|
লেবাননে আগ্রাসন কিভাবে ভেস্তে দিতে পারে যুদ্ধবিরতি?
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() লেবাননে আগ্রাসন কিভাবে ভেস্তে দিতে পারে যুদ্ধবিরতি? যদিও এই হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।এতে প্রায় ৪০ দিন ধরে চলমান মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কমার আশা জাগিয়েছিল। তবে লেবাননে নতুন করে হামলা সেই আশায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। লেবাননে আগ্রাসন নাকি যুদ্ধবিরতি? এর আগে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান সরকারের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের পুরো অঞ্চলে, বিশেষ করে লেবাননে হামলা বন্ধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত।’ কিন্তু দেশটিতে হামলার পর ইসরায়েল দাবি করছে, তারা ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে এসব হামলা চালাচ্ছে। তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এই দাবি অস্বীকার করেছে। তাদের মতে, যুদ্ধবিরতি শুধুমাত্র ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারস্পরিক হামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা একটি ‘আলাদা সংঘর্ষ’। ফলে এই সহিংসতা যুদ্ধবিরতির পরিধি নিয়ে বড় ধরনের মতবিরোধ ও বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, স্থায়ী সমাধানের জন্য আলোচনা শুরুর আগেই এই যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়তে পারে। তবে আশার আলো হচ্ছে, আগামী শনিবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুদ্ধবিরতির আলোচনার সূচনায় এ বিষয়টিও রয়েছে। সেদিন মূলত নির্ধারণ হবে, দেশটিতে আগ্রাসন চলবে নাকি ভেস্তে যাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধবিরতি। ইরানের যুদ্ধবিরতিতে লেবানন কেন? লেবাননকে যুদ্ধবিরতির আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ইরানের জোরালো অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে তেহরানের কৌশলগত ও আঞ্চলিক স্বার্থ। লেবানন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রস্তাবিত আলোচনাকে ঝুঁকিতে ফেলা ইরানের জন্য ‘বোকামি’ হবে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি বলেন, ‘চাপের মধ্যে থেকেও ইরান যদি এমন একটি আলোচনা (যুদ্ধবিরতি) ভেঙে দিতে চায়, যেখানে (লেবানন) তাদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়—তাহলে সেটা তাদের সিদ্ধান্ত। আমরা মনে করি এটা বোকামি।’ তবে বাস্তবতা ভিন্ন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী আঞ্চলিক মিত্র এবং ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে পরিচিত জোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এছাড়াও এই জোটে ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীও রয়েছে, যারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি হামলা শুরুর প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর হিজবুল্লাহ সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি যুদ্ধবিরতিতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত না করা হয়, তাহলে তা ইরানের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা কৌশলকে দুর্বল করে দিতে পারে। কারণ, একদিকে ইরানের ওপর হামলা বন্ধ থাকলেও অন্যদিকে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে হামলা চলতে থাকবে। এতে তেহরান তার প্রভাব ও বিশ্বাসযোগ্যতা—দুটিই হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। চলমান যুদ্ধবিরতির ‘অ্যাকিলিস হিল’ বা সবচেয়ে দুর্বল দিক হিসেবে লেবাননকে উল্লেখ করেছেন কিংস কলেজ লন্ডনের একজন অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ। তিনি বলেন, ‘লেবাননের পরিস্থিতি ইরানকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে বাধ্য করতে পারে। যাতে তারা প্রতিরোধের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে এবং প্রমাণ করতে পারে যে তারা হিজবুল্লাহর জন্য একটি নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা অংশীদার।’ ক্রিগ আরও বলেন, ‘তবে এ সময়ে ইরানের অবস্থান কতটা দৃঢ় তা যাচাই করতে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করার চেষ্টা করবে ইসরায়েল।’ এদিকে যুদ্ধ বন্ধে ইরানের ১০ দফা দাবির মধ্যে আঞ্চলিক মিত্রদের (বিশেষ করে হিজবুল্লাহর) সমর্থন বন্ধ করার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধবিরতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া লেবাননে ইসরায়েলের ভয়াবহ হামলার পর যুদ্ধবিরতিতে দেশটিকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি আরও তীব্র হয়েছে। একইসঙ্গে তীব্রতা নিন্দা জানিয়ে বিভিন্ন দেশ এই হামলাকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যে দেশটিতে ‘নৃশংস ধারাবাহিক হামলার’ নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে কাতার। মিশর বলেছে, আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টাকে ভণ্ডুল করতে ‘পূর্বপরিকল্পনার উদ্দেশ্য’ হিসেবে এসব হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল বাহিনী। অন্যদিকে নাগরিকদের সুরক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তুরস্ক সরকার বলছে, ইসরায়েলের হামলা লেবাননের মানবিক পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ফ্রান্সও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়ে লেবাননকে যুদ্ধবিরতিতে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। এদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বিবৃতিতে সতর্ক করেছেন, লেবাননে চলমান ‘সামরিক কার্যক্রম’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতির জন্য ‘গুরুতর ঝুঁকি’ তৈরি করছে। তবে এসব কিছুর তোয়াক্কা না করেই দেশটিতে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যেখানে প্রয়োজন, সেখানেই হামলা অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা শক্তি, নির্ভুলতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছি। যারা ইসরায়েলের বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে কাজ করবে, আমরা তাদের ওপর আঘাত হানব।’ উত্তর ইসরায়েলের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েল হামলা চালিয়ে যাবে বলেও জানান তিনি। সর্বশেষ হামলার তথ্যচিত্র সাম্প্রতিক লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরুর পর গতকাল বুধবার সবচেয়ে বড় হামলা চালানো হয়েছে। এ হামলায় অন্তত ২৫৪ জন নিহত হয়েছেন এবং ১১০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে। মৃতের সংখ্যা সর্বোচ্চ ছিল বৈরুতে, যেখানে ৯১ জন নিহত হয়েছেন। তবে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মৃতের সংখ্যা ১৮২ জন বলে জানিয়েছে এবং বলেছে যে এটি চূড়ান্ত সংখ্যা নয়। এসব হামলার পরপরই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সমন্বিত হামলাটি চালিয়েছে। গতকাল বুধবার ১০ মিনিটের মধ্যে বৈরুত, বেকা উপত্যকা ও দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর ১০০টিরও বেশি কমান্ড সেন্টার ও সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা। লেবাননে ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে ১২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যা মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে বলেও জানান বিশ্লেষকরা।
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
