|
সাম্রাজ্যবাদের গোরস্তান ইরান, এবার হবে কি?
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() সাম্রাজ্যবাদের গোরস্তান ইরান, এবার হবে কি? ১৮৯২ সালের তামাক বয়কট থেকে শুরু করে ১৯০৬ সালের সাংবিধানিক বিপ্লব পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনা প্রবাহে ইরানের সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের এক অভূতপূর্ব ঐক্য দেখা গেছে। এটি কেবল নির্দিষ্ট কোনো পণ্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল না, বরং ছিল বিদেশী শক্তির হাতে দেশের সার্বভৌমত্ব তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে এক জাতীয় প্রতিরোধ। যখনই কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মনে করেছে তারা ভয় দেখিয়ে বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে একটি জাতিকে বশীভূত করবে, তখনই ইরান প্রমাণ করেছে যে অবমাননা কখনও আনুগত্য তৈরি করে না। উল্টো এটি সমাজমানসে এমন এক ক্ষোভের সঞ্চার করে যা সময়মতো এক মহাবিস্ফোরণে রূপ নেয়। মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের নেতৃত্বে ১৯৫১ সালে ইরানের তেল সম্পদ জাতীয়করণ ছিল সার্বভৌমত্বের পথে এক সাহসী পদক্ষেপ। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের চক্রান্তে ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান সেই স্বপ্নকে সাময়িকভাবে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল। শাহের শাসন পুনরায় চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পশ্চিমারা যে বার্তা দিতে চেয়েছিল তা হলো—মধ্যপ্রাচ্যে কোনো স্বাধীন সত্তার স্থান নেই। তবে ১৯৫৩ সালের সেই জখম ইরানিরা ভুলে যায়নি; বরং দশকের পর দশক ধরে পুঞ্জীভূত হওয়া সেই ক্ষোভই ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের মূল জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছিল। বর্তমান সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসনের ইরান বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গিকে ইতিহাসের সেই পুরনো অন্ধত্বেরই পুনরাবৃত্তি বলা চলে। ইরানকে এবং তাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক বিবর্তনকে বুঝতে না পারাটা কেবল অজ্ঞতা নয় বরং এটি একটি ঐতিহাসিক অন্ধত্ব। ট্রাম্পের ভাষায় ইরানীদের প্রতি যে অসম্মানজনক শব্দ ব্যবহার করা হয়, তা মূলত ইরানের জনগণের ভেতরকার ঐক্যকে আরও দৃঢ় করেছে। পশ্চিমারা যখন মনে করছে তারা শক্তি প্রদর্শন করে ইরানকে নতজানু করবে, ঠিক তখনই ইরানীরা তাদের ইতিহাসের গভীর থেকে শক্তি সংগ্রহ করে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। ইতিহাসের এই একই চিত্র আমরা আলজেরিয়ায় আমির আবদেলকাদেরের প্রতিরোধে, সুদানের মাহদি আন্দোলনে কিংবা লিবিয়ার সেনুসি অর্ডারের লড়াইয়ে দেখেছি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই আধ্যাত্মিক শক্তি এবং সাধারণ মানুষের মর্যাদা রক্ষার লড়াই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোকে নাস্তানাবুদ করেছে। মরক্কোর রিফ বিদ্রোহ থেকে শুরু করে মধ্য এশিয়ার নকশবন্দি সিলসিলার প্রতিরোধ পর্যন্ত সবখানেই একটি সাধারণ সত্য স্পষ্ট—যখনই সাধারণ জীবনযাত্রাকে কামানের গোলার মুখে ফেলা হয়েছে, তখনই সেই সমাজ এক অপরাজেয় প্রতিরোধ বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছে। ইরানের ওপর দশকের পর দশক ধরে চলা চাপ এবং সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ট্রাম্প প্রশাসন যখন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু বানায়, তখন তারা বুঝতে ব্যর্থ হয় যে এটি কেবল একজন ব্যক্তির ওপর আক্রমণ নয়, বরং কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার ওপর আঘাত। বিশেষ করে পবিত্র মাসে এই ধরনের পদক্ষেপকে ইরানীরা তাদের পবিত্রতার অবমাননা হিসেবে গ্রহণ করেছে। ফলে যে অনৈক্য বা ফাটল পশ্চিমারা আশা করেছিল, তার বদলে তারা এক ইস্পাতকঠিন সংহতির মুখোমুখি হয়েছে। গাজার একটি ক্ষুদ্র অবরুদ্ধ জনপদ কিংবা লেবাননের মতো ছোট একটি দেশ যখন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে দশকের পর দশক লড়াই চালিয়ে যায়, তখন তাকে কেবল অস্ত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এটি মূলত মর্যাদাবোধের এক জীবন্ত রূপ, যা মানচিত্রে দেখা যায় না কিংবা সামরিক ভারসাম্যের পাল্লায় মাপা যায় না। আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো মনে করে তারা এলাকা দখল করলেই বিজয় অর্জন করবে, কিন্তু তারা বুঝতে পারে না যে মানুষের মন থেকে প্রতিরোধের চেতনা উপড়ে ফেলা অসম্ভব। তিউনিসীয় কবি আবু আল-কাসিম আল-শাব্বির সেই বিখ্যাত সতর্কবাণী আজ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর জন্য প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে থাকা আগুন যে কোনো সময় দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতে পারে। যারা কাঁটা বপন করে, তাদের শেষ পর্যন্ত সেই কাঁটার আঘাতই সইতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ইরানের অনমনীয় অবস্থান আবারও প্রমাণ করছে যে, মর্যাদার লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কোনো জুলুমবাজ শক্তিই স্থায়ী জয় লাভ করতে পারে না। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
