|
এক কূপ যেভাবে বদলে দিল পৃথিবী
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() এক কূপ যেভাবে বদলে দিল পৃথিবী গল্পের শুরু আমাদের গল্প শুরু পশ্চিম পেনসিলভানিয়ায়। পাহাড়ের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে অয়েল ক্রিক নামে একটি নদী। সেখানে মাটির ওপরে উঠে আসত পেট্রোলিয়াম তেল। সেনেকা আদিবাসীরা যুদ্ধের সময় এই তেল দিয়ে মুখে রং মাখাত, শরীরে নকশা আঁকত। আর তাদের নৌকার ফাঁক বন্ধ করত। এর নাম ছিল ‘সেনেকা অয়েল’। রক অয়েলও বলা হতো। মজার ব্যাপার হলো, এই তেল ভেষজ বা অলৌকিক ওষুধের মতোও ব্যবহার করত তারা। বাতের ব্যথা কমাতে, পোড়া জায়গা বা খোলা ঘা সারাতেও এর ব্যবহার ছিল। এমনকি চলাচলের জন্য ব্যবহৃত খচ্চরের ঘায়ের চিকিৎসায়ও এটি লাগানো হতো। তখনো বিদ্যুৎ বাতির আবিষ্কার হয়নি। আলো আসত মূলত মোমবাতি ও গলানো পশুর চর্বি থেকে। ধনীরা তাদের বাতিতে তিমির তেল ব্যবহার করত, কিন্তু তা খুব ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছিল। তাই বাজারে আলো জ্বালাতে নতুন কোনো উৎসের প্রয়োজন দেখা দেয়। তখনই মাটির ওপরে ভেসে থাকা এই রক অয়েলের দিকে নজর পড়ে। ১৮৫৪ সালে পশ্চিম পেনসিলভানিয়া থেকে কিছু রক অয়েলের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, এটি দিয়ে খুব ভালো মানের কেরোসিন নামের একটি পণ্য তৈরি করা সম্ভব। ফলে যদি যথেষ্ট রক অয়েল পাওয়া যায়, তবে তা কম দামে বিক্রি করে বাতির তেলের বাজার দখল করা যাবে। তাই সেনেকা অয়েল কোম্পানি নামে একটি কোম্পানি একজনকে নিয়োগ দেয়। ১৮৫৭ সালে তাঁকে পাঠানো হয় ছোট্ট শহর টাইটাসভিলে। তাঁর নাম কর্নেল এডউইন ড্রেক। কর্নেল ড্রেক তেল অনুসন্ধানকারী হিসেবে বিশেষ যোগ্য ছিলেন না। আসলে তখন তেল খোঁজার জন্য বিশেষভাবে যোগ্য, এমন কেউই ছিলেন না। তাঁর অন্যতম যোগ্যতা ছিল, তিনি ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী এবং তাঁর কাছে একটি পাস ছিল বলে তিনি বিনা খরচে ট্রেনে ভ্রমণ করতে পারতেন। তখন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে রেলের ভালো বিকল্প ছিল না। ড্রেক আসল কর্নেলও ছিলেন না; স্থানীয় গ্রাম্য মানুষদের মুগ্ধ করার জন্য তিনি এই সামরিক উপাধি ব্যবহার করতেন। এখানে আগে থেকেই ডেরিকের প্রচলন ছিল। ডেরিক হলো খননকাজের জায়গায় দাঁড় করানো উঁচু কাঠের বা লোহার একটি কাঠামো। এর সাহায্যে মাটিতে গর্ত খোঁড়া, পাইপ নামানো ও তোলা, আর খননের যন্ত্রপাতি চালানো হতো। স্থানীয়রা এই ডেরিক ব্যবহার করত লবণ উত্তোলনের খননকাজে। শুরুর দিকে ড্রেকের চেষ্টার তেমন কোনো ফল দেখা যায়নি। খালের ধারে তেল পাওয়া যেত ঠিকই, তবে মাটির নিচ থেকে উত্তোলনের কথা কেউই ভাবেনি। প্রথম বছর শেষেই টাকার টান পড়ে যায়, আর ড্রেকের পৃষ্ঠপোষকেরা অধৈর্য হয়ে ওঠেন। তারপর ১৮৫৯ সালের বসন্তে তিনি উইলিয়াম এ স্মিথ নামের এক সাবেক কামারকে কাজের জন্য নেন। তিনি ‘আংকেল বিলি’ নামে পরিচিত ছিলেন। আংকেল বিলির কূপ খননের দক্ষতা ও জ্ঞান ছিল। কর্নেল ড্রেক তেলের সম্ভাবনা দেখছিলেন ঠিকই, কিন্তু কীভাবে মাটির গভীরে গিয়ে নিরাপদে খনন করতে হবে, সেই ব্যবহারিক দক্ষতা তাঁর ছিল না। এই জায়গাতেই আংকেল বিলির জ্ঞান কাজে লাগে। তারপর ১৮৫৯ সালের ২৮ আগস্ট, কূপের মুখ দিয়ে তেল উঠে আসে। সেদিন ছিল রোববার। কর্নেল ড্রেকই খননের সময় পাইপ ব্যবহারের কথা প্রথম ভাবেন। এটিই ছিল তুরুপের মূল তাস। অবশেষে ১৮৫৯ সালের ২৭ আগস্ট ড্রিল প্রায় ৬৯ দশমিক ৫ ফুট গভীরে পৌঁছায়। পরদিন সকালে আংকেল বিলিই প্রথম কূপের ভেতরে তেল উঠতে দেখেন। তারপর পাম্প করে তেল তোলা হয়। মজার ব্যাপার হলো সেদিনই কর্নেল ড্রেক তাঁর শেষ টাকা আর কাজ বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশও হাতে পেয়েছিলেন। প্রথম যে তেল পাওয়া গিয়েছিল, তা ব্যারেলপ্রতি ৪০ ডলারে বিক্রি হয়েছিল। এ ঘটনাই টাইটাসভিলের সেই কূপকে ইতিহাসে জায়গা দেয় এবং আধুনিক বাণিজ্যিক তেলশিল্পের সূচনা হিসেবে দেখা হয়। তবে ড্রেকের নাম বেশি আলোচিত হলেও, আংকেল বিলি স্মিথ ছাড়া এই সাফল্য সম্ভব হতো না—এ কথা ইতিহাসবিদেরাও মানেন। ওটা ছিল উন্মাদ এক সময়। হঠাৎ উত্থান, আবার হঠাৎ ধস। পশ্চিম পেনসিলভানিয়ার তেলাঞ্চলে রাতারাতি ভাগ্য বদলে যাওয়ার গল্প যেমন ছিল, তেমনি ছিল মুহূর্তে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার কাহিনি। মাত্র দুই বছরের মধ্যে একটি কূপে বিনিয়োগ করা ১ ডলার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত মুনাফা মিলেছিল। কিন্তু সেই উন্মাদনা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে এক বছরের মধ্যেই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলার থেকে নেমে দাঁড়ায় মাত্র ১০ সেন্টে। কারণ, শুরুটা ছিল নিয়ন্ত্রণহীন। সবাই তখন খনন করছে। কোথাও কোথাও কূপগুলো এত কাছাকাছি ছিল যে মনে হতো, একটির ওপর আরেকটি বসানো। খননকাজে কোনো পরিকল্পনা ছিল না, নিয়ন্ত্রণও ছিল না। প্রকৌশলগত দিক থেকেও ক্ষেত্রগুলোর ব্যবস্থাপনা ছিল দুর্বল। লাগামহীন অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে বহু ক্ষেত্র খুব দ্রুতই ফুরিয়ে যেত। আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ হয়েছিল ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত। এই গৃহযুদ্ধের পর তেলজ্বর আরও তীব্র হয়ে ওঠে। পিথোল নামে এক জায়গায় বিপুল পরিমাণ তেল মেলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় উন্মত্ত ছোটাছুটি। সব ধরনের মানুষ হেঁটে বা ঘোড়ায় চড়ে সেখানে যেতে থাকে। ১৮৩৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া রকফেলার খুব অল্প বয়স থেকেই ব্যবসায় নামেন। কিশোর বয়সে তিনি ক্লিভল্যান্ডে এক কমিশন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সহকারী হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করেন। সেখানে তিনি মাল পরিবহন, ভাড়া, দর-কষাকষি আর খরচ নিয়ন্ত্রণের কৌশল শেখেন। পরে এই দক্ষতাই তেল ব্যবসায় কাজে লাগান। কিন্তু পিথোলের জৌলুসও ছিল ক্ষণস্থায়ী। মাত্র ৫০০ দিনের মধ্যে তেল ফুরিয়ে যায়। যারা তড়িঘড়ি করে স্টিম ইঞ্জিন কিনে তেলক্ষেত্রে পাঠিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তাদের সেগুলো ভাঙা লোহা হিসেবে বিক্রি করতে হয়। যে জমির একটি খণ্ড উন্মাদনার সময় ২০ লাখ ডলারে বিক্রি হয়েছিল, ১২ বছর পরে তা নিলামে ওঠে মাত্র ৪ ডলার ৩৭ সেন্টে। অল্প সময়ের মধ্যেই পিথোল ভূতের শহরে পরিণত হয়। বলা হতো, এত মানুষকে একসঙ্গে এত দ্রুত ধনী হতে এবং আবার নিঃস্ব হয়ে যেতে আর কখনো দেখা যায়নি। আসলে আমেরিকার শুরুর তেলশিল্প তাই শুধু সম্পদের ইতিহাস নয়, অস্থিরতা, অতিরিক্ত লোভ আর দ্রুত পতনের ইতিহাসও। এই তেল-উন্মাদনার ভেতরেই নতুন ভাগ্যের খোঁজে সেখানে এসেছিল টারবেল পরিবার। বাবা ফ্রাঙ্কলিন টারবেল, মা এসথার এবং তাঁদের তিন বছরের মেয়ে আইডা—এই পরিবারটি পেনসিলভানিয়ার চেরি রান এলাকায় বসতি গড়ে। এই পরিবারটির কথা মনে রাখা