|
হাম-ডেঙ্গু-নিউমোনিয়া একাকার শিশু ওয়ার্ডে, সংক্রমণ ঠেকাবে কে?
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
|
হাম-ডেঙ্গু-নিউমোনিয়া একাকার শিশু ওয়ার্ডে, সংক্রমণ ঠেকাবে কে? তিনি বলেন, ডেঙ্গু ওয়ার্ডেরও একই অবস্থা। নির্ধারিত ওয়ার্ড ছাড়াও রোগীরা জায়গা নিয়ে অন্যত্র অবস্থান নিয়েছে। আমরা হামে আক্রান্ত রোগীদের অভিভাবকদের সবসময় বলি, আপনারা আপনাদের বাচ্চাদের নিয়ে অন্য রোগীদের সংস্পর্শে আসবেন না। কিন্তু তারা তা শোনেন না। ফলে খুব সহজেই এখান থেকে রোগ ছড়াতে পারে। বেহাল দশা ডেঙ্গু ওয়ার্ডের কুমিল্লার হোমনা উপজেলা থেকে ৩ বছরের বাইজিদকে নিয়ে রোববার রাতে মুগদা মেডিকেলে আসেন বাবা জিলানি। আসার পর একদিন পার হয়ে গেলেও এখনো সিট পাননি ডেঙ্গু ওয়ার্ডে। ওয়ার্ডের বাইরে এক কোনায় ফ্লোরে সাদা কাপড় বিছিয়ে কোনোমতে ছেলেকে শুইয়ে রেখেছেন। মাথার উপরে নেই ফ্যান। মা শিল্পী খানম হাতপাখা দিয়ে টানা বাতাস করে যাচ্ছেন। বাইজিদের বাবা জিলানি বলেন, ১০ দিন ধরে ছেলের ছেড়ে ছেড়ে জ্বর আসে। ফার্মেসি থেকে বলে ওষুধ কিনে খাওয়ানো হয়েছে। কিন্তু কোনো পরিবর্তন না থাকায় রোববার সকালে কুমিল্লার হোমনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাই। তারা জানায়, ওর ডেঙ্গু হয়েছে। সেখানে ওকে রাখতে পারবে না। ঢাকায় নিয়ে আসতে বলে। আর তাদের ওখানে যদি ভর্তি করাতে হয়, তাহলে বন্ড সই করে রাখতে হবে। তারা এমনভাবে আমাদের ভয় দেখিয়েছে যে, ওইদিন রাতেই ঢাকায় নিয়ে আসি। ডেঙ্গু ওয়ার্ডে উদ্বিগ্ন অবস্থায় বসে আছেন শিশু আইরিনের বাবা মাসুদ আহমেদ। তিনি জানান, হাসপাতালে ভর্তির পর ৪ দিন তাদের মেয়েকে ফ্লোরেই থাকতে হয়েছে। আজ তারা সিট পেয়েছেন। ইতোমধ্যে আইরিনের পুরো শরীর লাল র্যাশে ভরে গেছে। প্লাটিলেটও কমে গেছে। মাসুদ আহমেদ বলেন, ৪ দিন মেয়েকে নিয়ে ফ্লোরেই ছিলাম, আজ সকালে সিট পেয়েছি। ওয়ার্ডে প্রচণ্ড গরম থাকায় মেয়ের অস্থিরতা বেড়ে গেছে। আল্লাহর ওপর ভরসা করে আছি, দেখি শেষ পর্যন্ত কী হয়। ওয়ার্ডে এত রোগীর চাপ, চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন ডাক্তাররাও। এ বিষয়ে ডা. নুশরাত জানান, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত অনেক রোগী ঢাকার বাইরে থেকে আসেন, যা মোটেও প্রয়োজন ছিল না। ডেঙ্গুর জন্য আলাদা কোনো চিকিৎসা নেই। ২০২৫ সালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য সরকার থেকে যে গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে, সেটি মেনেই তারা চিকিৎসা দিচ্ছেন। অভিভাবকদের মশারি টানানোর কথা বললেও ওয়ার্ডে গরম থাকায় তারা টানান না। তিনি বলেন, ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীরা স্থানীয় পর্যায়ে উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারতেন। কিন্তু তারা সেটি না করে ঢাকায় চলে আসেন। ফলে আমাদের ওপর অনেক বেশি চাপ পড়ে যায়। গ্রাম থেকে রোগীদের ঢাকামুখী হওয়ার বিষয়ে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন, রোগী এবং চিকিৎসকদের মাঝে যে একটি বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা এখানে স্পষ্ট। রোগীরা উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে চাইলেও সেখানকার চিকিৎসকেরা ঝুঁকি নিচ্ছেন না। এর পেছনে অন্যতম কারণ, কোনো রোগী মারা গেলে চিকিৎসকরা মারধরের শিকার হন। তাই তারা ঝুঁকি না নিয়ে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। হাম, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্তদের একসঙ্গে রাখার বিষয়ে এই জনস্বাস্থ্যবিদ বলেন, হামের অন্যতম হটস্পট হলো হাসপাতালগুলো। ডেঙ্গু রোগীরা যদি হামে আক্রান্ত হন, তাহলে এর পরিণতি আরও ভয়ংকর হবে। হাসপাতালগুলোতে যদি সরকার পর্যাপ্ত আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে না পারে, তাহলে এর চরম মূল্য দিতে হবে। অবিলম্বে উপজেলা হাসপাতাল ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিতের ব্যবস্থা করতে হবে। আর হাম রোগীদের সবার থেকে আলাদা করতে হবে। ডেঙ্গু ওয়ার্ডেও বেড সংকট তীব্র। ৩ বছরের বাইজিদকে ওয়ার্ডের বাইরে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়েছে, মাথার ওপর ছিল না ফ্যান। আরেক শিশু আইরিনকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও ৪ দিন ফ্লোরে থাকতে হয়েছে; পরে সিট পেলেও প্রচণ্ড গরমে বেড়েছে তার অস্থিরতা। চিকিৎসকদের সঙ্গে জনগণের যে বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, এর পেছনে সরকাকে দায়ী করে তিনি বলেন, মন্ত্রী তো পড়ে আছেন ডালের মধ্যে লবণ পড়ছে কি না, সেটি নিয়ে; কেন হাসপাতালের বাইরে টেস্ট করানো হয়, সেটা নিয়ে। অথচ তার কাজ ছিল সিস্টেমের পরিবর্তনে কাজ করা। তিনি সেটি না করে হাসপাতালে হাসপাতালে গিয়ে ছোটোখাটো বিষয় নিয়ে মিডিয়ার সামনে ডাক্তারদের অপমান-অপদস্থ করে জনতুষ্টি অর্জন করার চেষ্টা করছেন। মন্ত্রীর এমন কর্মকাণ্ডের ফলেই রোগী ও তাদের স্বজনেরা খুব সহজেই ডাক্তারদের ওপর চড়াও হওয়ার সাহস পাচ্ছেন। দিনশেষে এর নেতিবাচক প্রভাব আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপরই পড়ছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, এ মুহূর্তে ডেঙ্গু ও হামের রোগী অনেক বেশি হওয়ায় হাসপাতাল ম্যানেজমেন্টে সমস্যা হচ্ছে। এর ফলে শিশুরা হাসপাতালেই হাম ও ডেঙ্গুসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি যদি চলতে থাকে তাহলে আমরা আরও বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হবো। এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে হলে অবশ্যই সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি বলেন, হাসপাতালগুলোতে জনবলের সংকট রয়েছে। যার ফলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও রোগীদের পর্যাপ্ত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরকার জনবল সংকট মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছে। ৫৯.৪ শতাংশ শিশু হাসপাতাল থেকেই হামে আক্রান্ত গত সপ্তাহে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মা ও শিশু হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া হাম-আক্রান্ত ২০০ শিশু ও তাদের ১০০ মায়ের তথ্য নিয়ে এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এআরএফ) নামে একটি সংস্থা গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এতে দেখা গেছে, সংক্রমিত শিশুদের ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতাল থেকেই হামে আক্রান্ত হয়েছে, যা হাসপাতালগুলোর সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরে। এই গবেষণায় ‘প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামরুন নাহার বলেন, হাসপাতালগুলোতে শয্যা স্বল্পতার কারণে একই শয্যায় একাধিক শিশু থাকায় হামের সংক্রমণ হচ্ছে। হাম উচ্চমাত্রায় সংক্রমণশীল। একজন রোগী থেকে সর্বোচ্চ ১৮ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ হতে পারে। তাই আইসোলেশন এখানে অবশ্যই দরকার। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় নিষিদ্ধ ঘোষিত ফুলবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গ্রেপ্তার
১০ কোটি টাকার সেতুতে রডের বদলে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ঢালাই, তাও রাতের বেলায়
ময়মনসিংহের কলেজ রোডে আদালতের আদেশ অমান্য করে বির্ল্ডিং নির্মাণের অভিযোগ
গুইমারার রামসু বাজারে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ঢেউটিন ও তরুণদের ক্রীড়া সামগ্রী দিল সেনাবাহিনী
