ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
রোববার ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ৬ বৈশাখ ১৪৩৩
চোরাশিকারির জালে - শ্রীপর্ণা দে
বুধনি তার ঘরের দিকে পা বাড়াল। গোবিন্দর লোচ্চা দৃষ্টি বিষধর সাপের জিভের মতো লকলক করে বুধনিকে লেহন করতে চাইল
প্রকাশ: Tuesday, 3 January, 2023, 1:12 AM
সর্বশেষ আপডেট: Tuesday, 3 January, 2023, 1:16 AM

ছবি : পিয়ালী বালা

ছবি : পিয়ালী বালা

কাজে যাওয়ার তাড়ায় সকাল-সকাল কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেল বুধনি বেসরার। নিমের দাঁতন মুখে নিয়ে খানিক চিবিয়ে ওটাকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, ‘‘আর নাই ভাল লাগে। সারা গতরে ব্যাদনা।’’ বুধনির আবিবাহিত বন্ধু কপিলা ছাই দিয়ে বাসন মাজছিল। বুধনির ঢুলুঢুলু চোখের দিকে তাকিয়ে কপিলা বলল, ‘‘তুর তো আঁখই খুলে না।’’
বুধনি লম্বা হাই তুলে বলল, ‘‘একটুস নিদ হয় নাই।সারা শরীলে যন্তন্না।’’

কপিলা খসর খসর করে বাসন মাজা ফেলে রেখে ঠোঁট উলটে বুধনিকে বলল, ‘‘ব্যথা হবেক নাই কেনে! কাল রাতভোর দুটা দামড়ার সেবা লিইছিস।’’
বুধনি মাথায় হাত দিয়ে বলল, ‘‘আহ মরণ! লিইনি রে। দিলম বল। সেবা দিলম উয়াদের।’’ কপিলা বুধনির কানের কাছে মুখ এনে বলল, ‘‘কাল রেতে নাকি করালি তুর ঘরে ছিল, তুই নাকি ডাকেছিলি!’’ করালি বুধনির প্রাণের মানুষ। বিয়ে হয়ে গেলেও বুধনির করালির প্রতি দুর্বলতা যায়নি।

বুধনি বলল, ‘‘ডাকব নাই কেনে বল। কুথায় মরদটা সারা গতরে রস ঢালবেক তা লয়, আধেক রেতে ঘুমাই গেল। মোর গতরটা উশখুশ করতে ছিল। মোর গরম দাবনা করালি ভরায়ে দিয়েছে। উ আমাকে চোপর রাত মজা দিয়েছে।’’
কপিলা বলল-‘‘করালি বলে ভাল লাগাটা বেশি, তাই লয়?’’

বুধনি কপিলার কথা শুনে বিরক্তির সুরে বলল, ‘‘কেনে সিধুকে আমি কমটা কি দিয়েছি? উয়ার লিবার ক্ষমতা নাই বলে গভভে একটা কিছু হল নাই। লুকে মোরে ডাইন কয়।’’
কপিলা একটু নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘‘করালির সাথে তুর বিয়েটা হলে বেশ হত। সিধুর সাথে তুর বয়সের অনেক তফাৎ।’’  বুধনি স্মিত হেসে বলল, ‘‘মোর কপালটো পুড়া।’’

মাথার উপর সূর্যটাকে উঠতে দেখে বুধনির কাজে যাওয়ার খেয়াল হল। কপিলাকে বুধনি বলল, ‘‘লে আর বকিস না। কামে যেতে দের হয়ে গেলেক। এখন এলম বটে।’’
বুধনি দ্রুত পায়ে কপিলার কাছ থেকে বিদায় নিল।

জীবনের রঙে রঙিন বসন্ত এসেছে পাহাড়ি জনপদে। গতকাল সরহুল উৎসব গেছে। দোলপূর্ণিমার আলোয় ঝলমল হয়ে উঠেছিল শালের বন। পাহাড়ি অরণ্যের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে ঢোল, ড্রাম, নাগরা সহযোগে মেয়ে-মরদের নাচ-গান হয়েছিল অর্ধেক রাত পর্যন্ত। মেয়ে-মরদের ধলাধলি, বাচ্চাদের চিৎকারে মুখরিত হয়ে উঠেছিল এই অরণ্যভূমি। খাপড়ার (এক ধরনের টালি) ছাউনি দেওয়া বর্গক্ষেত্রের মতো দেখতে ছোট-ছোট বাঁশের ঘরগুলো ভেদ করে মেয়ে-মরদের রমণের আওয়াজ এই অঞ্চলকে কাঁপিয়ে তুলেছিল। কালকের এই একটা দিনে প্রিয়জনদের সঙ্গে মনের সুখে আনন্দ করেছিল ওরা। রুক্ষ, শুষ্ক পাহাড়ের বুকে নিশুতি রাতে চলেছিল আদিরসের উন্মত্ত খেলা। তাই প্রায় সকলেই আজ ক্লান্ত।

টোঙি পাহাড়ের মানুষদের অতিরিক্ত চাহিদা নেই বলেই জীবনও চলে মন্থর গতিতে।সভ্য সমাজ থেকে বহুদূরে এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের অবস্থান। এখানে জনবসতি খুব একটা ঘন নয়। এই জীবন ছেড়ে ওরা বাইরে যেতে পছন্দ করে না। জোয়ান মরদরা বিশেষ-বিশেষ সময়ে বর্ধমান, বীরভূম গিয়ে লেবারের কাজ করে।অল্পবয়সি মেয়েরা পরের বাড়ি ঝিয়ের কাজ করে। ‘দিন আনে দিন খাই’-এর চেয়েও খারাপ অবস্থা এই অঞ্চলের লোকগুলোর। কোনদিন একবেলা, কোনদিন দু'বেলা অভুক্তই থাকতে হয় এদের। স্থানীয় ফসল বেল, কাঁকরোল, কুমড়ো, আম, কাঁঠাল- এসবই তাদের খিদে মেটানোর একমাত্র ভরসা। নিত্যদিন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে মগ্ন এখানকার মানুষরা।

বুধনি বেসরা টোঙি পাহাড়ের অন্যান্য মেয়েদের চেয়ে একটু আলাদা। টোঙি পাহাড় থেকে বাইরে বেরিয়ে রোজগারের জন্য ছ'বছর এক স্কুলশিক্ষিকার বাড়ি কাজ করে। অন্যান্য মেয়ের চেয়ে বুধনির কাজ করার আগ্রহও বেশি। মাস গেলে সে পাঁচশো টাকা নিয়ে ঘরে ফেরে। সভ্য সমাজের আলোর ঝলকানি গায়ে লাগায় বুধনির চাহিদা অন্যদের চেয়ে একটু বেশি। টোঙি পাহাড়ের মানুষরা বুধনির মা লছমিকে তো প্রায়ই বলে, ‘‘বড়লোকগুলানের বাতাস লেগেছে তুর বিটিয়ার গতরে।’ বুধনি সে কথায় কোনও কান দেয় না। সে ছোট থেকে চলে নিজের মর্জিতে।

বুধনি নিচুজাতের মেয়ে। বয়স প্রায় বাইশের কাছাকাছি। রঙ ময়লা হলেও পানপাতার মতো মুখখানি বেশ মিষ্টি। মাঝারি উচ্চতা। বয়সের তুলনায় শরীর হৃষ্টপুষ্ট হওয়ায় শরীরে যৌবনের ঢল নেমেছে। ওর পরিপুষ্ট বুক সদর্পে শরীরকে ফেলে উপরে উঠতে চায়। মাথাভর্তি তেলবিহীন লালচে চুল বটগাছের ঝুরির মতো কোমর পর্যন্ত নেমে এসেছে। ঘাগড়ার আড়ালে ভারী নিতম্ব অনেক মেয়েই ঈর্ষার কারণ। ওর দু'পায়ের ফাঁকে অঙ্গটা কেমন যেন পুরুষদের মাতাল করে। মল বাজিয়ে বুধনি যখন হেঁটে যায় এই অঞ্চলের জোয়ান মরদদের বুকের ধুকপুকানি শুরু হয়ে যায়। এই পাহাড়ি অরণ্যের সঙ্গে একাকার হয়ে যায় বুধনির রূপ। সে প্রকৃতির কোলে সযত্নে নিজের নিয়মে বেড়ে উঠেছে। ‘বন্যেরা বনে সুন্দর’ কথাটা বুধনির সঙ্গে মানানসই।