জরুরি। আইডার বাবা ফ্রাঙ্কলিন টারবেল ছিলেন পেশায় কাঠমিস্ত্রি। তিনি কাঠের ব্যারেল বানাতে জানতেন। তখন তেল রাখা হতো ব্যারেলে, মাপা হতো ব্যারেলে, আর পরিবহনও করা হতো ব্যারেলে ভরে। ঘোড়ার গাড়িচালকেরা ব্যারেলে ভরা তেল নিয়ে যেতেন অয়েল ক্রিক পর্যন্ত। সেখান থেকে ব্যারেলগুলো নৌকায় তুলে পাঠানো হতো পিটার্সবার্গের শোধনাগারে। ব্যারেলের চাহিদা তখন এত বেশি ছিল যে প্রয়োজনমতো জোগান দেওয়া যাচ্ছিল না। ফ্রাঙ্কলিন টারবেল ঠিক সময়েই ঠিক জায়গায় ছিলেন। তখন পর্যাপ্ত ব্যারেল তৈরি হতো না। তাই মদের ব্যারেল, তারপিনের ব্যারেল, আখের গুড়ের ব্যারেল—যে ধরনের পিপাই পাওয়া যেত, সবই ব্যবহার করা হচ্ছিল। পাশাপাশি তেলের জন্য নতুন ব্যারেলও বানানো হচ্ছিল। তখন এই চিটচিটে পদার্থটিকে ধরে রাখাই ছিল সেটি খুঁজে পাওয়ার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ। ফ্রাঙ্কলিন টারবেল ছিলেন উদ্ভাবনী স্বভাবের মানুষ। তিনি তেল সংরক্ষণের জন্য একধরনের ট্যাংক বানানোর উপায় বের করেন। এভাবেই তিনি কাঠের ট্যাংক তৈরি শুরু করেন। তাঁর ব্যবসার নাম হয় ‘টারবেল’স ট্যাংকস’। ব্যবসায় তিনি দ্রুত সফল হন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি জীবনে যা কখনো কল্পনাও করেননি, তার চেয়ে বেশি অর্থ উপার্জন করেছিলেন। কিন্তু এই সাফল্যও স্থায়ী হয়নি। বেশি দিন না যেতেই সেই কাঠের ট্যাংকগুলো অচল হয়ে পড়ে। কারণ, তেল সংরক্ষণের জন্য ধাতব ট্যাংক আরও কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। তারপরও টারবেল পরিবারের গল্প থেমে থাকেনি। পিথোলের ধসের পর শহরের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ যে হোটেলটি তৈরি করতে ৬০ হাজার ডলার খরচ হয়েছিল, সেটি ফ্রাঙ্কলিন টারবেল কিনে ফেলেন মাত্র ৬০০ ডলারে। পরে তিনি সেটি ভেঙে ফেলেন। কাঠগুলো টাইটাসভিলে নিয়ে গিয়ে সেগুলো দিয়ে পরিবারের জন্য একটি সুন্দর বাড়ি তৈরি করেন। সেই কাঠের বাড়িতেই আইডা টারবেল তাঁর শৈশব কাটান। তখন ১৮৬৫ সাল। তাঁর বয়স আট। পরের জীবনে এই আইডা টারবেলই আমেরিকার তেলশিল্পের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে উঠবেন। এখন আমরা কথা বলব তেলশিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটিকে নিয়ে। ১৮৩৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া রকফেলার খুব অল্প বয়স থেকেই ব্যবসায় নামেন। কিশোর বয়সে তিনি ক্লিভল্যান্ডে এক কমিশন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সহকারী হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করেন। সেখানে তিনি মাল পরিবহন, ভাড়া, দর-কষাকষি আর খরচ নিয়ন্ত্রণের কৌশল শেখেন। পরে এই দক্ষতাই তেল ব্যবসায় কাজে লাগান। জন ডি রকফেলার ছিলেন সংখ্যার মানুষ। হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করার পর থেকেই সংখ্যার প্রতি তাঁর গভীর আস্থা তৈরি হয়। ১৮৫৯ সালে পেনসিলভানিয়ায় তেল আবিষ্কারের পর রকফেলার দ্রুত বুঝতে পারেন, শুধু তেল তোলা নয়, তেল শোধন করাই বেশি লাভজনক হতে পারে। কারণ, আলো জ্বালানোর জন্য কেরোসিনের চাহিদা বাড়ছিল, আর অপরিশোধিত তেলকে বাজারজাতযোগ্য জ্বালানিতে রূপ দেওয়ার জন্য পরিশোধনাগার দরকার ছিল। এই সুযোগ ধরেই ১৮৬৩ সালে রকফেলার তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার মরিস ক্লার্কের সঙ্গে তেল পরিশোধনের ব্যবসায় ঢোকেন। তাঁরা ক্লিভল্যান্ডে একটি রিফাইনারি গড়েন এবং তেলশিল্পে অভিজ্ঞ স্যামুয়েল অ্যান্ড্রুজকে