|
সীতাকুণ্ডে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু: নিরাপত্তা গাফিলতিকে দায়ী করে ইয়ার্ড মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার সুপারিশ
নতুন সময় প্রতিনিধি
|
![]() সীতাকুণ্ডে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু: নিরাপত্তা গাফিলতিকে দায়ী করে ইয়ার্ড মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার সুপারিশ ওই ঘটনায় ‘দ্য শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস-২০১১’ অনুযায়ী ইয়ার্ড মালিকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংক ছিদ্র করার সময় শ্রমিকরা গ্যাস মাস্ক বা স্বয়ংসম্পূর্ণ শ্বাসযন্ত্র (এসসিবিএ) ব্যবহার করেননি। ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি চলছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিনে; ওই সময় ঘটনাস্থলে সেফটি ম্যানেজার, অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক বা জরুরি উদ্ধারকারী দলও উপস্থিত ছিল না। গত ১৪ অগাস্ট সীতাকুণ্ডের ওই ইয়ার্ডে ‘এমটি রাসি’ নামের একটি স্ক্র্যাপ জাহাজের ব্যালস্ট ট্যাংক ছিদ্র করার সময় বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড (H2S) গ্যাস নির্গত হয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই ৯ জন এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে অক্সিজেন সরবরাহের গাড়ির একজন হেলপারও (বহিরাগত) ছিলেন। এ ঘটনার পর শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজীকে আহ্বায়ক করে ১১ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সরেজমিন পরিদর্শন, সাক্ষ্যগ্রহণ ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ শেষে সম্প্রতি কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। সোমবার (৩১ অগাস্ট) দুপুরে শিল্প মন্ত্রণালয়ে ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করে শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ফেরদৌস স্টিলের ওই ঘটনায় কারও গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলা থাকলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষাক্ত গ্যাস কোথা থেকে এল জাহাজের ভারসাম্য রক্ষার জন্য ব্যালাস্ট ট্যাংকে পানি জমিয়ে রাখতে হয়। নৌযান চলাচলের নিয়ম অনুসারে একটি আন্তর্জাতিক সীমা থেকে অন্য একটি আন্তর্জাতিক নৌ সীমায় প্রবেশ করতে হলে জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংকের পানি পাল্টে ‘নতুন ব্যালাস্ট ওয়াটার’ নিতে হয়। ‘এমটি রাসি’ নামের প্রায় ৩০ হাজার ৭৭০ টন ওজনের জাহাজটি গত বছরের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারি ইউনিয়নের ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ভাঙার জন্য নিয়ে আসা হয়। ভাঙার জন্য তীরে ভেড়ানোর সময় জাহাজটির চারটি ব্যালাস্ট ট্যাংকই ছিল পানিতে পূর্ণ। জাহাজটি ভাঙার কাজ প্রায় শেষ দিকে হওয়ায় একে একে ব্যালাস্ট ট্যাংকগুলো কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই জাহাজের চারটি ব্যালাস্ট ট্যাংকের মধ্যে একটি আগে কাটা হয়েছিল। দ্বিতীয়টি কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়ে শ্রমিকদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, জাহাজের ব্যালস্ট ট্যাংকের তলায় দীর্ঘদিন ধরে সামুদ্রিক পানি জমে ছিল। ওই পানির সঙ্গে কাদা, তলানি ও জৈব পদার্থও জমে ছিল। দীর্ঘদিন পানি স্থির থাকায় ধীরে ধীরে সেখানে অক্সিজেন কমে যায়। অক্সিজেন কমে যাওয়া এই পরিবেশে তলানিতে থাকা জীবাণু জৈব পদার্থ ভাঙার সময় বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস তৈরি করে। ১৪ অগাস্ট ট্যাংকের তলায় ছিদ্র করে পানি বের করার সময় জমে থাকা সেই গ্যাসও পানির সঙ্গে বেরিয়ে আসে। ট্যাংকের মুখের কাছে গ্যাসের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। সেখানে থাকা শ্রমিকরা অল্প সময়ের মধ্যেই বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। পরে তাদের মৃত্যু হয়। গাফিলতির চিত্র তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে। সেদিন ইয়ার্ডের নিয়মিত কাটিং কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও পরদিনের কাজের প্রস্তুতি হিসেবে ট্যাংক ছিদ্র করার ‘রুটিন’ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়নি। ছুটির দিনে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ চললেও ইয়ার্ডে সেফটি ম্যানেজার, অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক বা জরুরি উদ্ধারকারী দল ছিল না। দুর্ঘটনার সময় শ্রমিকদের গ্যাস মাস্ক বা সেলফ-কন্টেইন্ড ব্রিদিং অ্যাপারেটাস (এসসিবিএ) দেওয়া হয়নি। এমনকি উদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া শ্রমিকদেরও পর্যাপ্ত এসসিবিএ ছাড়াই ঘটনাস্থলে প্রবেশ করতে দেখা যায়। এতে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে থাকতে পারে বলে কমিটির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়ার্ডের পিপিই স্টোরে সাধারণ নিরাপত্তা সরঞ্জাম মজুদ থাকলেও উচ্চঝুঁকির কাজে সেগুলো যথাযথভাবে সরবরাহ ও ব্যবহার করা হয়নি। এ ছাড়া দুর্ঘটনার খবর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে জানাতেও বিলম্ব হয়েছিল বলে তদন্ত কমিটির কাছে তাদের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। ইয়ার্ডে নতুন এনভিআর ভিত্তিক সিসিটিভি ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ চললেও সেটি তখনও কার্যকর