অনেক খেলোয়াড় মনে করেন, মোজার পেছনের দিকে ফুটো করলে পেশির ওপর চাপ কমে যায়। এর ফলে ওই অংশে রক্ত চলাচল বাড়ে এবং পেশিতে টান লাগা বা চোট পাওয়ার ঝুঁকি কমে।
এবারের বিশ্বকাপে কী একটা যেন অন্যরকম! গোল, নাটকীয়তা বা রোমাঞ্চকর গল্পের কথা হচ্ছে না—এগুলোর কোনো কমতি নেই। বরং, একটু খেয়াল করলে দেখবেন, ফুটবলারদের মোজাগুলোর দফারফা অবস্থা। মোজাভর্তি শুধু ফুটো আর ফুটো!
মোজা কেটে ফুটো করার এই চল নতুন কিছু নয় (কমপক্ষে আট বছর ধরে এটি চলে আসছে)। তবে এটি যে সাময়িক কোনো ট্রেন্ড বা হুজুগ নয়, শুক্রবার অস্ট্রেলিয়া বনাম যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচটি দেখলেই তা বোঝা যায়। ওই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার অনেক খেলোয়াড়ই কাঁচি দিয়ে নিজেদের মোজা কেটে মাঠে নেমেছেন।
কিন্তু তারা এমনটা কেন করেন? আর এর আদৌ কোনো সুবিধা আছে কি?
কেন মোজায় ফুটো করেন খেলোয়াড়েরা? এর মূল কারণ হলো—আরাম। আধুনিক ফুটবলের মোজাগুলো সাধারণত পলিয়েস্টার দিয়ে তৈরি হয়। এর সুবিধা হলো, এটি নিজের আকৃতি ধরে রাখে এবং বেশি পানি শুষে নেয় না। কিন্তু সমস্যা হলো, এই মোজাগুলো অনেক সময় অতিরিক্ত আঁটসাঁট বা টাইট হয়ে থাকে, যা পায়ে চাপ সৃষ্টি করে। অনেক খেলোয়াড় মনে করেন, মোজার পেছনের দিকে ফুটো করলে পেশির ওপর চাপ কমে যায়। এর ফলে ওই অংশে রক্ত চলাচল বাড়ে এবং পেশিতে টান লাগা বা চোট পাওয়ার ঝুঁকি কমে। তারা মনে করেন, এই স্বস্তি তাদের মাঠে আরও স্বাধীনভাবে দৌড়াতে এবং ভালো পারফর্ম করতে সাহায্য করে। এটা গেল 'অঘোষিত' বৈজ্ঞানিক কারণ। এর বাইরে, নিজের একটা আলাদা স্টাইল বা ব্যক্তিসত্তা প্রকাশের বিষয়টিও রয়েছে, যা থেকে খেলোয়াড়েরা একধরনের মানসিক স্বস্তিও পান। ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেডের সাবেক স্ট্রাইকার ফ্র্যাঙ্ক নওবল ২০২৩ সালে দ্য অ্যাথলেটিককে বলেছিলেন, 'মাঠে আসল বিষয় হলো, নিজেকে যতটা সম্ভব আরামদায়ক অবস্থায় রাখা। আপনাকে দেখতে ভালো দেখায়, আপনার মন ভালো থাকে, আর আপনি খেলাটাও ভালো খেলেন।' অন্যান্য খেলাতেও এমন উদাহরণ রয়েছে। যেমন, ক্রিকেটে ফাস্ট বোলাররা অনেক সময় তাদের বুটের সামনের দিকটা ফুটো করে নেন, যাতে পায়ের আঙুল বেরিয়ে থাকতে পারে। বল করার সময় যখন পায়ের পাতা জোরে মাটিতে পড়ে, তখন বুটের সঙ্গে আঙুলের ঘষা এড়াতেই তারা এমনটা করেন। তবে ফুটবলের মতো এত ব্যাপকভাবে অন্য কোনো খেলায় এমনটা দেখা যায় না।
কী বলছেন চিকিৎসকেরা? 'থ্রি-সিবি পারফরম্যান্স'-এর ডা. রাজ ব্রার ২০২৩ সালে টিফো ফুটবলকে বলেছিলেন, চোট এড়ানোর জন্য মোজায় ফুটো করার পক্ষে চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো প্রমাণ নেই। তিনি বলেন, 'চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, পায়ের পেশিতে চাপ কমানোর উপায় মোজা কাটার একদম বিপরীত। বরং খেলার মাঝে পেশি রিকভারির (বিশ্রামের মাধ্যমে সতেজ করা) জন্য আরও বেশি চাপের কমপ্রেশন মোজা ব্যবহার করা উচিত।'
তিনি আরও বলেন, 'এতে রক্ত চলাচল বাড়ে এবং মোজার চাপের ওপর ভিত্তি করে পেশির ফোলাভাব কমে। তা ছাড়া, ফুটবলাররা মাঠে এতটাই দৌড়াদৌড়ি করেন যে তাদের পায়ে রক্ত চলাচল বা পেশি ফুলে যাওয়া নিয়ে চিন্তা করার কোনো দরকার নেই।'
ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হামেলের সাবেক সিইও অ্যালান ভাদ নিলসেন বলেন, 'কিছু ব্র্যান্ড তাদের লোগো আরও স্পষ্ট করে দেখানোর জন্য মোজাগুলো খুব টাইট করে বোনে। এর ফলে কিছু খেলোয়াড়ের কাছে তা অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু পলিপ্রোপাইলিনের মতো আরও উন্নত উপকরণ এখন আরাম ও স্থায়িত্ব দিচ্ছে।'
তিনি জানান, নতুন প্রযুক্তির কারণে এখন মোজার গোড়ালির অংশে ভালো কুশনিং এবং এমন কমপ্রেশন জোন থাকে, যা রক্ত চলাচল বাড়ায়, চোটের ঝুঁকি কমায় এবং পারফরম্যান্স ভালো করে। এ ছাড়া পায়ের পাতা ঠান্ডা ও শুষ্ক রাখতে এখন মোজায় জালের মতো 'মেশ ইনসার্ট'ও ব্যবহার করা হচ্ছে।
সন্দেহবাদীদের মত
অনেকেই আবার এই মোজা কাটার বিরোধিতা করেন। ইংল্যান্ড ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক ডিফেন্ডার গ্যারি নেভিল ২০২৪ সালে তার 'স্টিক টু ফুটবল' পডকাস্টে খেলোয়াড়দের মোজা কাটার প্রয়োজন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, 'তাদের কাছে প্রায় ৪০০ জোড়া বুট থাকে এবং তাদের সবকিছুই মাপমতো তৈরি করা হয়। আমি এটা মানতে নারাজ যে নাইকি বা কিট স্পনসররা তাদের একটু বড় মাপের মোজা বানিয়ে দিতে পারে না।'