সঙ্গে নেন। ক্লিভল্যান্ড তখন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল, কারণ রেলপথে পেনসিলভানিয়ার তেল সেখানে আনা সহজ ছিল। রকফেলার শুরু থেকেই বড় আকারে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এগোতে চাইতেন। খরচ কমানো, লাভ পুনর্বিনিয়োগ করা এবং আরও রিফাইনারি কিনে নেওয়ার কৌশল ছিল তাঁর। তবে ক্লার্ক তুলনামূলকভাবে ঝুঁকি কম নিতে চাইতেন। এই মতভেদের জেরে ১৮৬৫ সালে তাঁরা অংশীদারত্ব ভাঙার সিদ্ধান্ত নেন এবং ব্যবসাটি নিলামে তোলা হয়। এই নিলামে রকফেলার কৌশলী ভূমিকা নেন। শুরুতে তিনি তুলনামূলক কম দর থেকে বিড শুরু করেন, কিন্তু ধীরে ধীরে দর বাড়াতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রায় ৭২ হাজার ৫০০ ডলারে ক্লার্কের অংশ কিনে নেন। এর ফলে রকফেলার ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এককভাবে নিজের হাতে নিয়ে আসেন। এরপর প্রতিষ্ঠানের নাম হয় রকফেলার অ্যান্ড অ্যান্ড্রুজ। তেল শোধনাগার বড় হতে থাকায় জন ডি রকফেলারের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধাও দ্রুত বাড়তে থাকে। বড় আকারে উৎপাদনের ফলে এক গ্যালন কেরোসিন শোধনের খরচ প্রায় ৬ সেন্ট থেকে ৩ সেন্টে নামিয়ে আনেন তিনি। শুরুতেই তিনি বুঝেছিলেন, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; পরিবহন খরচ নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে লাভ টেকসই হবে না। ক্লিভল্যান্ডে কয়েকটি রেলপথ কোম্পানির প্রতিযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি বিশেষ রেল ছাড় আদায় করেন। বড় পরিমাণে তেল পাঠানো ও নিজস্ব ট্যাংকারবাহী রেলবগির বহরের কারণে তিনি এমন এক গ্রাহকে পরিণত হন, যাঁকে বাড়তি সুবিধা দিতে রেল কোম্পানিগুলো আগ্রহী হয়ে ওঠে। ১৮৬০-এর দশকের শেষ দিকে তেলশিল্পে ভয়াবহ অস্থিরতা দেখা দেয়। অতিরিক্ত উৎপাদন, অদক্ষতা আর লাগামহীন প্রতিযোগিতায় দাম পড়ে যায়, ব্যবসা হয়ে ওঠে অনিশ্চিত। রকফেলারের চোখে এটি ছিল বিশৃঙ্খল এক খাত। তিনি মনে করেন, শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে উৎপাদন, শোধন, পরিবহন ও বিপণন—এই চারটি স্তরকে একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এই ভাবনা থেকেই ১৮৭০ সালে তিনি স্ট্যান্ডার্ড অয়েল প্রতিষ্ঠা করেন এবং শুরু করেন একত্রীকরণের কৌশল। এই কৌশলের একটি বিতর্কিত অধ্যায় ছিল সাউথ ইমপ্রুভমেন্ট কোম্পানি। ১৮৭১ সালে রেলপথ কোম্পানি ও বড় তেল ব্যবসায়ীদের মধ্যে গড়ে ওঠা এই গোপন ব্যবস্থায় রকফেলারের কোম্পানি কম ভাড়ায় তেল পাঠানোর সুযোগ পেত। শুধু তা-ই নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলো যে ভাড়া দিত, তার একটি অংশ ‘ড্র-ব্যাক’ হিসেবে আবার রকফেলারের হাতে ফিরত। ফলে তাঁর পরিবহন খরচ কমে যেত, আর প্রতিদ্বন্দ্বীদের খরচ তুলনামূলকভাবে বেড়ে যেত। ১৮৭২ সালে এই গোপন চুক্তির খবর ফাঁস হয়ে গেলে তেলাঞ্চলে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। টাইটাসভিলে হাজারো মানুষ প্রতিবাদে জড়ো হয়। স্বাধীন তেল ব্যবসায়ীরা সংগঠিত হয়ে এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। শেষ পর্যন্ত সাউথ ইমপ্রুভমেন্ট কোম্পানির পরিকল্পনা ভেঙে পড়ে। কিন্তু রকফেলার থামেননি। একই সময় তিনি ক্লিভল্যান্ডের বহু প্রতিদ্বন্দ্বী শোধনাগার কিনে নেন। কম দামে বিক্রি, বিশেষ রেল ছাড়, গোপন বাজার তথ্য সংগ্রহ—বিভিন্ন কৌশলে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর চাপ বাড়াতে থাকেন। রকফেলারের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল সস্তায় আলো পৌঁছে দেওয়া। সে সময় তেলশিল্পের মূল পণ্য ছিল কেরোসিন, যা দিয়ে ঘরে ঘরে আলো জ্বালানো হতো। কিন্তু এর আড়ালে তিনি গড়ে তুলছিলেন এক নতুন করপোরেট কাঠামো, যেখানে উৎপাদন থেকে বিক্রি পর্যন্ত পুরো শৃঙ্খল এক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ১৮৭০-এর দশকের শুরুতে তুলনামূলক ছোট অংশ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, অল্প কয়েক বছরের মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড অয়েল যুক্তরাষ্ট্রের তেল শোধন ক্ষমতার বড় অংশ দখলে নেয়। নয় বছরের মধ্যে এই নিয়ন্ত্রণ প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছে যায়। তবে এই একচেটিয়া আধিপত্য চিরস্থায়ী ছিল না। স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের শক্তি গড়ে উঠেছিল মূলত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পুরোনো তেলক্ষেত্র—পেনসিলভানিয়া, ওহাইও ও পশ্চিম ভার্জিনিয়াকে ঘিরে। পরে দক্ষিণ-পশ্চিম ও পশ্চিমাঞ্চলে নতুন তেলক্ষেত্র আবিষ্কৃত হতে থাকলে পরিস্থিতি বদলে যায়। নতুন ক্ষেত্রগুলো বেশি উৎপাদনশীল ছিল, আর সেখানে নতুন কোম্পানির অবস্থান ছিল শক্ত। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে ওঠে ১৯০১ সালে টেক্সাসের স্পিন্ডলটপ। সেখানে তেল আবিষ্কারের পর যেন নতুন করে তেল-উন্মাদনা শুরু হয়। সারা দেশ থেকে মানুষ সেখানে ছুটে যায়। এই সময়েই নতুন কোম্পানিগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। টেক্সাস ফুয়েল কোম্পানি, যা পরে টেক্সাকো নামে পরিচিত হয়, দ্রুত বড় খেলোয়াড়ে পরিণত হয়। পুরোনো কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে তেলশিল্প তখন নতুন ভৌগোলিক বাস্তবতায় প্রবেশ করে। এই পুরো যাত্রায় রকফেলারের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল, তেলশিল্পকে একটি ছড়ানো-ছিটানো, বিশৃঙ্খল খাত থেকে সংগঠিত, বড় আকারের করপোরেট কাঠামোয় রূপ দেওয়া। একই সঙ্গে তিনি আরও দেখান যে বাজার দখলের এই পথ শক্তিশালী, একই সঙ্গে বিতর্কিত। আধুনিক তেলশিল্পের শুরুর কাহিনি আসলে কেরোসিনের কাহিনি। কারণ, অপরিশোধিত তেলকে প্রথম বড় বাণিজ্যিক মূল্য দিয়েছিল কেরোসিনই। কানাডীয় চিকিৎসক ও ভূতত্ত্ববিদ আব্রাহাম গেসনার ১৮৪০-এর দশকে কয়লা ও বিটুমিনাস পদার্থ থেকে অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার, কম ধোঁয়াযুক্ত একধরনের আলোর জ্বালানি তৈরি করেন। এর নাম দেন কেরোসিন। সাধারণভাবে ১৮৪৬ সালকে তাঁর এই আবিষ্কার ও প্রদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ সময় ধরা হয়। কেরোসিন দ্রুত গুরুত্ব পায়, কারণ তখন ঘরে আলো জ্বালাতে তিমির তেল ব্যবহৃত হতো, আর সেটি ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছিল। তুলনায় কেরোসিন ছিল সস্তা, উজ্জ্বল এবং অনেক বেশি ব্যবহারযোগ্য। ফলে ঘরে ঘরে আলোর নতুন জ্বালানি হিসেবে এটি দ্রুত বাজার দখল করে। ১৮৫৯ সালে এডউইন ড্রেক প্রথম সফল বাণিজ্যিক তেলকূপ খনন করলে পরিস্থিতি নতুন দিকে মোড় নেয়। কূপ থেকে ওঠা অপরিশোধিত তেলের প্রধান ব্যবহার ছিল কেরোসিন তৈরি করা। অর্থাৎ তখন তেলের সবচেয়ে দামি অংশ ছিল না পেট্রল। শোধনের পর গ্যাসোলিন বা পেট্রলের তেমন বাজার ছিল না, অনেক ক্ষেত্রে তা ফেলে দেওয়া হতো। ১৮৬০ থেকে ১৮৯০-এর দশকে কেরোসিন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। জন ডি রকফেলারও মূলত কেরোসিনের ব্যবসাকে ঘিরেই স্ট্যান্ডার্ড অয়েল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। তবে এই আধিপত্য চিরস্থায়ী হয়নি। উনিশ শতকের শেষ ভাগে বৈদ্যুতিক বাতির আবির্ভাব নতুন এক যুগের সূচনা করে। ১৮৭৯ সালে থমাস এডিসন কার্যকর ইনক্যান্ডিসেন্ট বৈদ্যুতিক বাতি বাজারে আনেন। এতে শহরাঞ্চলে ধীরে ধীরে কেরোসিনের জায়গা নিতে শুরু করে বিদ্যুৎ। এরপর তেলশিল্পে আসে আরেকটি বড় মোড়, মোটরগাড়ির যুগ। হেনরি ফোর্ড ১৮৯৬ সালে তাঁর প্রথম গাড়ি কোয়াড্রিসাইকেল তৈরি করেন। তবে সেটি ছিল মূলত পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। আসল পরিবর্তন শুরু হয় ১৯০৮ সালে, যখন বাজারে আসে মডেল টি। এই গাড়িই ফোর্ডকে ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা দেয়। কারণ, এটি মোটরগাড়িকে ধীরে ধীরে শুধু ধনীদের বিলাসপণ্য না রেখে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার পথ খুলে দেয়। এই পরিবর্তন আরও গতি পায় ১৯১৩ সালে, যখন ফোর্ড গাড়ি তৈরির জন্য চলন্ত অ্যাসেম্বলি লাইন চালু করেন। এতে গাড়ি তৈরির সময় ও খরচ অনেক কমে যায়। ফলে উৎপাদন বাড়ে, দাম কমে, আর মোটরগাড়ির বাজার দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে। শিল্পবিপ্লবের পর এটি ছিল উৎপাদনব্যবস্থার আরেক বড় রূপান্তর, যার প্রভাব পড়ে মানুষের জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও। মোটরগাড়ির এই বিস্তার তেলের বাজারকেও বদলে দেয়। আগে তেলশিল্পের প্রধান পণ্য ছিল কেরোসিন, যা দিয়ে ঘরে আলো জ্বালানো হতো। গ্যাসোলিন তখন তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ উপজাত হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু গাড়ির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই গ্যাসোলিনই হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। গ্যাসোলিন হলো পেট্রোলিয়াম বা অপরিশোধিত তেল শোধন করে পাওয়া একধরনের হালকা জ্বালানি, যা মূলত মোটরগাড়ির ইঞ্জিনে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ তেলের ইতিহাসে তখন আলো জ্বালানোর যুগ পেছনে পড়ে, সামনে আসে চলাচলের যুগ। আইডা টারবেলের লেখা প্রকাশ হতে থাকলে রকফেলারের প্রতিক্রিয়া ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত, ‘দুনিয়াকে কথা বলতে দাও।’ এখানেই তিনি বড় ভুল করেন। শিল্পযুগের ভবিষ্যৎ তিনি আগেভাগে বুঝেছিলেন, কিন্তু নতুন যুগের গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যম ও জনমতের শক্তিকে ঠিকমতো মূল্য দেননি। আমরা ফ্রাঙ্কলিন টারবেল পরিবারের কথা আগে বলেছিলাম। ফ্রাঙ্কলিন টারবেল দেখেছিলেন, কীভাবে স্বাধীন ব্যবসায়ীরা ধীরে ধীরে নিজেদের স্বাধীনতা হারাচ্ছে। তাঁর অংশীদারসহ অনেকে রকফেলারের চাপে দেউলিয়া হয়ে যায়। এই আর্থিক অস্থিরতা পরিবারের ওপরও বড় চাপ ফেলে। ছোটবেলায় আইডা টারবেল দেখেছিলেন, ব্যবসায়িক সমন্বয়ের পেছনে মানুষের কত বড় ক্ষতি লুকিয়ে থাকে। আইডা টারবেল কাজটি করেছিলেন খুব ধৈর্য ধরে, স্তরে স্তরে। তিনি শুরুতে ম্যাকক্লুর’সকে স্ট্যান্ডার্ড অয়েল নিয়ে ছোট সিরিজের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু কাজ করতে গিয়ে এত তথ্য পান যে সেটি শেষ পর্যন্ত ১৯০২ থেকে ১৯০৪ সালের মধ্যে ১৯ কিস্তির বিশাল ধারাবাহিকে পরিণত হয়। তাঁর তদন্তের প্রথম বড় শক্তি ছিল পাবলিক রেকর্ড। স্ট্যান্ডার্ড অয়েল এর আগে সরকারি তদন্তের মুখে পড়েছিল। ফলে আদালতের কাগজপত্র, শুনানির নথি, আইনগত দলিল, রেলপথ চুক্তির রেকর্ড—এসবের অনেকটাই জনসমক্ষে ছিল। টারবেল এই বিপুল কাগজপত্র খুঁটিয়ে পড়ে, আলাদা আলাদা তথ্য জুড়ে, কোম্পানির ব্যবসায়িক কৌশলের একটা পূর্ণ চিত্র দাঁড় করান। অর্থাৎ তিনি গুজবের ওপর ভর করেননি; আগে কাগজপত্রে ভিত্তি বানিয়েছেন। আইডা স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের সাবেক কর্মী, আইনজীবী, তেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের সঙ্গে কথা বলেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল হেনরি এইচ রজার্সের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ। রজার্স তখন স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের শীর্ষ নেতাদের একজন, কার্যত কোম্পানির সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন। বিখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েনের সহায়তায় টারবেল রজার্সের কাছে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। রজার্স শুরুতে ভেবেছিলেন, হয়তো তিনি স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের সাফল্যের গল্প লিখবেন; কিন্তু ধারাবাহিক আলোচনায় টারবেল তাঁর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা এবং ভেতরের দৃষ্টিভঙ্গি বের করে আনেন। আইডা টারবেল নিজে পেনসিলভানিয়ার তেলাঞ্চলে বড় হয়েছেন। তাঁর বাবা স্বাধীন তেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সাউথ ইমপ্রুভমেন্ট কোম্পানির মতো গোপন রেল-সমঝোতার ধাক্কা সরাসরি দেখেছিলেন। ফলে টারবেল জানতেন কোথায় খুঁজতে হবে, কোন প্রশ্ন করতে হবে, আর তেল ব্যবসার লোকেরা কোন ভাষায় কথা বলে। এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাঁকে বিষয়টির ভেতরে ঢুকতে সাহায্য করে, যদিও তিনি লেখায় আবেগ নয়, নথিভিত্তিক প্রমাণকে সামনে রেখেছিলেন। আইডার এই লেখা শুধু এক শিল্পপতির বিরুদ্ধে লেখা ছিল না, বরং দেখিয়েছিলেন কীভাবে করপোরেট ক্ষমতা গোপন চুক্তি ও পরিবহনব্যবস্থার সুবিধা ব্যবহার করে বাজার দখল করেছিল। আইডা টারবেলের লেখা প্রকাশ হতে থাকলে রকফেলারের প্রতিক্রিয়া ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত, ‘দুনিয়াকে কথা বলতে দাও।’ এখানেই তিনি বড় ভুল করেন। শিল্পযুগের ভবিষ্যৎ তিনি আগেভাগে বুঝেছিলেন, কিন্তু নতুন যুগের গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যম ও জনমতের শক্তিকে ঠিকমতো মূল্য দেননি। তাঁর ব্যবসা দীর্ঘদিন কঠোর গোপনীয়তার আড়ালে চলেছে। টারবেল প্রথমবার সেই আড়াল সরিয়ে জাতির সামনে ভেতরের চিত্র তুলে ধরেন। স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের আক্রমণাত্মক ব্যবসায়িক কৌশলকে অনেকেই নির্মম বলে মনে করতেন। একচেটিয়া ব্যবসার বিরুদ্ধে জন–অসন্তোষও বাড়তে থাকে। স্ট্যান্ডার্ড অয়েল ছিল এমন প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। ফলে কয়েকটি শিল্পোন্নত অঙ্গরাজ্য একচেটিয়া ব্যবসাবিরোধী আইন প্রণয়ন করে। পরে ১৮৯০ সালে মার্কিন কংগ্রেস শারম্যান অ্যান্টিট্রাস্ট আইন পাস করে। ১৮৯২ সালে ওহাইওর সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন, স্ট্যান্ডার্ড অয়েল ট্রাস্ট একচেটিয়া ব্যবসা পরিচালনা করছে এবং তা অঙ্গরাজ্যের আইন লঙ্ঘন করছে। রকফেলার এই রায় এড়াতে সব সম্পদ অন্য অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন কোম্পানির অধীনে সরিয়ে দেন। তবে এসব কোম্পানির পরিচালনা কাঠামো এমনভাবে সাজানো ছিল যে তিনিই কার্যত সব প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখেন। ১৮৯৯ সালে এসব কোম্পানিকে আবার একত্র করে স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি অব নিউ জার্সি নামে একটি হোল্ডিং কোম্পানি গঠন করা হয়। এটি ১৯১১ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল। পরে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন, কোম্পানিটি শারম্যান অ্যান্টিট্রাস্ট আইন লঙ্ঘন করেছে। ফলে এটি অবৈধ ঘোষণা করা হয়। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তেলের বিশাল ব্যবসাকে এর পর থেকে আইনের সীমার ভেতরে চলতে হয়। একই সময় শুরু হয় তেলের দ্বিতীয় যুগ, যেখানে পেট্রল বড় করপোরেশনগুলোর উত্থানকে ত্বরান্বিত করে। পরবর্তী সময়ের মোবিল, এক্সন, শেভরন, অ্যামোকো—সবই কোনো না কোনোভাবে সেই স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের উত্তরসূরি। রকফেলারে একচেটিয়া ব্যবসার সবচেয়ে বড় সমালোচক ও বিরোধী ছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট থিয়োডর রুজভেল্ট। রুজভেল্ট সব ধরনের বড় ব্যবসায়িক সমন্বয়ের বিরোধী ছিলেন না, কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড অয়েলকে তিনি বিশেষভাবে নিশানায় নেন। তাঁর সময়েই ট্রাস্টবিরোধী প্রশ্নটি জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসে। অত্যন্ত গোপনপ্রিয় রকফেলার পরে একজন জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করেন। সংবাদচিত্রের ক্যামেরার সামনে আসতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে তাঁর ভাবমূর্তি বদলাতে থাকে। কিন্তু আইডা টারবেলের লেখার কারণে তৈরি হওয়া বদনাম থেকে তিনি কখনো পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেননি। বলা হয় জন ডি রকফেলার হয়তো নৈতিক পরাজয় বরণ করেছিলেন। কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের উত্তরসূরি কোম্পানিগুলোর শেয়ার তাঁর হাতেই ছিল। সেগুলোর দাম বাড়তে থাকায় তাঁর সম্পদও দ্বিগুণ হয়ে যায়। বিপুল সম্পদ দিয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে মেনিনজাইটিস ও ইয়েলো ফিভারের বিরুদ্ধে অভিযান চালান। তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের জন্য প্রথমদিককার একটি কলেজও গড়ে তোলেন। জন ডি রকফেলার ১০০ বছরের পূর্ণ জীবন ছুঁতে পারেননি মাত্র ২৫ মাসের জন্য। একসময় তিনি ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষ, বিশ্বের প্রথম বিলিয়নিয়ার। আর এখন তিনি ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন সর্বকালের সবচেয়ে বড় দাতাদের একজন মানুষ, যিনি ৫৩ কোটি ডলার দান করে গেছেন। অনেকে অবশ্য বলেন, তাঁর এই দানশীলতা নাকি কেবল তাঁর করা অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত ছিল। সূত্র: ড্যানিয়েল ইয়ার্গিনের ‘দ্য প্রাইজ: দ্য এপিক কোয়েস্ট ফর অয়েল, মানি অ্যান্ড পাওয়ার’ আধুনিক তেলের ইতিহাস নিয়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী বইগুলোর একটি। বইটি ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয় এবং ১৯৯২ সালে জেনারেল ননফিকশন বিভাগে পুলিৎজার পুরস্কার পায়। এই লেখার মূল সূত্র এই বই। সঙ্গে প্রাসঙ্গিক আরও সূত্র ব্যবহার করা হয়েছে। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
