|
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে কেন জনপ্রিয় জিন্নাহ টুপি?
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে কেন জনপ্রিয় জিন্নাহ টুপি? পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নামের সঙ্গে যুক্ত হলেও এই টুপির ব্যবহার শুধু পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারত, বাংলাদেশ, আফগানিস্তানসহ দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে এটি মুসলিম ঐতিহ্য, আভিজাত্য ও রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশ শাসনের শেষভাগ এবং পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার অনেক প্রভাবশালী রাজনীতিবিদকে জিন্নাহ টুপি ও শেরওয়ানি পরতে দেখা যেত। অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের পোশাক পরেছেন। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক জীবনের একটি দীর্ঘ সময়েও জিন্নাহ টুপির ব্যবহার দেখা গেছে। তৎকালীন সময়ে এই টুপি মুসলিম মধ্যবিত্ত ও অভিজাত রাজনৈতিক শ্রেণির পরিচিত পোশাকগুলোর একটি ছিল। সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতিতেও বিভিন্ন নেতার মাথায় মাঝেমধ্যে এই টুপি দেখা যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠনের নেতাদেরও জিন্নাহ টুপি পরতে দেখা গেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও টুপিটির ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে রমজানসহ ধর্মীয় বিভিন্ন সময়ে এর ব্যবহার তুলনামূলক বেশি চোখে পড়ে। শুধু রাজনীতি নয়, আভিজাত্যের প্রতীকও মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে জিন্নাহ টুপি একসময় আভিজাত্য, শিক্ষা, নেতৃত্ব এবং মুসলিম জাতিসত্তার প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হতো। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের শহুরে শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পুরুষদের পোশাকে এ ধরনের টুপি বিশেষভাবে দেখা যেত। আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী কারাকুল টুপি পরার মাধ্যমে এটিকে নতুন করে বিশ্বপরিচিতি দেন। এমনকি ইরানের একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও এ ধরনের টুপি পরা অবস্থায় দেখা গিয়েছিল। পাকিস্তানের রাজনীতিতেও পরবর্তী প্রজন্মের অনেক নেতা জিন্নাহর প্রতি শ্রদ্ধা এবং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন সময়ে এই টুপি ব্যবহার করেছেন। জিন্নাহ টুপির আসল নাম কী জিন্নাহ টুপির প্রচলিত নাম মূলত ‘কারাকুল টুপি’। এর ইতিহাস মধ্য এশিয়ার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বর্তমান উজবেকিস্তানের বুখারা অঞ্চলের ‘কারাকুল’ নামের একটি এলাকার সঙ্গে টুপিটির নাম ও উৎপত্তির সম্পর্ক রয়েছে। সিল্ক রোডের বাণিজ্যিক যোগাযোগের মাধ্যমে এই টুপি মধ্য এশিয়া থেকে আফগানিস্তান হয়ে কাশ্মীর ও উত্তর ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মুসলিম লীগের নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পশ্চিমা স্যুট-টাইয়ের বদলে শেরওয়ানির সঙ্গে নিয়মিত এই টুপি পরা শুরু করলে উপমহাদেশে এটি ‘জিন্নাহ টুপি’ নামে ব্যাপক পরিচিতি পায়। ১৯৩৭ সালে লখনউতে মুসলিম লীগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে জিন্নাহকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ধরনের টুপি পরতে দেখা যায়। এরপর ধীরে ধীরে এটি তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। কী দিয়ে তৈরি হয় জিন্নাহ টুপি আকৃতির দিক থেকে জিন্নাহ টুপি কিছুটা ত্রিকোণাকার। মাথা থেকে খুলে রাখলে এটি ভাঁজ করে চ্যাপ্টা করা যায়। ঐতিহ্যগতভাবে টুপিটি নরম পশম বা চামড়া দিয়ে তৈরি করা হতো। বিশেষ করে কারাকুল জাতের ভেড়ার পশম বা পার্সিয়ান ভেড়ার চামড়া ব্যবহার করা হয়। উন্নতমানের কাঁচামাল, দক্ষ কারিগর এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়াজাতকরণের কারণে আসল কারাকুল টুপি তুলনামূলক ব্যয়বহুল। সময়ের সঙ্গে কমেছে ব্যবহার আধুনিক পোশাকের প্রসার এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে জিন্নাহ টুপির ব্যবহারও অনেকটা কমে এসেছে। একই সঙ্গে দক্ষ কারিগরের অভাব ও ঐতিহ্যবাহী উপকরণের সংকটে এ টুপি তৈরির শিল্পও অনেক জায়গায় বিলুপ্তির পথে। বাংলাদেশে জিন্নাহ ও তাঁর রাজনৈতিক প্রতীক নিয়ে নানা ধরনের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক মূল্যায়ন থাকলেও, জিন্নাহ টুপি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একটি পরিচিত প্রতীক হয়ে রয়েছে। রাজনীতির সঙ্গে এর সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে বদলালেও ঐতিহ্য, পোশাক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ইতিহাসে টুপিটির গুরুত্ব এখনও আলোচিত।
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
