ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
সোমবার ২২ জুন ২০২৬ ৮ আষাঢ় ১৪৩৩
নিরাপদ প্রযুক্তিভিত্তিক এক স্কুল বাস সেবার গল্প
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Monday, 22 June, 2026, 1:38 PM

নিরাপদ প্রযুক্তিভিত্তিক এক স্কুল বাস সেবার গল্প

নিরাপদ প্রযুক্তিভিত্তিক এক স্কুল বাস সেবার গল্প

ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো ব্যস্ত  মেগাসিটিতে স্কুলগামী শিশুদের প্রতিদিনের যাতায়াত মা–বাবার জন্য এক নিত্যদিনের দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের নাম। যানজটের শহর, অনিরাপদ সড়ক আর গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনার মধ্যে সন্তানকে নিরাপদে স্কুলে পাঠানো এবং ফিরিয়ে আনা যেন এক যুদ্ধজয়ের শামিল। অভিভাবকদের এই দীর্ঘদিনের উদ্বেগকে স্বস্তিতে রূপান্তর করতে এবং দেশের স্কুল যাতায়াতব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও প্রযুক্তিবান্ধব করতে কাজ করছে দেশের অন্যতম শীর্ষ স্টার্টআপ পিউপিল স্কুল বাস লিমিটেড।

গত শনিবার চট্টগ্রামের খুলশী কনভেনশন হলে অনুষ্ঠিত বিপিও সামিট বাংলাদেশ ২০২৬ (চট্টগ্রাম)-এ দেখা হয় পিউপিল স্কুল বাস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আবদুর রশিদ সোহাগের সঙ্গে। কথায় কথায় তিনি তুলে ধরলেন তাঁর এই উদ্ভাবনী উদ্যোগের পেছনের গল্প, কীভাবে ১০ হাজার টাকায় শুরু করে উদ্যোগের মূল্য ১০ কোটি টাকায় দাঁড়াল, কীভাবে একজন–দুজন করে সাত হাজারের বেশি ছাত্রছাত্রী এই সেবা নিচ্ছেন ও বর্তমান অর্জন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা।

ব্যক্তিগত ভীতি থেকে সামাজিক উদ্যোগের সূচনা
কোনো বড় উদ্যোগের পেছনে প্রায়ই থাকে গভীর কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। পিউপিল স্কুল বাসের ধারণার পেছনেও রয়েছে তেমনই এক গল্প। আবদুর রশিদ  গণমাধ্যমকে বলেন, একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে প্রায় এক ঘণ্টা তাঁর নিজের সন্তানের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। একজন বাবা হিসেবে সেই মুহূর্তের ভয়, অনিশ্চয়তা আর অসহায়ত্ব আমাকে মানসিকভাবে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

তিনি উপলব্ধি করেন, দেশের হাজার হাজার অভিভাবক প্রতিদিন এই একই চরম দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে যান। প্রচলিত ও অনিয়মতান্ত্রিক পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। এই শূন্যতা পূরণ করতেই ২০২৩ সালে সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ও স্মার্ট প্রযুক্তিনির্ভর সেবা হিসেবে যাত্রা শুরু করে পিউপিল স্কুল বাস।

যেভাবে কাজ করে পিউপিল স্কুল বাস-এর স্মার্ট প্রযুক্তি
সাধারণ স্কুল পরিবহন বা ডেডিকেটেড স্কুল বাসের চেয়ে এটি সম্পূর্ণ আলাদা। এটি কেবল একটি সাধারণ যানবাহন সেবা নয়, বরং একটি সমন্বিত স্মার্ট স্কুল মোবিলিটি প্ল্যাটফর্ম। অভিভাবকদের শতভাগ নিশ্চিন্ত রাখতে এই সার্ভিসে যুক্ত করা হয়েছে আধুনিক ট্র্যাকিং ও মনিটরিং ব্যবস্থা:

আইওটি ও রিয়েল-টাইম জিপিএস: প্রতিটি বাসে রিয়েল-টাইম জিপিএস ট্র্যাকিং সুবিধা রয়েছে, ফলে বাসের অবস্থান প্রতি মুহূর্তে জানা যায়।

ইনস্ট্যান্ট নোটিফিকেশন: সন্তান বাসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই অভিভাবকের ফোনে চলে যায় নোটিফিকেশন। আবার নিরাপদে স্কুলে নামিয়ে দেওয়ার পরও পাঠানো হয় ড্রপ নোটিফিকেশন।

ডেডিকেটেড অ্যাপ ও লাইভ ওয়েবক্যাম: অভিভাবকদের জন্য রয়েছে ‘প্যারেন্ট অ্যাপ’ এবং চালকদের জন্য ‘ড্রাইভার অ্যাপ’। অভিভাবকেরা চাইলে অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি ওয়েবক্যামে বাসের ভেতরের সন্তানকে দেখতে পারেন।

সহজ ইন্টারফেস (বাংলা): প্রযুক্তি ব্যবহারে কম পারদর্শী অভিভাবকেরাও যেন সহজে সন্তানকে ট্র্যাক করতে পারেন, সে জন্য অ্যাপটিতে রাখা হয়েছে সহজ নেভিগেশন ও বাংলা ভাষার সুবিধা।

নিরাপত্তায় বাড়তি যত্ন: কেবল প্রযুক্তিই নয়, নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি বাসে থাকছেন যাচাই–বাছাই করা পেশাদার চালক এবং শিশুদের দেখাশোনার জন্য একজন করে প্রশিক্ষিত নারী অ্যাটেনডেন্ট বা ফিমেল গাইড।

ব্যবসায়িক মডেল ও বর্তমান সাফল্য
বিটুবি ও বিটুসি মডেলে পরিচালিত এই স্টার্টআপটি অভিভাবকদের কাছ থেকে মাসিক গ্রাহকসেবা এবং বিভিন্ন স্কুলের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে আয় করে। সেবার মান ঠিক রেখে খরচ সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৩ সালে যাত্রা শুরু করার পর থেকে এ পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রামে ৭ হাজার ২০০–এর বেশি শিক্ষার্থীকে সেবা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি, যার মধ্যে সরাসরি নিয়মিত সার্ভিসের আওতায় এসেছে প্রায় ৬ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী। পাশাপাশি ৫৫টির বেশি সরকারি ও বেসরকারি স্কুলের সঙ্গে তাদের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

এই উদ্যোগটি কেবল শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাই দিচ্ছে না, বরং শহরের পরিবেশদূষণ কমাতেও রাখছে ভূমিকা।

ব্যক্তিগত গাড়ি হ্রাস: পরিসংখ্যান বলছে, শহরের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ যানজটের কারণ হলো ব্যক্তিগত গাড়ি। পিউপিল স্কুল বাসের কারপুলিং মডেলের কারণে রাস্তা থেকে বেশ কিছু ব্যক্তিগত গাড়ি কমানো সম্ভব হয়েছে।

কার্বন নিঃসরণ হ্রাস: রাস্তা থেকে ব্যক্তিগত গাড়ি কমে যাওয়ায় শহরের কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে কমছে, যা পরিবেশ রক্ষায় দারুণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
এই উদ্ভাবনী উদ্যোগ ইতিমধ্যে দেশে-বিদেশে দারুণ প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হয়েছে। নিরাপদ যাতায়াতব্যবস্থায় বিশেষ অবদানের জন্য পিউপিল স্কুল বাস লিমিটেডের ফাউন্ডার ও সিইও আব্দুর রশিদ উদ্ভাবক/স্টার্টআপ শ্রেণিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নাগরিক পদক ২০২৫ অর্জন করেছেন। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘এমএসএমই অ্যাওয়ার্ড’ এবং নির্বাচিত হয়েছে সরকারি বিভিন্ন ইনোভেশন প্রোগ্রামে।

আন্তর্জাতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত প্রফেশনাল ফেলোস প্রোগ্রাম-এ অংশগ্রহণের গৌরব অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সবচেয়ে গর্বের বিষয় হলো, এই কর্মসূচির আওতায় আগামী জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা স্টেটের টালসা সিটিতে এই সেবা চালু হতে যাচ্ছে।

আগামীর স্বপ্ন: বিশ্বমঞ্চে মেড ইন বাংলাদেশ
অর্থায়নের বিষয়ে মো. আবদুর রশিদ  গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা শুরু থেকেই টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং শক্তিশালী ইউনিট ইকোনমিকসের ওপর জোর দিয়েছি। বর্তমানে আমরা ব্যবসাকে আরও বড় করতে ইমপ্যাক্ট-লিঙ্কড ফাইন্যান্সিং ও কৌশলগত অংশীদারত্বের দিকে মনোযোগ দিচ্ছি। আমাদের বর্তমান অগ্রাধিকার হলো স্কুলের সঙ্গে অংশীদারত্ব বাড়ানো, অভিভাবক ও ড্রাইভার অ্যাপের আরও উন্নয়ন এবং ডেটা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধি করা। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো—সারা দেশে সেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও পিউপিল স্কুল বাসকে একটি বিশ্বস্ত ও বিশ্বমানের স্কুল পরিবহন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

ঢাকা ও চট্টগ্রামে কার্যালয় রয়েছে পিউপিল স্কুল বাসের। মোট ৩৫ জন কর্মী এখানে কাজ করেন। পিউপিল স্কুল বাসের মোট গাড়ি রয়েছে ৭৫টি। এর মধ্যে ১৩টি দোতলা বাস ও ৬২টি মাইক্রোবাস।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status