ই-পেপার সোমবার ● ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শনিবার ● ৩ অক্টোবর ২০২৬ ● ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
শেখ হাসিনাকে ‘ফেরত’ নাকি ‘তৃতীয় দেশে’ পাঠাবে ভারত?
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Saturday, 3 October, 2026, 4:02 PM

শেখ হাসিনাকে ‘ফেরত’ নাকি ‘তৃতীয় দেশে’ পাঠাবে ভারত?

শেখ হাসিনাকে ‘ফেরত’ নাকি ‘তৃতীয় দেশে’ পাঠাবে ভারত?

২০২৪ সালের আগস্টে গণআন্দোলনের মুখে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির ঘটনা শুধু বাংলাদেশের রাজনীতিতেই বড় পরিবর্তন আনেনি, দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সমীকরণেও বড় প্রভাব ফেলেছে। গত ১৫ বছর ধরে ভারতের প্রতিবেশী নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল—শেখ হাসিনার সরকারকে স্থিতিশীল রাখা এবং এর মাধ্যমে ভারতের পূর্ব সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

কিন্তু সেই নীতিই এখন ভারতের জন্য বড় কূটনৈতিক সংকট তৈরি করেছে। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার পরিচালনা করছে। বাংলাদেশের একটি আদালত শেখ হাসিনাকে অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এরপর তাকে দেশে ফিরিয়ে দিতে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি জানিয়েছে ঢাকা।

এই পরিস্থিতিকেই বলা হচ্ছে ভারতের ‘শেখ হাসিনা সংকট’। এটি এমন একটি কূটনৈতিক সমস্যা, যার সহজ কোনো সমাধান নেই। একদিকে ভারতের দীর্ঘদিনের অংশীদারকে আশ্রয় দেওয়ার প্রশ্ন, অন্যদিকে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার প্রয়োজন—দুই দিকই সামলাতে হচ্ছে নয়াদিল্লিকে।

ভারতের জন্য আস্থার প্রশ্ন

এই সংকটের মূল জায়গায় রয়েছে ভারতের কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শেখ হাসিনার সরকার ভারতের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা চাহিদাগুলো পূরণ করেছে।

শেখ হাসিনা সরকার ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট সুবিধা দিয়েছে। এর ফলে ভারতের পণ্যবাহী ট্রাক ও নৌযান বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে পৌঁছানোর সুযোগ পেয়েছে।

এখন ভারত যদি ঢাকার দাবি মেনে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায় এবং সেখানে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়, তাহলে প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ভারতের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে ভুটান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো মনে করতে পারে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে গেলে ভারত তার ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের পাশে থাকবে না।

শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার মূল্যও কম নয়

অন্যদিকে শেখ হাসিনাকে ভারতে রেখে দেওয়ারও বড় কূটনৈতিক মূল্য রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজে ভারতবিরোধী মনোভাব আরও বাড়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। শেখ হাসিনা যতদিন ভারতে থাকবেন, ততদিন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার নয়াদিল্লিকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের বিরোধী হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাবে।

এর প্রভাব ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে। বাংলাদেশের জনমনে ভারতবিরোধী মনোভাব বাড়লে দুই দেশের ট্রানজিট ও বাণিজ্যিক যোগাযোগও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

দুই দেশের সম্পর্কে এই টানাপোড়েন এখন আর শুধু গোপন কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রকাশ্য প্রভাবও দেখা যাচ্ছে।

এর একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের না যাওয়ার সিদ্ধান্ত। বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ঢাকার দৃষ্টিতে এটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য আলাদা ও সরাসরি আমন্ত্রণ না দেওয়ার মাধ্যমে এক ধরনের কূটনৈতিক অবজ্ঞা ছিল। এর প্রতিবাদে তিনি নয়াদিল্লি সফর না করার সিদ্ধান্ত নেন।

এর পরিবর্তে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গুরুত্ব দেন এবং সেখানে পাকিস্তানের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেন। একই সময়ে বাংলাদেশ সরকার চীনের সঙ্গে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ঋণসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা বাড়িয়েছে।

এর মধ্য দিয়ে ঢাকার পক্ষ থেকে একটি বার্তা দেওয়া হচ্ছে—বাংলাদেশ আর ভারতের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেকে মিলিয়ে চলবে না। বরং ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ভারত, পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করবে।

একজন নেতার সঙ্গে পুরো দেশের সম্পর্ককে এক করে দেখার ফল

শেখ হাসিনা সংকট ভারতের পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি বড় শিক্ষা সামনে এনেছে—একজন রাজনৈতিক নেতাকে পুরো দেশের সমার্থক হিসেবে দেখা ঝুঁকিপূর্ণ।

গত ১৫ বছর ধরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতিতে শেখ হাসিনা সরকারের স্থিতিশীলতাকে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার সঙ্গে প্রায় এক করে দেখা হয়েছিল। বাংলাদেশের একাধিক বিতর্কিত নির্বাচন নিয়েও নয়াদিল্লি সমালোচনার মুখে পড়লেও সীমান্ত নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।

কিন্তু এর ফলে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দল, ছাত্র আন্দোলন এবং বৃহত্তর নাগরিক সমাজের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যথেষ্ট গভীর হয়নি।

শেখ হাসিনার পতনের পর এর মূল্য দিতে হচ্ছে নয়াদিল্লিকে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও গ্রিড ব্যবস্থাপনার মতো নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় বিষয়ও এখন নতুন সরকারের কাছে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।

আগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরের বৃহত্তর অংশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি না করায় ভারতকে এখন নতুন সরকারের সঙ্গে আবার শুরু থেকে কূটনৈতিক আস্থা তৈরি করতে হচ্ছে। তার ওপর ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থানও দুই দেশের সম্পর্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

দুই দেশের সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়ার সুযোগ নেই

তবে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন এমন অবস্থায় আটকে থাকতে পারে না। দৈনন্দিন প্রয়োজনের দিক থেকে দুই দেশই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশ খাদ্য আমদানি, চিকিৎসা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে। অন্যদিকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ও যোগাযোগের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই বাস্তবতা থেকেই দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার কিছু সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে। ভারতের কূটনীতিকরা নতুন সরকারের সঙ্গে ‘গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখী সম্পর্ক’ গড়ার কথা বলে আসছেন। এই নীরব কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে প্রাথমিক অচলাবস্থাও কিছুটা কমেছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের নভেম্বরের শেষ বা ডিসেম্বরের শুরুর দিকে তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফরের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

সামনে কী হতে পারে

প্রথমত, শেখ হাসিনার জন্য দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে কোনো তৃতীয় দেশে স্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা। ভারত নীরবে মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের কোনো নিরাপদ দেশে শেখ হাসিনাকে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে। এতে বাংলাদেশের সরকার তার জনগণের কাছে রাজনৈতিক সাফল্যের দাবি করতে পারবে, আবার ভারতকেও সরাসরি শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হবে না।

দ্বিতীয়ত, ভারত ও বাংলাদেশকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক কূটনীতির পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ও বাস্তবভিত্তিক সম্পর্কের দিকে যেতে হবে। পানি, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক বিরোধের হাতিয়ার না বানিয়ে বাস্তব প্রয়োজন ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালনা করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদসংক্রান্ত বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

শেখ হাসিনাকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, কোনো একটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলা দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশের জন্য কূটনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গত এক দশকের ঘনিষ্ঠ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এখন আগের মতো ব্যক্তিনির্ভর থাকার সম্ভাবনা কম। বরং দুই দেশের সম্পর্ক আরও বাস্তবভিত্তিক ও লেনদেনকেন্দ্রিক হয়ে উঠতে পারে।

তবে নয়াদিল্লি ও ঢাকা যদি নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে দুই দেশের ভৌগোলিক ও পারস্পরিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে শেখ হাসিনাকে ঘিরে তৈরি বর্তমান কূটনৈতিক সংকট দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক সংকটে রূপ নেওয়া ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status