হয়নি। ফলে দুর্ঘটনার কোনো সিসিটিভি ভিডিও পাওয়া যায়নি। শ্রমিকের তালিকায় গরমিল দুর্ঘটনার দিন ইয়ার্ডে কর্মরত শ্রমিকদের তালিকার সঙ্গে বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ডে জমা দেওয়া অনুমোদিত তালিকার উল্লেখযোগ্য গরমিল পেয়েছে তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত মূল পাঁচ শ্রমিকের মধ্যে একজন ছাড়া অন্যদের নাম অনুমোদিত জনবল তালিকায় ছিল না। এ ছাড়া দুর্ঘটনার দিনের প্রকৃত হাজিরা শিটও তদন্ত কমিটির কাছে দেখাতে পারেনি ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, দুর্ঘটনার পর বহিরাগত শ্রমিকদের নথিপত্র নষ্ট হয়ে যায়। কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ট্যাংক ছিদ্র করার সিদ্ধান্তকে ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা ‘রুটিন’ কাজ হিসেবে বিবেচনা করেছিল। সাধারণত এ ধরনের সিদ্ধান্ত ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনাকে জানানো হয় না। তদন্ত কমিটি এটিকে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও তদারকির একটি উল্লেখযোগ্য ত্রুটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গ্যাস-ফ্রি সনদ নিয়েও প্রশ্ন তদন্ত প্রতিবেদনে জাহাজটির গ্যাস-ফ্রি সার্টিফিকেট নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ইন্টারটেক কিমসকোর দেওয়া গ্যাস-ফ্রি সার্টিফিকেটে সব ট্যাংক প্রকৃতপক্ষে পরিদর্শন না করেই সনদে ‘একসেপ্টেবল’ লেখা হয়েছে। ওই সনদে হাইড্রোজেন সালফাইড ও কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস পরীক্ষা করা হয়নি; শুধু অক্সিজেন ও দাহ্য গ্যাসের নিম্ন বিস্ফোরণসীমা ‘গ্রহণযোগ্য’ বলা হয়েছিল। তবে জাহাজ আমদানি, বিচিং, সৈকতায়ন ও বিভাজনের অনুমতি দেওয়ার প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অনিয়ম পাওয়া যায়নি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ইয়ার্ডটির পরিবেশগত ছাড়পত্র ১২ অগাস্ট ২০২৬ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরও তা নবায়ন না করে জাহাজ কাটার কার্যক্রম চলছিল বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছেন। দুর্ঘটনার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরকে জানানোর আইনি বাধ্যবাধকতাও যথাযথভাবে পালন করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। ক্ষতিপূরণ ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে মৃত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তা হিসেবে প্রতিটি পরিবারকে ১ লাখ টাকা এবং শ্রম আইন অনুযায়ী প্রযোজ্য ২ লাখ টাকা শ্রম আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। অসুস্থ শ্রমিকদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ৩৫ সুপারিশ ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ৩৫টি সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। এর মধ্যে রয়েছে জাহাজের প্রতিটি ব্যালাস্ট ট্যাংকের পানি ও তলানির নমুনা পরীক্ষা, ডিজিটাল ব্যালাস্ট ওয়াটার এক্সচেঞ্জ রিপোর্ট সংরক্ষণ, প্রতিটি জাহাজের জন্য সুনির্দিষ্ট গ্যাস-ফ্রি ও ঝুঁকি মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু এবং প্রশিক্ষিত কারিগরি দল দিয়ে শিপ রিসাইক্লিং প্ল্যান বাস্তবায়ন। প্রতিটি ইয়ার্ডে ব্যালস্ট ট্যাংকের ভেন্টিলেশন পরিকল্পনা, সিসিটিভি ও রেকর্ড সংরক্ষণ, নিয়মিত মহড়া এবং আধুনিক মাল্টি-গ্যাস ডিটেক্টর ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। কোনো শ্রমিক আবদ্ধ স্থানে প্রবেশ বা কাজ শুরুর আগে অক্সিজেন, বিষাক্ত ও দাহ্য গ্যাসের মাত্রা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। কাজ চলাকালে প্রতি এক থেকে দুই ঘণ্টা পরপর গ্যাস পরীক্ষা এবং তার রেকর্ড সংরক্ষণের সুপারিশও রয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানে প্রশিক্ষিত এইচএসই সুপারভাইজার নিয়োগ, হট ওয়ার্ক বা কনফাইন্ড স্পেসে প্রবেশের আগে ‘পারমিট টু ওয়ার্ক’ ব্যবস্থা চালু করা, বিষাক্ত বা সংকুচিত স্থানের বাইরে সার্বক্ষণিক উদ্ধারকারী দল রাখা এবং শ্রমিক ও সেফটি কর্মীদের এসসিবিএ ব্যবহারের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিটি ইয়ার্ডে ২৪ ঘণ্টা জরুরি সাড়া দেওয়ার দল রাখার পাশাপাশি দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে জানানোর সুপারিশ করেছে কমিটি। সবশেষে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের নিরাপত্তা গাফিলতির জন্য ‘দ্য শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস-২০১১’ অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। কমিটির সার্বিক মতামতে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা তদারকি ও সেফটি ক্লিয়ারেন্স ছাড়া ছুটির দিনে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ পরিচালনা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও উদ্ধার ব্যবস্থার ঘাটতি, অনুমোদিত জনবল তালিকায় অসামঞ্জস্য এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কার্যক্রম চালানো ইয়ার্ডটির নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নির্দেশ করে। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত রাসায়নিক কারণ ও দায়দায়িত্ব নির্ধারণে চূড়ান্ত ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফল গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে তদন্ত কমিটি মত দিয়েছে। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
