|
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সবুজায়ন পরিকল্পনা
রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরী
|
![]() প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সবুজায়ন পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ৯ জুলাই বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিশ্ব পরিবেশ দিবস, পরিবেশ মেলা, জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা- ২০২৬ উদ্বোধন করেন। এ বছর জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলার প্রতিপাদ্য বিষয়— 'বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।' প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশকে একটি ‘সবুজ বসতি' হিসেবে গড়ে তুলতে সবার সহযোগিতা কামনা করে বলেন, বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণকে আমাদের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। সবাই মিলে কাজ করলেই আমরা সবুজ, স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ বসতি গড়ে তুলতে পারব। তিনি মন্তব্য করেন, এই পরিবেশ মেলা বা বৃক্ষমেলার আয়োজন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুন্দর ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য একটি নিরাপদ বিনিয়োগ। এই আয়োজন কেবল একটি বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত হবে না। তিনি সবুজায়নে সরকারের নেওয়া উদ্যোগের কথা তুলে ধরে বলেন, সবুজের সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারিভাবেও আমরা অনেক উদ্যোগ নিয়েছি। সরকার গঠনের পর প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে 'গ্রিন ভলান্টিয়ারিজম' চালুর পদক্ষেপ নিয়েছি। কিছুদিন আগে দেশের স্কুলগুলোতে একটি কর্মসূচির আওতায় একসঙ্গে প্রায় ৯০ হাজার গাছ লাগানো হয়েছে। একই সঙ্গে ক্লাইমেট ইউথ ফেলোশিপ চালু এবং এনভায়রনমেন্ট স্টার্ট-আপ ফান্ডসহ বেশ কিছু উদ্যোগ আমরা নিয়েছি। এই উদ্যোগগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে অবশ্যই আমরা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও সবুজ বাংলাদেশ গঠনে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ। বস্তুত, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যবহ। গবেষকদের মতে, বৃক্ষরোপণ নিছক পরিবেশবান্ধব একটি কর্মসূচি নয়; বরং তা জলবায়ু অভিযোজন, জনস্বাস্থ্য, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনীতির জন্য কার্যকর একটি বিনিয়োগ। এটা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না, মানুষ ও প্রকৃতি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আল্লাহতায়ালা এই পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করে সৃষ্টি করেছেন। আর এই পৃথিবীকে সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখার অন্যতম মাধ্যম বৃক্ষ। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ যখন আমাদের গ্রাস করছে, তখন ধর্ম ও বিজ্ঞান উভয়ের দৃষ্টিতেই বৃক্ষ হচ্ছে মানুষ ও গোটা প্রাণীজগতের পরম বন্ধু। বৃক্ষরোপণ শুধু পরিবেশ রক্ষার কাজ না, ইসলামের দৃষ্টিতে এটি একটি ইবাদতও। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনের বহু জায়গায় গাছ, ফল, বাগান ও প্রকৃতির কথা বলেছেন। আল্লাহ বলেন: 'আমিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি। অতঃপর তা দ্বারা উৎপন্ন করি সর্বপ্রকার উদ্ভিদ। তা থেকে বের করি সবুজ ফসল, যা থেকে বের করি ঘন সন্নিবিষ্ট শস্য। আর খেজুরের কাঁদি থেকে বের করি ঝুলন্ত থোকা।' সূরা আনআম: ৯৯। এখানে আল্লাহ মানুষকে চিন্তা করতে বলেছেন। গাছের প্রতিটি পাতা, ফল, শিকড় আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন। আর তিনি পৃথিবীকে স্থাপন করেছেন সৃষ্টজীবের জন্য। এতে আছে ফল এবং খোসাযুক্ত খেজুর। আর আছে খোসাযুক্ত শস্য ও সুগন্ধি ফুল। সূরা আর- রহমান: ১০-১২। আল্লাহ পৃথিবীকে ভারসাম্যের সঙ্গে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের কাজ হলো সেই ভারসাম্য রক্ষা করা। গাছ কেটে ভারসাম্য নষ্ট করা আল্লাহর নাফরমানি। পবিত্র কোরআনে জান্নাতকে 'তাহতাহাল আনহার'- নদীর নিচ দিয়ে প্রবাহিত এবং 'জান্নাতুন নাঈম — নেয়ামতপূর্ণ বাগান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে আছে কলা, ডালিম, ছায়া দানকারী গাছ। এর মাধ্যমে বোঝা যায় আল্লাহর কাছে সবুজ ও বৃক্ষ কত প্রিয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু কথায় না, কাজেও বৃক্ষরোপণে উৎসাহ দিয়েছেন। বৃক্ষরোপণকে তিনি সাদাকায়ে জারিয়া বলেছেন। রাসূল (সা.) বলেছেন: যদি কোনো মুসলিম একটি গাছ লাগায় অথবা কোনো ফসল বপন করে, আর তা থেকে মানুষ, পাখি বা পশু খায়, তবে তা তার জন্য সাদাকা হিসেবে গণ্য হবে।' সহিহ বুখারি: ২৩২০, সহিহ মুসলিম: ১৫৩। অর্থাৎ আপনি গাছ লাগিয়ে মারা গেলেও কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ পাখি-পশু সেই গাছের ছায়া, ফল খাবে, আপনি সওয়াব পেতেই থাকবেন। রাসূল (সা.) বলেন: 'যদি কিয়ামত সংঘটিত হয় আর তোমাদের কারো হাতে একটি চারাগাছ থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে দেয়।' মুসনাদে আহমাদ: ১২৯৮১। এই হাদিস থেকে বোঝা যায় পরিবেশের জন্য বৃক্ষ কত জরুরি। শেষ সময়েও আশা ছাড়তে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূল (সা.) যুদ্ধের সময়ও সৈন্যদের নির্দেশ দিতেন: 'গাছ কেটো না, ফসলের ক্ষেত নষ্ট করো না।'- মুয়াত্তা মালিক। ইসলামে বিনা প্রয়োজনে একটি গাছের ডাল ভাঙাও অপছন্দনীয়। ১৪০০ বছর আগে কোরআন-হাদিস যা বলেছে, আধুনিক বিজ্ঞান আজ তা অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ করছে। জলবায়ু পরিবর্তন রোধ: বৃক্ষ কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন ত্যাগ করে। জাতিসংঘের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণতা সহনশীল রাখতে বৃক্ষরোপণ সবচেয়ে সাশ্রয়ী সমাধান। বায়ুদূষণ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: বৃক্ষ বাতাসের ধুলা, সালফার ডাই অক্সাইডসহ ক্ষতিকর বিভিন্ন পদার্থ শোষণ করে। শহরে ১০% গাছ বাড়লে তাপমাত্রা ১- ২ক্কঈ কমে যায়। একে টৎনধহ ঈড়ড়ষরহম উভভবপঃ বলে। পানি চক্র ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ: বৃক্ষের শিকড় বৃষ্টির পানি ধরে রাখে। এক হেক্টর বন প্রতি বছর ১০০ ঘনমিটার পানি ভূগর্ভে পাঠায়। এতে বন্যা ও খরা দুটোই কমে। বাংলাদেশের মতো নদীপ্রধান দেশে নদীভাঙন রোধে নদীর পাড়ে গাছ লাগানো অপরিহার্য। জীববৈচিত্র্য ও খাদ্য নিরাপত্তা: পৃথিবীর ৮০% প্রাণী বনের ওপর নির্ভরশীল। ফলদ গাছ খাদ্য নিরাপত্তা দেয়। ঔষধি গাছ থেকে ৫০% এর বেশি