শরীরের কোনও অংশে কোনও খামতি নেই বুধনির। তবু সিধুর সঙ্গে তার পাঁচ বছরের বিবাহিত জীবনে কোনও সন্তান আসেনি। সে স্বামীকে সুখী করতে চায়, নিজেকেও সুখী দেখতে চায়। কিন্তু ঈশ্বর যে কেন বিরূপ সে বুঝে উঠতে পারে না। স্বামী সিধু বুধনিকে পর্যাপ্ত সুখ দিতে পারে না। জোর করে বুধনি কাছে আসে প্রায় রাতেই। খাবারের মতোই এ এক বন্য চাহিদা।

আজও কাজে যাওয়ার সময় বুধনি সেজেছিল। উৎসবের পরের দিন আজ। তাই সাজেও সরহুলের আঁচ লেগেছিল। গায়ে ঘাগড়া, ব্লাউজ, গলায় চাঁদির হার, কানে ঝোলা দুল, হাতে একজোড়া চাঁদির বালা, চোখে ঘন কাজলে বুধনিকে দেখতে বেশ ভালই লাগছিল। টোঙি পাহাড় থেকে বুধনির কাজের জায়গা প্রায় আড়াই-তিন কিলোমিটার। স্কুলশিক্ষিকা অহনাদেবীর বাড়িতে বুধনি ঘর মোছে, বাসন ধোয়, কাপড় কাচে, ফুলগাছে জল দেয়। কাজে বুধনির কোনও ফাঁকি নেই। সচল মেশিনের মতো দু'ঘণ্টার মধ্যে সব কাজ করে। নির্দিষ্ট সময়ে বুধনি কাজ সেরে অহনাদেবীর বাড়ি থেকে নিজের ঘরে ফিরছিল। এমন সময় একটা লোক তার পিছু নিলো।

বুধনি রোদের মধ্যে লোকটির ছায়া দেখে বুঝতে পারল লোকটি তার কয়েক পা পিছনেই আসছে। এই পাহাড়ি গ্রাম, অরণ্যের সঙ্গে লোকটা বড়ই বেমানান। বুধনি একটু দাঁড়িয়ে চিবুকে হাত দিয়ে আপন মনেই বলল, ‘‘ই বাবুটা ত ইখানকার লয়। পরদেশী বলে মনে লিছে! ই লুকটা মোদের দেশে ক্যানে?’’

 অচেনা লোকটির বয়স পঁয়ত্রিশের ঊর্ধ্বে। লম্বা প্রায় পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি। মাথায় হালকা টাক পড়েছে। বিড়ালের মতো দুটো চোখে ধূর্ত দৃষ্টি। গায়ের রঙ শ্যামবর্ণ। গায়ে একটা রঙচটা খাঁকি প্যান্ট, টি-শার্ট।

বুধনি একটু আড়চোখে লোকটাকে দেখে অন্য রাস্তা ধরল। লোকটিও বুধনির পা অনুসরণ করে ঠিক পিছনেই চলল। বুধনির হাঁটতে অস্বস্তি করছিল লোকটা তার পিছনে থাকায়। কয়েক পা পিছিয়ে এসে লোকটির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বুধনি বলল, ‘‘মোর পিছা লিয়েছো ক্যানে! কে বাবু তুমি?’’

লোকটা তার হলদে দাঁতগুলো বের করে খ্যাকখ্যাক করে হাসতে লাগল। হাসি থামিয়ে লোকটা বলল, ‘‘অধমের নাম গোবিন্দ। তোমার পিছু তো নিইনি। একই রাস্তায় তুমিও যাচ্ছ, আমিও যাচ্ছি।’’ বুধনি একটু রেগে বলল, ‘‘এগে তুমি যাও, পিছে মুই যেছি।’’

গোবিন্দ শান্ত স্বরে বলল, ‘‘আহা! রাগ করছ কেন! এই একই রাস্তা একসঙ্গেই যাই।’’
বুধনি বলল, ‘‘গসা হয় নাই ত!’’
গোবিন্দ বলল, ‘‘তোমার নাম কি?’’
বুধনি বলল, ‘‘বুধনি, বুধনি বেসরা।’’
গোবিন্দ বলল, ‘‘বাহ ভারী মিষ্টি নাম। তা কোথায় থাকো তুমি?’’
বুধনি অদূরে টোঙি পাহাড়ের উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘‘উই যে টোঙি পাহাড়ট দেখছ। উয়ার উপরে মোর ঘর বটে।’’
গোবিন্দ বলল-‘‘ও আচ্ছা।’’

বুধনি হাঁটতে-হাঁটতে গোবিন্দকে জিজ্ঞেস করল, ‘‘তুমার ঘর কুথায়?’’
গোবিন্দ সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, ‘‘কলকাতা আমার বাড়ি।’’
বুধনি চিন্তিত সুরে বলল, ‘‘কলকাতা! উ ত বড় দেশ বটে।’’
গোবিন্দ একবুক নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, ‘‘বড় জায়গা। তা তোমার ঘরে কে কে আছে?’’

বাড়ির কথা বলতে-বলতে বুধনি উচ্ছ্বসিত হয়ে গোবিন্দকে জানাল, ‘‘ঘরে সবাই আছে বটে- মা, বাপ, মরদ।’’
গোবিন্দ বলল, ‘‘ও, তুমি বিয়ে করে ফেলেছ এত তাড়াতাড়ি! এত রূপ তোমার। মানে তুমি এত সুন্দরী, তাই বলছিলাম। আমাদের ওখানে তিরিশ বছরের আগে কেউ বিয়ে করতেই চায় না। বিয়ে করলে সব মাটি।’’
পরদেশি বাবু গোবিন্দর মুখ থেকে নিজের রূপের বর্ণনা শুনে বুধনির সুপ্ত যৌবন শীতঘুম থেকে ওঠা সাপের মতো জেগে উঠল। বুধনি হতাশার সুরে বলল, ‘‘মোদের ইখানে কচি বয়সেই বিয়া হয়েন যায়।’’

বুধনি গোবিন্দকে কৌতূহলবশত জিজ্ঞাসা করল, ‘‘তুমি ইখানে কেনে আসিছ? ইখানে তুমার কি কাম আছে?’’
গোবিন্দ মাথা চুলকাতে-চুলকাতে বলল, ‘‘কাজ তেমন বিশেষ কিছু নেই। জায়গাটা ঘুরতে এসেছি আর কী! আমি তো কলকাতায় কাজ করি।’’
বুধনি বলল, ‘‘তুমি কলকাতায় কী করো?’’
গোবিন্দ বলল, ‘‘ব্যবসা করি।’’
বুধনি বলল, ‘‘তুমার কিসের কারবার গো?’’
গোবিন্দ বলল, ‘‘মুরগির ব্যবসা আমার।’’

কথা বলতে-বলতে বুধনি কখন টোঙি পাহাড়ের কাছে চলে এসেছে খেয়াল করেনি। বুধনি গোবিন্দর কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার আগে বলল, ‘‘এখন চলি গো বাবু।’’
গোবিন্দ বলল, ‘‘ঠিক আছে এসো। আমি কয়েকদিন এখানে আছি। পরে দেখা হবে।’’
বুধনি তার ঘরের দিকে পা বাড়াল। গোবিন্দর লোচ্চা দৃষ্টি বিষধর সাপের জিভের মতো লকলক করে বুধনিকে লেহন করতে চাইল। বুধনি দৃষ্টির বাইরে চলে গেলে গোবিন্দ শূন্যতার বুকে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল।

চোরাশিকারির জালে - শ্রীপর্ণা দে

চোরাশিকারির জালে - শ্রীপর্ণা দে

বুধনি ঘরে ফিরলে তার মরদ সিধু জিজ্ঞেস করল, ‘‘কুথায় ছিলি এতক্ষণ? ঘরে কি তুর মন বসে লাই!’’
বুধনি বলল, ‘‘ঘরে থাকলেই হবেক! মোর কি কাম লাই!’’
সিধু তাচ্ছিল্যভরে বলল, ‘‘কাম ত তুর একাই আছে!’’
বুধনি মনে-মনে ভাবল, ওই গোবিন্দবাবুর সঙ্গে কথা বলতে-বলতে বেশ দেরি হয়ে গেছে তার। জলখাবারের সময় পেরিয়ে যাওয়ায় সিধুরও বেশ মাথা গরম। তাই সিধুকে ঘাঁটানো ঠিক হবে না। সিধুর গলা দু'হাতে জড়িয়ে ধরে বুধনি বলল, ‘‘মুই ঘরে লা থাকলে তুর বহুত গসা হয়। তু ইকা কাম করিস মোর ভালো লাগে লাই। তুয়ার যাতে কষট লা হয় উয়ার লেগেই কাম করি। মুই হাত লাগালে খতি কিসের।’’

বুধনির কথা শুনে সিধুর মনে অভিমানের জমাট পাহাড় থেকে বরফ গলতে শুরু করে। সিধু অদ্ভুত দৃষ্টিতে বুধনিকে দেখে বলল, ‘‘তু আমাকে ইতটা ভালবাসিস!’’
বুধনি সিধুর প্রতি অধিকারবশত রূঢ় গলায় বলল, ‘‘তুকে ভালো বাসব লাই ত কাকে বাসব! তুই মোর মরদ আছিস। তুর লেগে মুই জানট দিতে পারি।’’

সিধুর চোখ ছলছল করে উঠল। সিধু বলল, ‘‘তু মকে দিয়েং গেলি, মুই তুকে কিছুই দিতে লারলাম। বুধনি সিধুকে কাছে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘‘ইকথা ক্যানে বলিস! তুকে কিছু দিতে হবেক লাই। ইমন করে লেগে থাকলেই হবেক বটে।’’
বুধনি পরম যত্ন সহকারে সিধুকে খাওয়াল। দিনটা খুব ভালই গেল দু'জনের।

 সকালবেলা। পাখির ডাকে বুধনির ঘুম ভাঙল। প্রাকৃতিক কাজ সেরে বুধনি ভিজে জামা মিলছিল। হঠাৎ কাপড়ের আড়াল সরিয়ে বুধনির নজরে পড়ল টোঙি পাহাড়ের নীচে বসে গোবিন্দ কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলছে। বুধনি তাড়াহুড়ো করে হাতের কাজ শেষ করে ঘুম থেকে সিধুকে তুলে দিয়ে বলল, ‘‘মুই কামে যেছি। দেরিট হলে তু খাইয়া লিস।’’
বুধনি কোনওরকমে চুলটা আঁচড়ে পথে বেরিয়ে পড়ল।

গোবিন্দ ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত ফোনে গোবিন্দ কাকে যেন বলছিল, ‘‘এখানে একটা চিকনাই মাল তুলতে পারব। টোপ একটা ফেলব জলে। আশা করি মাছ গিলে নেবে। সব ব্যবস্থা রাখিস। কলকাতা ফিরব দুদিনের মধ্যে। ওই মাগিগুলো কোনও ঝামেলা করেনি তো! ঝামেলা করলে ঘুমের ওষুধ, ইঞ্জেকশন তো রয়েছেই। সময় মতো দিস।কলকাতায় পৌঁছে সব হারামজাদিগুলোকে নেপাল চেনাব। ওই মাগিদের মধ্যে কয়েকটা খুব উড়ছে। ওদের ডানা ছেঁটে না ফেলা পর্যন্ত শান্তি নেই। শালা হারামজাদি।’’

গোবিন্দ ফোনে কথা বলতে-বলতে খেয়ালই করেনি, কখন বুধনি এসে তার কাছে দাঁড়িয়েছে।বুধনিকে দেখে ইতস্তত হয়ে গোবিন্দ ফোনটা কেটে দিল। বুধনি স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে গোবিন্দ হেসে বলল, ‘‘কী দেখছ অমন করে! আর বলো না ব্যবসার জন্য এত ফোন আসে কী বলব তোমায়!’’
বুধনি কপাল সঙ্কুচিত করে গোবিন্দকে জিজ্ঞেস করল, ‘‘কিসের কারবার গো বাবু তুমার?’’
মাথা চুলকাতে-চুলকাতে গোবিন্দ বলল, ‘‘মুরগির ব্যবসা।’’

গোবিন্দ প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিয়ে বলল, ‘‘তা এত সকালে কোথায় যাচ্ছ!’’
বুধনি বলল, ‘‘কামে।’’
গোবিন্দ বুধনির গায়ে হাত বুলিয়ে বলল, ‘‘তোমার মরদ কাম করে না! তোমায় কামে পাঠায়!ছি! ছি! এত কাম করলে তোমার রূপ থাকবে! কত সুন্দর তুমি। যৌবন যে হেলায় হারাচ্ছ বোন। এই বয়সে পরের বাড়ি ঝিয়ের কাজ তোমায় মানায় না। ভাল কিছু করতে পারতে।’’

বুধনি একটু নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘‘মরদ কামে যায়, তবে রোজ লাই যায়। আর কে মুকে ভালো কাম দিবেক গো। মুর লিখাপড়া লাই বটে।’’
গোবিন্দ সোৎসাহে বলল, ‘‘এই জায়গায় তোমার রূপের দাম কে দেবে! কলকাতায় তুমি রূপের দাম পাবে। অন্তত ঝি খেটে খেতে হবে না। তোমার রোজগারে তুমি অনায়াসে চার-পাঁচজনকে পুষতে পারবে। তোমার মরদের খাটনি কমবে। সে-ও বিশ্রাম পাবে। এখানে পড়ে থাকলে তোমার চিকন শরীরে শ্যাওলা ধরে যাবে।’’

গোবিন্দর সঙ্গে উদাসীনভাবে হাঁটতে-হাঁটতে বুধনি বলল, ‘‘মুই মরদটার লেগে সব করতে পারি। মুর মরদটার শান্তি মিলবে। টুকু আরাম হবে দেখেও সুখ। কিন্তুক উ মুরে চখের আড়াল করতে লাচার। কলকেতার মতো বড়া দ্যাশে উ কখনও যেতে দিবেক লাই।’’

গোবিন্দ বলল, ‘‘বড় দেশ থেকে বড় কামাই করা যায় সহজে। আর তুমি তো কলকাতায় থাকছ না সারাজীবন। সপ্তাহ শেষে দু'-তিন দিনের জন্য বাড়ি আসবে। তোমার রোজগারের টাকা যখন তোমার মরদের হাতে তুলে দেবে তখন দেখবে সব অভিমান জল হয়ে গেছে। টাকা সংসারে শান্তি আনে। বড় বাড়ি হবে, এক-আধবেলা না খেয়ে কাটাতে হবে না। ভদ্রলোকেরা যেভাবে বাস করে সেভাবে বাস করতে পারবে। অভাব ছুঁতেও পারবে না।’’

বুধনি একটু চিন্তিত সুরে বলল, ‘‘মোর মরদটা জানলে কিছুতেই কলকেতার মতো দেশে যেতে দিবেক লাই। ই লিয়ে ঝামেলা হবেক। তা ছাড়া কলকেতার মতন জায়গায় মোরে কে কাম দিবেক! কে মুইকে চিনে উখানে!’’

গোবিন্দ চোখদুটো বড়-বড় করে পাকিয়ে বলল, ‘‘ভাল কাজে বাধা সবসময় আসবে। তাই বলে তোমার মতো লড়াকু মেয়ে হাল ছেড়ে দেবে? আর জীবনে সুযোগ বারবার আসে না।’’
বুধনি বলল, ‘‘কলকেতা কার লগে মুই যাব?’’

গোবিন্দ সিগারেট ধরাতে-ধরাতে বলল, ‘‘আমি থাকতে তোমার চিন্তা! আমার ওখানে অনেক চেনাশোনা। আমি তোমায় কাজ খুঁজে দেব। আমি তোমায় কলকাতা নিয়ে যাব। দাদা হয়ে বোনের জন্য এটুকু পারব না! তুমি যদি চাও আমার সঙ্গে রওনা দিতে পার। আজ দিনটা আমি আছি। কী করবে তুমি তা তোমার ইচ্ছে। ভেবে জানিয়ো আমায়। তোমার কাজ না হওয়া পর্যন্ত আমি ওই গাছতলায় অপেক্ষা করব।’’
বুধনি গোবিন্দকে বলল, ‘‘মুই ভেবে লিয়ে বলব।’’
গোবিন্দ বলল, ‘‘তুমি কাজ সেরে জানিও।’’
গোবিন্দর সঙ্গে পথ চলতে-চলতে বুধনি অহনা দেবীর বাড়ির কাছাকাছি চলে এল। গোবিন্দকে বুধনি বলল, ‘‘ইখন যাই গো বাবু। কামে দের হয়ে যাচ্ছে। ইখন চলি।’’
গোবিন্দ বলল, ‘‘এসো। কথাটা মাথায় রেখো।’’

অহনা দেবীর বাড়িতে কাজ করতে-করতে গোবিন্দর বলা কথাগুলো বুধনির মাথায় পোকার মতো কিলবিল করে উঠল। একঘণ্টার মধ্যে কোনওরকমে বুধনি তাড়াহুড়ো কাজ শেষ করে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। গোবিন্দর বলা কথাগুলো ভাবতে-ভাবতে বুধনি কখন গোবিন্দকে পেরিয়ে চলে গেছে খেয়াল করেনি। গোবিন্দকে অতিক্রম করে যেতেই সে হাঁক পাড়ল বুধনির উদ্দেশে, ‘‘কী গো কাজ করে চলে যাচ্ছ? আমি যে অপেক্ষা করছি তোমার জন্য। কী ভাবলে বলো।’’

বুধনি মৃদুস্বরে আপনমনেই বলল, ‘‘লুকটা মুরে বুন কইছে। লিজের থিকাই কাম দিবেক বুলছে। বেশি কামালে যাই হোক না কেনে তিনবেলা রোজ পেট ভরে খাতে তো পাবো। সিধুকে ঘরে ফিরে সবটা জানানো ঠিক হবেক! সুযোগ হাত ফসকান উচিত লয় একদম।’’
বুধনির মৃদুস্বরে বলা কথাগুলো গোবিন্দ বুঝতে না পেরে বলল, ‘‘কী ভাবছ এত?’’

গোবিন্দর কথায় বুধনির চিন্তার রেশ কেটে গেল।বুধনি বলল, ‘‘ভাবছিলাম মরদটা জানলে রক্ষে লাই।’’ বুধনি যাতে নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকে তার জন্য গোবিন্দ ছদ্মরাগ দেখিয়ে বলল, ‘‘ঠিক আছে। কলকাতা যেতে হবে না। এই ঝাড়খণ্ডের টোঙি পাহাড়ে জীবন শেষ করো। টোঙি পাহাড়, ঝোপঝাড়, জঙ্গলের বাইরে তোমরা কিছু চেনো না। চিনতে চাও না। তোমাদের কোনও উন্নতি কোনওদিন হবে না। আমারই ভুল এসব তোমায় বলা। তোমাদের অভাব তোমাদেরই থাকবে। কেউ তোমাদের অভাব ঘোচাতে পারবে না। চললাম আমি।’’

গোবিন্দর রাগ দেখে বুধনি বলল, ‘‘তুমি মোর উপর মিছাই গসা করছ। মোর কি বাইরে যাতে ইছা করে লাই! কিন্তুক মরদটাকে কইলে সে তো মুরে যেতে দিবেক লাই।’’
গোবিন্দ বলল, ‘‘যে বোঝে না তাকে বুঝিয়ে কী লাভ! মাথাটা একটু খাটাও। পড়াশোনা শেখোনি, ঠিক আছে। তবু তো মাথায় কিছু থাকবে। তোমার মরদকে এখন বলার দরকার কী! আগে বাইরে বেরিয়ে পড়ো। তারপর সময়মতো বোলো।’’

গোবিন্দর কথা শুনে বুধনি কেমন যেন সংকুচিত হয়ে গেল। বুধনি বলল, ‘‘উহাকে লা বলে কোন কাম করি লাই। আজ কেমনে করি।’’
গোবিন্দ বলল, ‘‘না করলে তুমি পস্তাবে। চিরকাল খাটার বয়স কিন্তু থাকবে না।’’
বুধনি বলল, ‘‘তুমি যা কইছ তাই হবেক। যাব কলকেতায়। তুমি লিয়া যাবে মোরে।’’

বুধনির কথা শুনে গোবিন্দর চোখ দুটো চকচক করে উঠল। গোবিন্দ বলল, ‘‘কাল সকালের আলো ফোটার আগে আমরা কলকাতা যাব তা হলে। তুমি বাড়িতে না জানিয়ে নদীর পাড়ে চলে এসো ভোরে-ভোরে। আমি গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করব।’’
বুধনি ঘাড় কাত করে গোবিন্দর কথায় সায় দিল। তারপর দ্রুত পায়ে সে গোবিন্দর কাছ থেকে বিদায় নিল।

বুধনি বিদায় নেওয়ার পর গোবিন্দ ফোনে কাকে যেন বলল, ‘‘মাছটা টোপ গিলেছে। বেশি খেলায়নি। কাল সকালে কলকাতা যাব। সব রেডি রাখিস।’’
ফোনের ওপার থেকে ভেসে এলো এক মাঝবয়সি লোকের গলা, ‘‘তুমি বস পারো। তা মালটার গতরে ঝিলিক দিচ্ছে তো! বুড়ি মাগি তুলে এনো না। গতবারে কামাই ভাল হয়নি। ফ্রেশ মাল এনো। খাবার প্যাকিং হয়ে চলে যাওয়ার আগে আমরা তো চেখে দেখব একবার।’’
গোবিন্দ তার হলদে দাঁতগুলো বের করে খ্যাঁকখ্যাঁক করে হেসে বলল, ‘‘হারামি, নোলাটা কমা একটু। জিভ থেকে লালা পড়ছে এখুনি। তবে জানিস যতগুলো মাগি এই লটে তুললাম এইটাই নিচু জাতের। তবে যৌবনের রসালো ফল সবে গাছে ধরেছে।’’
ফোনের ওপার থেকে শোনা গেল, ‘‘নিচুজাত বলে তো আমরা অবহেলা করি না। আমরা নিচু-উঁচু সব মাগিদেরই একই সেবা করি। উদার আমরা এ বিষয়ে। দরদ দিয়ে সারা গতরে মলম লাগাই।কামাই তো ভালই হবে এ লটে। তাড়াতাড়ি চলে এসো কলকাতা।’’
গোবিন্দ বলল- ‘‘হুম। এই সপ্তাহে হবে না। সামনের সপ্তাহে হারামজাদি খানকিগুলোকে নেপাল পাঠাতে পারলে বাঁচি। গাদা-গাদা ইঞ্জেকশন, ওষুধের খরচা করিয়ে ছাড়ল। ঠিক আছে। এখন রাখি। কাল দেখা হবে,’’ গোবিন্দ ফোন কেটে দিল।

পরদিন ভোরের আলো ফুটতে না-ফুটতে সকলের অলক্ষে বুধনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গোবিন্দর কথামতো জায়গায় একটা পুটলি বগলে ভরে হাজির। টোঙি পাহাড় নিস্তব্ধতার চাদর গায়ে ঘুমিয়ে আছে। ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়ায় অদূরে জঙ্গল থেকে বন্য গন্ধ ভেসে আসছে। রাস্তাঘাট একেবারে নির্জন। দৃষ্টির মধ্যে সুবর্ণরেখা নদীও কুলকুল শব্দে বয়ে চলেছে নিজের ছন্দে। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে বুধনি অচেনা পথে পা বাড়িয়েছে। তার মন আজ নতুন স্রোতে ভেসে যাওয়ার জন্য উন্মুক্ত।
কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর বুধনির সামনে ভোরের নিস্তব্ধতাকে চুরমার করে একটা ভ্যানগাড়ি এসে দাঁড়াল। গাড়ির ভিতর থেকে গোবিন্দর গলা পাওয়া গেল, ‘‘উঠে এসো তাড়াতাড়ি।’’
বুধনি গাড়িতে ওঠামাত্র গাড়িটি যেভাবে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে এসেছিল, সেভাবে অন্ধকারেই বিলীন হয়ে গেল।




পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status