সাংবাদিক জামাল খাশোগি তুরস্কের সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশের পর সেখানকার এক কর্মীকে একটি চুলা প্রায় এক ঘণ্টা জ্বালিয়ে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। শুক্রবার তুরস্কের একটি আদালতে সৌদি কনস্যুলেটের এক কর্মী সেদিনের ঘটনার বর্ণনায় এসব তথ্য দিয়েছেন।
সৌদি রাজ-পরিবারের সমালোচক হিসেবে পরিচিত মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের কলামিস্ট জামাল খাশোগি ২০১৮ সালের অক্টোবরে ওই কনস্যুলেট ভবনে খুন হন। ভবনটিতে প্রবেশের পর থেকে এখন পর্যন্ত তার কোনও হদিশ পাওয়া যায়নি।
ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটের স্থানীয় টেকনিশিয়ান জেকি দেমির। খাশোগি হত্যা মামলার শুনানির প্রথম দিন শুক্রবার আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনি। মামলার আসামি সৌদি আরবের ২০ কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে আদালতের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। সেই সময় এই সাংবাদিক হত্যাকাণ্ড ঘিরে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল সৌদি আরব।
দেমির বলেন, খাশোগি কনস্যুলেটে প্রবেশের পর তাকে কনস্যুলেটের আবাসিক ভবনে ডেকে পাঠানো হয়। সেখানে ৫ থেকে ৬ জন উপস্থিত ছিলেনতারা আমাকে তন্দুর (ওভেন) জ্বালাতে বলেন। সেখানে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছিল।
২০১৮ সালের অক্টোবরে নিজের বিয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আনতে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে যান সাংবাদিক জামাল খাশোগি। তারপর থেকেই নিখোঁজ রয়েছেন তিনি। পশ্চিমা কিছু দেশের সরকারের পাশাপাশি মার্কিন প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ বলেছে, তাদের ধারণা- সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন। যদিও সৌদি কর্মকর্তারা বরাবরের মতো এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন।
তুরস্কের কর্মকর্তারা বলেছেন, পুলিশের ধারণা- খাশোগিকে শ্বাসরোধে হত্যার পর টুকরো টুকরো করে পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করে থাকতে পারেন ঘাতকরা।
টেকনিশিয়ান জেকি দেমিরের সাক্ষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন তিনি কনস্যুলেটের বাগানে মাংস কাটার অনেকগুলো বোর্ড দেখেছিলেন। এছাড়াও বাগানের চুলায় ছোট বারবিকিউয়ের আয়োজনও দেখেছেন তিনি। চুলার চারপাশের মার্বেলের স্ল্যাবগুলোর রঙ পাল্টে গিয়েছিল। সেগুলো রাসায়নিক দিয়ে পরিষ্কার করা হয়েছিল বলে তার ধারণা।
এ ঘটনায় পৃথক জবানবন্দি দিয়েছেন কনস্যুলেটের গাড়িচালক। তিনি বলেছেন, স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্ট থেকে তাকে কাবারের কাঁচা মাংস আনার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে জেকি দেমির বলেন, একটি কালো গ্লাসের গাড়ি কনস্যুলেটের ঢোকার সময় বাগানের গ্যারেজের দরজা খোলার কাজে সহায়তা করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাকে দ্রুত সেখান থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
তুরস্কের আদালতে সৌদির গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক উপপ্রধান আহমেদ আল-আসিরি ও রাজকীয় আদালতের সাবেক উপদেষ্টা সৌদ আল-কাহতানির বিরুদ্ধে 'ভয়ানক উদ্দেশ্য নিয়ে হত্যায় প্ররোচনা' দেয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মামলার অন্য ১৮ আসামি খাশোগিকে হত্যার উদ্দেশ্যে তুরস্কে গিয়েছিলেন।
আসামিদের অনুপস্থিতিতে তুরস্কে এই মামলার বিচারকাজ শুরু হয়েছে। তবে এই আসামিদের তুরস্কের কাছে সৌদি আরবের হস্তান্তরের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এমনকি গত বছর সৌদি আরবে এই মামলার বিচারকাজে তুরস্ক সহযোগিতা করেনি বলে অভিযোগ করেছে রিয়াদ।
গত বছরের ডিসেম্বরে সৌদি আরবের একটি আদালতে খাশোগি হত্যা মামলায় সংশ্লিষ্ট অন্তত পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজকে কারাদণ্ড সাজা দেয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে খাশোগির পরিবার বলেছে, তারা খুনীদের ক্ষমা করে দিয়েছে। সৌদির আইন অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের মুক্তি কার্যকরে অনুমোদন দেয়া হয়।
ওই সময় সৌদি আরবের একজন প্রসিকিউটর বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কাহতানির সংশ্লিষ্টতার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আল-আসিরির বিরুদ্ধেও আনা অভিযোগ খারিজ করে দেন। সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা।