|
সাবেক আইজিপি বেনজীরের মামলার কী হাল?
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() সাবেক আইজিপি বেনজীরের মামলার কী হাল? পুলিশ মহাপরিদর্শক হিসেবে প্রায় আড়াই বছর দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে যান তিনি। সংবাদমাধ্যমে তার ও পরিবারের বিপুল সম্পদের তথ্য প্রকাশিত হলে বেনজীরের অবসরের বছর দুয়েক পর নড়েচড়ে বসে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুদকের অনুসন্ধানে বেনজীর ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে শত শত বিঘা জমি, একাধিক ফ্ল্যাট, রিসোর্ট, কোম্পানির শেয়ার অর্জন এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগের তথ্য উঠে আসে। আদালতের নির্দেশে এসব সম্পদের বড় অংশ জব্দ ও ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ দশায় রয়েছে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা আসার আগেই ২০২৪ সালের ৪ মে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে দেশ ছাড়েন বেনজীর আহমেদ। জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতন হলে সাবেক এই আইজিপির বিরুদ্ধে একের পর এক চাঁদাবাজি, হত্যাচেষ্টার মামলা হতে থাকে। আর দুদক পর্যায়ক্রমে অনুসন্ধান শেষে ছয়টি মামলা দায়ের করে। তিন মামলায় বেনজীরকে করা হয় প্রধান আসামি। পাশাপাশি স্ত্রী জীশান মির্জা, দুই মেয়ে ফারহিন রিশতা বিনতে বেনজীর ও তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের পৃথক তিন মামলায় তাকে সহযোগী দেখানো হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মামলাতেও আসামি হিসেবে বেনজীরের নাম রয়েছে। দুদকের করা মামলার মধ্যে বর্তমানে পাঁচটি মামলা তদন্তাধীন। আর অবৈধ সম্পদ অর্জনের এক মামলায় বেনজীরকে পলাতক দেখিয়ে বিচার শুরু হয়েছে। দ্রুতই মামলার বিচার শেষ হবে এমনটায় আশা করছে দুদক। অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং পাসপোর্ট জালিয়াতির দুই মামলার ভিত্তিতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি করা হয়েছিল। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই গত শুক্রবার দুবাই থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে দুবাই পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন বেনজীর আহমেদ। খুব শিগগির তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে বলে রোববার সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক, ছাড় দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। মামলার বিষয়ে দুদকের প্রসিকিউশন বিভাগের উপসহকারী পরিচালক আক্কাস আলী জানান, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুদকের করা অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যের নামে থাকা অপর পাঁচ মামলা তদন্তাধীন। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বলেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে পাসপোর্ট জালিয়াতি এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দায়ের করা দুটি মামলার ভিত্তিতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি করা হয়েছিল। ওই রেড নোটিসের পরিপ্রেক্ষিতেই দুবাইয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দুদকের কৌঁসুলি মীর আহমেদ আলী সালাম বলেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় পাঁচজনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। তিনি পলাতক থাকায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। দ্রুত সময়ে এই মামলার বিচার কাজ শেষ করা হবে। এছাড়া অপর মামলাগুলো তদন্ত হয়ে আসলে দ্রুত সময়ে শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে৷ বিচারাধীন মামলা ১১ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনে দুদকের উপপরিচালক হাফিজুল ইসলাম বাদী হয়ে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেনজীরের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেন। তদন্ত শেষে গত বছরের ৩০ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন এবং মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে অভিযোগপত্র দেন হাফিজুল ইসলাম। অভিযোগ পত্রে বলা হয়েছে, বেনজীর আহমেদ তার দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ৬ কোটি ৪৫ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৫ টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের ঘোষণা দেন। তবে তদন্তে তার নামে ৭ কোটি ৫২ লাখ ৬৮ হাজার ৯৮৭ টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ৮ কোটি ১৫ লাখ ৩১ হাজার ২৬৪ টাকার অস্থাবর সম্পদের সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়। এতে মোট ১৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকার সম্পদ অর্জনের প্রমাণ মিলেছে। বৈধ আয়ের উৎস হিসেবে পাওয়া গেছে ৬ কোটি ৫৯ লাখ ৪২ হাজার ৬৬৮ টাকা। ব্যয় বাদে নিট সঞ্চয় দাঁড়ায় ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৫৬ হাজার ৬৭৫ টাকা। ফলে বেনজীর আহমেদ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ১১ কোটি ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫৭৬ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে। এও বলা হয়েছে, বেনজীর আহমেদ এসব অর্থের অবৈধ উৎস, প্রকৃতি ও মালিকানা গোপন করে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও যৌথ মূলধনি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ, স্থানান্তর ও রূপান্তর করেছেন। গত ৮ মার্চ অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। এরপর ৩ মে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক আব্দুল্লাহ আল মামুন। মামলায় গত ১৩ মে বাদী হাফিজুল ইসলাম সাক্ষ্য দেন। আর ২০ মে সাক্ষ্য দেন চারজন। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২৩ জুন দিন ঠিক করা আছে। তদন্তাধীন পাঁচ মামলা অর্থপাচার মামলা: বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী জীশান মির্জা ও দুই মেয়ে ফারহিন রিশতা বিনতে বেনজীর ও তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি অর্থপাচারের অভিযোগে মামলা করে দুদক। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, বেনজীর আহমেদ অবৈধভাবে অর্জিত ১১ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নগদে তোলার পর কোথাও বিনিয়োগ করার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থ উত্তোলনের পরই বিদেশে চলে যান। বেনজীর ও তার স্ত্রী-কন্যারা ২০২৪ সালের বিভিন্ন সময় তাদের নামে দীর্ঘদিনের এফডিআর হিসাব মেয়াদোত্তীর্ণের আগেই একযোগে উত্তোলন করেছেন। এফডিআরের অর্থের গ্রহণযোগ্য কোনো উৎস পাওয়া যায়নি, যা বেনজীর আহমেদ র্যাবের মহাপরিচালক, পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করেছেন বলে মনে করছে দুদক। স্ত্রী ও দুই মেয়ের মামলায় সহযোগী আসামি বেনজীর: ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বেনজীরের স্ত্রী জীশান মির্জা, দুই মেয়ে ফারহিন রিশতা বিনতে বেনজীর ও তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করে দুদক। তিন মামলায় বেনজীরকে সহযোগী আসামি করা হয়। এসব মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, জীসান মির্জার বিরুদ্ধে ৩১ কোটি ৬৯ লাখ ৫৫ হাজার ১৪৯ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও ১৬ কোটি ১ লাখ ৭১ হাজার ৩৩৬ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে। ফারহিন রিশতা বেনজীরের বিরুদ্ধে ৮ কোটি ৭৫ লাখ ২৭৪ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে ৫ কোটি ৫৯ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। বেনজীর আহমেদের অবৈধ আয়ের মাধ্যমে তারা এই সম্পদ অর্জন করেছেন বলে দুদকের ভাষ্য। পাসপোর্ট জালিয়াতি মামলা: সরকারি চাকরিতে থেকেও নিজেকে বেসরকারি চাকরিজীবী দেখিয়ে পাসপোর্ট তৈরির ঘটনায় ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর বেনজীর আহমেদসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের উপপরিচালক হাফিজুল ইসলাম। বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে৷ এ মামলার অপর আসামিরা হলেন— ঢাকা বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের সাবেক পরিচালক মো. ফজলুল হক, সাবেক পরিচালক মুন্সী মুয়ীদ ইকরাম, পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন এবং ই-পাসপোর্ট ও স্বয়ংক্রিয় বর্ডার নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের টেকনিক্যাল ম্যানেজার সাহেনা হক। মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, বেনজীর আহমেদ সরকারি চাকরিজীবী হওয়ার পরও পাসপোর্টের আবেদনপত্রে পেশার স্থানে প্রাইভেট সার্ভিস উল্লেখ করে জাল জালিয়াতি-প্রতারণার আশ্রয় নেন। পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি, অতিরিক্ত আইজিপির পদমর্যাদায় র্যাবের মহাপরিচালক ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার পদে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি এই জালিয়াতি করেন। তিনি মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে প্রাইভেট সার্ভিস উল্লেখ করে বিভিন্ন সময়ে বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) ছাড়াই মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) ও ই-পাসপোর্টের (ইলেক্ট্রনিক পাসপোর্ট) জন্য আবেদন করেন। বাকি চার আসামি বেনজীর আহমেদের দাপ্তরিক পরিচয় সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে অবগত ছিলেন। এর পরেও বিভাগীয় অনাপত্তি সনদ (এনওসি) যাচাই না করে স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে পরস্পর যোগসাজশে বেনজীর আহমেদের নামে সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যু ও চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করেন। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক ছিলেন বেনজীর। তার আগে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ছিলেন র্যাবের মহাপরিচালক। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি অবসরে যান। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
