাইট থেকে উদ্ধার করা সম্ভব। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধের শুরুতে ইরানের যত একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন ছিল, এখন তার ৫০ শতাংশেরও কম অবশিষ্ট আছে। সংঘাতে অনেক ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তেহরানের অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে প্রয়োজনে ইরান রাশিয়া থেকে অনুরূপ প্রযুক্তি বা অস্ত্র সংগ্রহ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে বলেও তারা জানান। মার্কিন কর্মকর্তারা আরও বলন, ইরানের কাছে এখনো অল্প পরিমাণ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে—যা আলোচনা ভেঙে গেলে পারস্য উপসাগরে জাহাজ লক্ষ্য করে বা দ্বীপ দখল করতে যাওয়া মার্কিন সৈন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের পলিসি বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং সিআইএ-র সাবেক বিশ্লেষক কেনেথ পোলাক বলেন, 'ইরানিরা তাদের বাহিনীকে দ্রুত উদ্ভাবন এবং পুনর্গঠন করার অসাধারণ ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। তারা ইসরায়েলিদের বাদে অন্য বেশিরভাগ মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক বাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ।' মার্কিন বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন না যে ইরানের সামরিক বাহিনী শীঘ্রই যুদ্ধের আগের ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের সংখ্যায় ফিরে আসবে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পকে আঘাত করার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু ইরান একটি দৃঢ় প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে এবং কিছু মার্কিন সরকারি বিশ্লেষক মনে করেন ইরান এখনো তাদের কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার মাঠে নামাতে পারে। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধে ইরানের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার অকেজো হয়ে গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ভূগর্ভে আটকে পড়া অনেক লঞ্চার ইরানিরা উদ্ধার করতে পারে বলেও তারা মনে করেন। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা আরও বলেন, যুদ্ধের শুরুতে ইরানের আনুমানিক আড়াই হাজার মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, যার মধ্যে এক হাজারটিরও বেশি এখনো তাদের কাছে রয়েছে। বাকিগুলো হয় নিক্ষেপ করা হয়েছে অথবা ধ্বংস করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর তদারকিকারী ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের একজন মুখপাত্র মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছেন এবং মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান অভিযানের পরিধি সম্পর্কে শীর্ষ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বিবৃতির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। গত বুধবার জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেন, হামলাগুলো ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প ভিত্তিকে চুরমার করে দিয়েছে। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ১৩হাজারেরও বেশি গোলাবারুদ নিক্ষেপ করেছে, যা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণের স্থান, নৌবাহিনী এবং দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পে আঘাত হেনেছে 'যাতে ইরান তাদের সীমান্তের বাইরে শক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা পুনর্গঠন করতে না পারে'। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী তার সমস্ত লক্ষ্য অর্জন করেছে। কেলি বলেন, 'এই গভীর সামরিক সাফল্য ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স, বিশেষ দূত উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারকে সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে আলোচনার সুযোগ করে দিয়েছে যাতে মার্কিন সৈন্য এবং আমাদের জন্মভূমির বিরুদ্ধে এই হুমকিগুলো চিরতরে শেষ করা যায়।' তিনি আরও বলেন, 'ভাইস প্রেসিডেন্ট আজ সকালে যেমনটি বলেছেন, ইরানিরা যদি সদিচ্ছার সাথে কাজ করতে ইচ্ছুক হয় তবে তিনি একটি ইতিবাচক আলোচনার ব্যাপারে আশাবাদী।' স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার মার্কিন দূত হিসেবে শনিবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ইরানের সাথে আলোচনার জন্য ভ্যান্সের সাথে যোগ দিচ্ছেন। ইরান, যুদ্ধের আগে যাদের বিমান বাহিনী দুর্বল ছিল, তারা দীর্ঘকাল ধরে শত্রুদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শন এবং হামলা রোধ করতে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের ওপর নির্ভর করে আসছে। ১৯৯১ সালে ইরাকের সাথে যুদ্ধে শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র খুঁজে বের করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল কারণ ইরাকিদের ব্যবহৃত অনেক স্কাড ক্ষেপণাস্ত্র ছিল মোবাইল বা ভ্রাম্যমাণ। ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ব্রিটিশ মিত্ররা ইরাকে বিশেষ বাহিনীর দল পাঠিয়েছিল এবং তারা কেবল বিমান হামলার ওপর নির্ভর করেনি। কিন্তু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলি আক্রমণগুলো পুরোপুরি আকাশপথ থেকে চালানো হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলেছিল কারণ ইরানের অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি পাহাড়ের গভীরে নির্মিত ছিল। ইসরায়েল মূলত বিমান হামলার মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার বের হওয়ার সুড়ঙ্গগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করেছে, তবে ঘাঁটিগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করা কঠিন ছিল বলে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানান। যদিও ইসরায়েল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ক্ষমতা শূন্যে নামিয়ে আনতে পারেনি, তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধের বেশিরভাগ সময় তাদের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ক্ষমতা দৈনিক ১০ থেকে ১৫টিতে নামিয়ে আনা একটি বড় অর্জন ছিল, যেখানে যুদ্ধের শুরুতে তারা দৈনিক ডজন ডজন ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করত। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলেন, ইরান বর্তমানে আর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারছে না এবং তেহরান তাদের কর্মসূচি কত দ্রুত পুনর্গঠন করবে তা নির্ভর করবে তারা রাশিয়া বা চীন থেকে কী ধরনের সাহায্য পায় তার ওপর। ইরানের ভবিষ্যৎ সামরিক সক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করা কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর নতুন হামলার হুমকির ওপরই নির্ভর করবে না, বরং নিষেধাজ্ঞা এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ওপরও নির্ভর করবে। সংঘাত অবসানের জন্য ইরানের অন্যতম দাবি হলো সমস্ত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা। এসব নিষেধাজ্ঞা ইরানের সাথে ব্যবসা করা দেশগুলোর ওপর শাস্তি স্বরূপ আরোপ করা হয়েছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জন অল্টারম্যান বলেন, 'এই পরিস্থিতি থেকে বড় যে শিক্ষা পাওয়া যায় তা হলো—ইরান তাদের আগের সামর্থ্যের সামান্য অংশ নিয়েও উপসাগরীয় অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে প্রধান ভূমিকা রাখতে পারে।' তিনি বলেন, 'তাদের একটি বড় সুবিধা হলো—প্রতিদিন তারা যদি না হারে, তাহলে সেটাই তাদের জয়। আর প্রতিদিন আমরা যদি জিততে না পারি, তাহলে সেটাই আমাদের পরাজয়।'
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