আধুনিক ওষুধ তৈরি হয়। মানসিক স্বাস্থ্য গবেষণায় দেখা গেছে, সবুজ দেখলে মানুষের স্ট্রেস হরমোন ২০% কমে। হাসপাতালের জানালার পাশে গাছ থাকলে রোগী দ্রুত সুস্থ হয়। বৃক্ষরোপণ প্রশ্নে ইসলাম ও বিজ্ঞানে সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। কোরআন-হাদিস ও বিজ্ঞান উভয়ের উদ্দেশ্য আল্লাহর সৃষ্টির হেফাজত, সাদাকা পরিবেশ ও মানব কল্যাণ পদ্ধতি, বিনা প্রয়োজনে গাছ না কাটা পরিবেশ রক্ষা, আখিরাতে সওয়াব, অক্সিজেন, ছায়া, আমানত রক্ষা। ইসলাম বলে 'খলিফা' হিসেবে পৃথিবীর দায়িত্ব আমাদের। বিজ্ঞান বলে পরিবেশ রক্ষা আমাদের কর্তব্য। দুটোই একই কথা বলছে। বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা শীর্ষ ৭টি দেশের একটি। উপকূলীয় অঞ্চল: ম্যানগ্রোভ বন যেমন সুন্দরবন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রাকৃতিক বর্ম। ১ কিমি ম্যানগ্রোভ ঢেউয়ের উচ্চতা ৫০% কমিয়ে দেয়। ঢাকা শহরে গাছের পরিমাণ ৮% এর নিচে। ফলে হিটওয়েভ ও বায়ুদূষণ বাড়ছে। ছাদ বাগান ও রাস্তার পাশে গাছ লাগানো জরুরি। বাড়ির আঙিনায় ফলদ ও ঔষধি গাছ লাগালে পুষ্টি ও আয় দুটোই হবে। সরকারের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও এই প্রয়োজন থেকেই এসেছে। আমরা কীভাবে বৃক্ষরোপণকে ইবাদত বানাতে পারি? নিয়ত ঠিক করা: গাছ লাগানোর আগে নিয়ত করবো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানুষের উপকারের জন্য লাগাচ্ছি। উপযুক্ত গাছ বাছাই: যে এলাকায় যে গাছ হয়। ফলদ: আম, জাম, কাঁঠাল। ছায়া: বট, পাকুড়। ঔষধি: নিম, অর্জুন। পরিচর্যা করা: শুধু লাগালেই হবে না। ৩ বছর যত্ন নিতে হবে। পানি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার করা। অপচয় রোধ: কাগজ, কাঠ অপচয় না করা। একটা গাছ বাঁচানো মানে ১০ কাগজ বাঁচানো। সামাজিক উদ্যোগ: মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুলে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। প্রতিটি সন্তান জন্মে ১টি করে গাছ। রাসূল (সা.) এর সুন্নত: তিনি মদিনায় নিজ হাতে খেজুর গাছ লাগিয়েছেন। সাহাবিরাও বাগান করতেন। পবিত্র কোরআন আমাদের প্রকৃতিকে নিদর্শন বলেছে। হাদিস বৃক্ষরোপণকে সাদাকা বলেছে। আর বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে এটি ছাড়া মানব সভ্যতা টিকবে না। তাহলে বৃক্ষরোপণ কি শুধু সরকারের কাজ? না। এটি প্রত্যেক মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব। একটি বৃক্ষরোপণ মানে একটি অক্সিজেন কারখানা স্থাপন, একটি পাখির নীড় তৈরি, একটি সাদাকায়ে জারিয়ার দরজা খোলা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সম্পদ রেখে যাওয়া। আসুন, আমরা প্রধানমন্ত্রীর আহবানে সাড়া দিয়ে বৃক্ষরোপণ ও তা পরিচর্যায় আন্তরিক হই। প্রত্যেকে বছরে অন্তত ৩টি করে বৃক্ষরোপণ করি। নিজের জন্য, সন্তানের জন্য এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রকৃতির খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালনের তাওফিক দিন। আমিন। লেখক: রাজনীতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠক। সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বিএনপি। সাবেক সভাপতি, জাতীয়তাবাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থা— জাসাস
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
