প্রকাশ: Thursday, 21 May, 2020, 8:40 PM সর্বশেষ আপডেট: Thursday, 21 May, 2020, 11:23 PM
সময়ের সঞ্চয়
"আমি নতুন নতুন মুখ দেখতে চাই " এ বাক্যটি বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।তাঁর এ বাক্য উচ্চারণের প্রেক্ষাপটে চলে যাই। সময়টা ১৯৮১/৮২ সাল।মাসের নাম বা তারিখ মনে নেই। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের স্মাতক সম্মানের ছাত্র। আমরা থাকতাম সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের বর্ধিত ভবনের দু'তলায়। শেখ হাসিনা সদ্য স্বদেশে এসেছেন।সমস্ত দৈনিকের হেডলাইন ছিলো "আমি সব হারিয়ে আপনাদের কাছে এসেছি "।টেলিভিশন সংবাদে তাঁকে দেখেছি। তাঁকে সংবর্ধনা দিতে মানুষের ঢল নেমেছিলো।রাজনৈতিক অঙ্গণে নতুনভাবে উত্তেজনা ও নবজাগরণ ও নব জোয়ার দেখেছি। ছাত্র রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্র হিসেবে এসব অনুভব করেছি, প্রত্যক্ষ করেছি। ছাত্রলীগের কেন্দ্রস্থল জহুরুল হক হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে মনের মধ্যে আলাদা একটা অনুভূতি কাজ করতো। সিনিয়র ভাইদের কক্ষে যাতায়াত ছিলো। আতিক ভাই, মাহবুব ভাই ছিলেন আমাদের বর্ধিত ভবনের নেতা।মাহবুব ভাই দোহারের মানুষ। আমার কক্ষের দু'জন দোহারের ছিলেন। আমার মামাত ভাই জনাব বাতেনসহ একই কক্ষে থাকতাম। আমাদের কক্ষে দোহার এলাকার বাসিন্দারা থাকায় মাহবুব ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠতা ও যাতায়াত বেশি ছিলো।তিনি তিন তলায় আমাদের কক্ষের ঠিক উপরের কক্ষটাতে থাকতেন।মাহবুব ভাই এখন ঢাকা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।দোহারের আর এক বড় ভাই জনাব মোঃআবদুল মান্নান তিনি আবাসিক ছাত্র ছিলেন না। আমাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিলো, আমাদের রুমে তাঁর যাতায়াত ছিলো। তিনি আইনের ছাত্র ছিলেন। তিনি জেলা জজ ছিলেন। আইজিআর হয়েছিলেন। আমার আরো তিনজন বন্ধুর কথা মনে পড়লো।বর্তমান আইজিপি জনাব বেনজির আহমদ। তিনি আমাদের ভবনের বাসিন্দা ছিলেন। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র এবং আমরা সপ্তম বিসিএস এর সদস্য। জনাব মোল্লা কাউসার আইন বিভাগের ছাত্র এবং আমার ইয়ারমেট। তিনি পরে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি হয়েছিলেন। আর এক বন্ধু জনাব মমতাজ উদ্দিন মেহেদী তিনিও আইনের ছাত্র ও আমার ইয়ারমেট ছিলেন। থাকতেন মেইন বিল্ডিং এ।আমার রুমে তার যাতায়াত ছিলো। তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন।আমরা ছিলাম সমমনা এবং একই মতে বিশ্বাসী। আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক করেছিলাম ধানমন্ডির ৩২ নাম্বারে যাব। মাহবুব ভাইয়ের নেতৃত্বে তার রুমের ও আমাদের রুমের মিলিয়ে আট দশ জন ছাত্র গিয়েছিলাম। সময়টা সম্ভবত সকালের দিকেই হবে। আমরা বঙ্গবন্ধুর বাড়ির গেইটে পৌঁছে ছাত্র পরিচয় দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করি। প্রবেশের বিষয়ে তেমন কড়াকড়ি ছিলো না। নীচ তলার ড্রয়িং রুমে আমাদেরকে বসতে দেয়া হয়েছিল। বসার ঘরটি বেশ বড় ছিল। একটি বিষয় আমার মনোযোগ খুবই আকৃষ্ট করেছিলো,মাটির ছোট ছোট কয়েকটা পাত্র (খোরা)টেবিলের উপর রাখা ছিলো। জেনেছিলাম এগুলো ছাইদানি হিসেবে ব্যবহার করা হতো।একজন মহান নেতার কতোটা দেশপ্রেম থাকলে দেশীয় একটি সামান্য মাটির খোরাও তাঁর নিকট মূল্যবান বস্তু হয়ে ওঠতে পারে! এক ভদ্রলোক একটা রেজিস্টার খাতা দিয়ে বলেছিলেন আমাদেরকে সকলের নাম ঠিকানা লিখে দেয়ার জন্য। আমাদের নাম এন্ট্রি দেয়া হলে খাতাটি নিয়ে গেলেন। একটু সময় পরেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসেছিলেন, ঐ ভদ্র লোকটিও সঙ্গে ছিলেন। তাঁর নাম পরিচয় মনে নেই।বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রথমে আমাদের নাম পরিচয় জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি যে কথাগুলো বলেছিলেন আজো ভালোই মনে পড়ে। "আমি বঙ্গবন্ধুর কন্যা এটাই আমার পরিচয়। আমি এখনো রাজনীতি ভালো বুঝি না। তোমাদের মধ্যে কোন সমস্যা হলে নিজেরা সমাধান করে নিবে। ছোটো খাটো সমস্যা নিয়ে আর এসো না।আমি নতুন নতুন মুখ দেখতে চাই। " মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন নিয়মিত বঙ্গবন্ধু ভবনে থাকতেন কিনা জানি না। আমরা সেদিন তাঁকে সামনাসামনি একনজর দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুর সংগৃহীত বইয়ের আলমারিগুলো দেখেছিলেম।রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্রের বই সহ দেশি বিদেশি লেখকদের লেখা অসংখ্য বই। বিদেশ থেকে প্রাপ্ত তাঁর উপহার সামগ্রী। ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম আর মনে মনে ভেবেছিলাম বঙ্গবন্ধু এতো বই পড়ার সময় সুযোগ করতেন কিভাবে! বঙ্গবন্ধুর বাড়ির উপরের তলায় যাবার সৌভাগ্য হয়েছিল। লিখতে শরীর শিউরে উঠছে। রক্তাক্ত সিড়িগুলো দেখতে দিয়েছিলেন। তখন সম্ভবত সিড়িগুলো গ্রিল দিয়ে ব্যারিকেট দেয়া ছিলো।জাতির পিতার রক্তের কালচে দাগ সিঁড়িতে লেগেছিল। ভাবতে অবাক লাগে, বড়ো লজ্জা লাগে, খুবই অপরাধী বোধ করি, আমরা পিতাকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করেছি। সকল শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। একজন কেয়ারটেকার নীচ তলায় বঙ্গবন্ধুর কবুতর রাখার টঙ ঘরটি দেখিয়েছেন। রান্না ঘরের পাশেই ছিলো কবুতরের ঘর। তখনও কিছু সাদা কবুতর ছিলো।বঙ্গবন্ধু হয়তো কবুতর পুষতে পছন্দ করতেন, কবুতরের ডাকে আপ্লুত হতেন।সাদা মনের মহান নেতা হয়তো সাদা কবুতর দেখতে পছন্দ করতেন। লিখে রেখে যাই পিছনে ফেলে আসা সময়ের কথা। ঐ সময়ের একটু সঞ্চয়ের কথা, জীবনের স্মৃতির কথা। স্মৃতি জীবনের আকাশে ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের এ মাসে এসব স্মৃতি আজ বেশি করে মনে পড়ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুস্বাস্থ ও শান্তিময় সুদীর্ঘ সফল জীবন কামনা করছি।
লেখক :অতিরিক্ত মহাপরিচালক বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড।