|
সীমান্তে রক্তের দাগ ও প্রশাসনিক উদাসীনতা: শুন্যের কোঠায় হত্যা কি শুধুই রাজনৈতিক আশ্বাস?
এইচ এম হাকিম
|
|
সীমান্তে রক্তের দাগ ও প্রশাসনিক উদাসীনতা: শুন্যের কোঠায় হত্যা কি শুধুই রাজনৈতিক আশ্বাস? বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত যেন এক চিরন্তন ট্র্যাজেডির রক্তভেজা মানচিত্র। বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও সংবেদনশীল সীমান্তগুলোর একটি হিসেবে এটি পরিচিত। প্রতিবেশীর সঙ্গে ‘সোনালী অধ্যায়’ কিংবা 'উষ্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক'—যে শব্দবন্ধই ব্যবহার করা হোক না কেন, সীমান্তে যখন কোনো নিরীহ বাংলাদেশির তাজা রক্ত ঝরে, তখন সমস্ত রাজনৈতিক বয়ান এক লহমায় অর্থহীন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার নীতিমালার তোয়াক্কা না করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) অন্যায্য গুলিবর্ষণ ও নির্মম নির্যাতন এক নিত্যদিনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) সহ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনে অন্তত ৫০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন এবং গুরুতর আহত কিংবা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন আরও প্রায় ৬০ জনেরও বেশি নাগরিক। প্রতিবার মৃত্যুর পর দুই দেশের সরকারের শীর্ষপর্যায়ে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক বসে, যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ফলাও করে ঘোষণা দেওয়া হয়—"সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা হবে"। কিন্তু বাস্তবে সেই আশ্বাস কূটনৈতিক ফাইলে চাপা পড়ে থাকে; সীমান্তে থামে না গুলির আওয়াজ, কমে না লাশের দীর্ঘ মিছিল। প্রশ্ন উঠেছে, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড কি সত্যিই বন্ধ করা সম্ভব নয়, নাকি সদিচ্ছার অভাবেই বারবার রক্ত ঝরছে? উত্তর একটাই—বাংলাদেশ যদি তার সীমান্ত নিরাপত্তা ও সার্বিক বর্ডার ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থাকে বৈপ্লবিক ও যুগোপযোগী কৌশলে ঢেলে সাজায়, তবে সীমান্ত হত্যা নিশ্চিতভাবেই শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। এর জন্য সীমান্ত রক্ষা বাহিনীকে প্রথাগত অবস্থান থেকে বের করে এনে পুরো সীমান্ত এলাকাকে বিজিবির একেবারে হাতের নাগালে এবং নিবিড় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হবে। প্রথমত, সীমান্ত নিরাপত্তা সুসংহত করতে মূল সীমান্ত লাইন বা জিরো পয়েন্ট থেকে অন্তত ৪ কিলোমিটার অভ্যন্তরে অত্যন্ত কঠোর ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক চেকপোস্ট ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এটি শুধু সাধারণ পথচারীদের জন্য নয়; প্রভাব-প্রতিপত্তি বা পদের বিচার না করে সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী কিংবা ভিআইপি—কাউকেই এই তল্লাশি ব্যবস্থার বাইরে রাখা যাবে না। সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় প্রবেশের সময় এবং সেখান থেকে প্রস্থানের সময় প্রত্যেকের সুনির্দিষ্ট পরিচয়পত্র ও যানবাহন বাধ্যতামূলক চেকিংয়ের আওতায় আনলে অপরাধীদের অবাধ যাতায়াত এবং চোরাচালানিদের নেটওয়ার্ক গোড়াতেই ধসে পড়বে। দ্বিতীয়ত, সীমান্ত অবকাঠামোর আমূল পরিবর্তন ছাড়া কার্যকর পাহারা সম্ভব নয়। জিরো লাইনের ওপারে বিএসএফ যেভাবে সার্বক্ষণিক ১০০ থেকে ৫০০ মিটার পর পর ছোট ছোট চৌকি ও টহল টিম গঠন করে নিছিদ্র পাহারা নিশ্চিত করে, বাংলাদেশকে ঠিক ততটাই দৃশ্যমান ও প্রস্তুত ভূমিকা নিতে হবে। আর এই নিবিড় পাহারার পূর্বশর্ত হলো সীমান্তজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করা। এর জন্য দরকার বাংলাদেশ সীমান্ত জিরো লাইনের ঠিক আগে পুরো সীমান্ত বেষ্টনীজুড়ে দ্রুত তৈরি করতে হবে এক আধুনিক ও সুপ্রশস্ত 'বর্ডার রিং রোড' বা সীমান্ত সড়ক। এর ফলে যে কোনো জরুরি প্রয়োজনে সীমান্তরক্ষী বাহিনী দ্রুততম সময়ে এক পয়েন্ট থেকে অন্য পয়েন্টে মুভমেন্ট করতে পারবে। পাশাপাশি পুরো সীমান্ত এলাকাকে ১০০% ডিজিটাল সার্ভেইলেন্সের আওতায় আনতে হবে। নাইট-ভিশন সিসিটিভি ক্যামেরা, মোশন সেন্সর, ড্রোন প্রযুক্তি ও থার্মাল ইমেজিংয়ের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা সার্বক্ষণিক কেন্দ্রীয় ডিজিটাল কন্ট্রোল রুম থেকে সীমান্ত পর্যবেক্ষণ করা হলে অবৈধ অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ রুখে দেওয়া সম্ভব। একই সাথে সীমান্তে অ-ঘাতক অস্ত্র (Non-lethal Weapons) ব্যবহারের যে আন্তর্জাতিক সম্মতি রয়েছে, তা বিএসএফকে পালনে বাধ্য করতে কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে। প্রযুক্তি আর নিখুঁত অবকাঠামো থাকলে বিএসএফের আর 'আত্মরক্ষা'র দোহাই দিয়ে গুলি চালনোর সুযোগ থাকবে না। তবে সীমান্তে বিশৃঙ্খলা ও গোলাগুলির আসল মূল উপড়ে ফেলতে না পারার পেছনে সবচেয়ে বড় অভিশাপ হলো এপার বাংলা ও ওপার বাংলার সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক মাদক, সোনা ও অস্ত্র চোরাচালান সিন্ডিকেট। সীমান্ত অপরাধ মোটেও কোনো সাধারণ কৃষকের ভুলবশত সীমান্ত অতিক্রমের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এর পেছনে কলকাঠি নাড়ে সুবিশাল এক অপরাধ সাম্রাজ্য। দেশের প্রথম সারির জাতীয় দৈনিকগুলোর একাধিক চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে স্পষ্ট উঠে এসেছে যে, সীমান্ত কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ শীর্ষ চোরাচালানকারীদের সম্পূর্ণ তালিকা সরকারের উচ্চমহল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার টেবিলে বছরের পর বছর ধরে পড়ে রয়েছে। কক্সবাজার, টেকনাফ থেকে শুরু করে যশোর,চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, বেনাপোল, কুমিল্লা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং সিলেটের সীমান্ত পয়েন্টগুলো যারা নিয়ন্ত্রণ করে কোটি কোটি টাকার আইস, ইয়াবা, ফেনসিডিল এবং সোনা পাচারের রামরাজত্ব গড়ে তুলেছে—তাদের নাম, পরিচয় ও গডফাদারদের পদবী প্রশাসনের নখদর্পণে। জাতীয় দৈনিকগুলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও গোয়েন্দা পর্যালোচনায় বারবার উন্মোচিত হয়েছে, কিভাবে এই অপরাধ চক্রের গডফাদাররা পর্দার আড়ালে নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে সমাজের প্রান্তিক ও দরিদ্র সীমান্তবর্তী মানুষদের সামান্য টাকার লোভে ফেলে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ কাজের দিকে ঠেলে দেয়। তারাই সীমান্তে বিএসএফের মুখোমুখি হয় এবং বলির পাঁঠা হিসেবে গুলি খেয়ে প্রাণ হারায়। অন্যদিকে মূল ক্রিমিনাল ও সোনা-মাদক সাম্রাজ্যের মালিকরা ক্ষমতার দাপট, রাজনৈতিক প্রভাব এবং এক অজানা অদৃশ্য শক্তির ছত্রছায়ায় পুরোপুরি অধরা থেকে যায়। গোয়েন্দা সংস্থাদের টেবিলে সুনির্দিষ্ট তালিকা থাকা সত্ত্বেও এই শীর্ষ ক্রিমিনালদের বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কেন দৃশ্যমান ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয় না—সেই উত্তর আজও দেশবাসীর অজানা। মূল অপরাধীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখে সীমান্তে কেবল গরিব পাচারকারীদের ওপর দোষ চাপিয়ে বা তাদের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে এই বিশৃঙ্খলা বন্ধ করা কোনোদিনই সম্ভব হবে না। সমাধান কেবল কথার কথায় নয়, কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপে। যতক্ষণ না সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজেদের টেবিলে থাকা তালিকা ধরে মাদক ও সোনা চোরাচালানের শীর্ষ গডফাদারদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করবে, এবং যতক্ষণ না ৪ কিলোমিটার ভেতরের কঠোর চেকপোস্ট, বর্ডার রিং রোড ও সার্বক্ষণিক সিসিটিভির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের বর্ডার ম্যানেজমেন্ট গড়ে তোলা হবে—ততক্ষণ সীমান্তে এই মৃত্যুর মিছিল থামবে না। সীমান্ত সুরক্ষা কেবল ভূখণ্ডের রক্ষা নয়, এটি জাতির সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদার প্রশ্ন। কূটনৈতিক টেবিলে খালি আশ্বাসের রাজনীতি বন্ধ করে বাংলাদেশ সরকারকে এখন নিজের সীমান্ত সুরক্ষায় কঠোর, সাহসী ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। লেখক: এইচ এম হাকিম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
|
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |
