২০০৯ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলে জো বাইডেন। সে সময় সিরিয়া এবং লিবিয়া যুদ্ধে জড়ায় যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মার্কিন সিনেটর ছিলেন তিনি। সার্বিয়া, আফগানিস্তান এবং ইরাক যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেন বাইডেন। যুদ্ধে তার সমর্থনের কারণে প্রাণ হারায় প্রায় সাত লাখ মানুষ। বাস্তুচ্যুত হয়, ঘরবাড়ি হারায় অনেকে।
বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হারিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে জয়ী হওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন ডেমোক্রেট দলীয় জো বাইডেন। যুদ্ধবাজ এ রাজনৈতিকের বিধ্বংসী কিছু পদক্ষেপ দেখা নেয়া যাক।
ইরাক:
২০০২ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ অভিযোগ তুলেন, সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী রাসায়নিক এবং জৈব অস্ত্র রয়েছে। পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে চাচ্ছেন তিনি। সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষকতা করছেন সাদ্দাম হোসেন, যা শান্তি এবং স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।
২০০২ সালের অক্টোবরে সিনেটর বাইডেন ইরাক যুদ্ধে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন। যার মাধ্যমে বুশ প্রশাসনকে ইরাকে সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষমতা দেয়া হয়।
২০০৩ সালের ২০ মার্চ ইরাকে আক্রমণ করেন জর্জ ডব্লিউ বুশ। ওই যুদ্ধ চলে ২০১১ সালের ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ৮ বছর ৮ মাসের বেশি স্থায়ী ইরাক-মার্কিন যুদ্ধ।
ক্ষমতাচ্যুত করা হয় বাথ পার্টিকে। ফাঁসি দেয়া হয় প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে। সাদ্দাম হোসেন এবং বাথ পার্টির পতনের মধ্য দিয়ে দেশটিতে বিভিন্ন বিদ্রোহীগোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে উঠে। জন্ম নেয় জঙ্গিগোষ্ঠী আল কায়েদা, ইরাক। পরবর্তীতে গঠন করা হয় শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ গণতান্ত্রিক সরকার। ২০১১ সালে ইরাক ছাড়ে মার্কিন বাহিনী।
বাড়তে থাকে ইরানের আধিপত্য। চরমে পৌঁছায় বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত। আল কায়েদার উত্তরসূরি হিসেবে জন্ম নেয় জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস-ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড লেভেন্ত।
২০১৩ সালে সংঘাত তীব্রতর হয়ে উঠে। ২০১৪ সালে ইরাকে ফেরত আসে মার্কিন বাহিনী। ২০১৭ সালে পরিস্থিতি কিছুটা শিথিল হয়। তারপর থেকে থেমে থেমে সেখানে সহিংসতা চলছে। ইরাকি বাহিনী প্রশিক্ষণের জন্য দেশটিতে মার্কিন বাহিনীর কয়েক হাজার সদস্য রয়েছে।
ওই যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান রয়েছে। ২০০৬ সালে লেনসেট স্ট্যাডি জানায়, ৬ লাখ ৫৫ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানায় ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১ লাখ ৮৫ হাজার থেকে ২ লাখ ৮ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি সংখ্যা জানা যায়নি।
ইরাকে পাওয়া যায়নি গণবিধ্বংসী কোনো অস্ত্র।
২০০৫-এ এক সাক্ষাৎকারে ২০০২ সালে ইরাক যুদ্ধের পক্ষে দেয়া ভোট দেয়ার বিষয় জানতে চাওয়া হলে বাইডেন বলেন, এটি তার ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।
সিরিয়া:
২০১১ সালে সিরিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। জানানো হয়, প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদের পদত্যাগ, রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংস্কারের দাবি। সরকার বিক্ষোভে বলপ্রয়োগ করলে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন গোষ্ঠী, বিদেশি শক্তি এবং সন্ত্রাসী সংগঠন।
২০১১ সাল থেকে আসাদকে সরে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৪ সালে ওবামা প্রশাসন সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু করে। ২০১৫ সালে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটিকে প্রতিহতে দেশটিতে সেনা মোতায়েন করে ওয়াশিংটন।
বাইডেনের প্রচারণা শিবির দাবি করেছে, আইএস মোকাবিলাসহ ননা কারণে ওবামা-বাইডেন প্রশাসন সিরিয়ার বিরোধীদের সহায়তা করেছে।
সিরিয়া যুদ্ধে অনুমানিক ৩ লাখ ৮৪ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। যার প্রকৃত সংখ্যা অজানা।
লিবিয়া:
লিবিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ন্যাটোকে সর্বাত্মক সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্র। ওবামা জানান, গাদ্দাফি লিবিয়ার সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনী দিয়ে নির্যাতন চাচ্ছে। নাগরিকদের হত্যা করছে। বাধ্য হয়ে লিবিয়ার নাগরিকরা প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিচ্ছে। লিবিয়াসহ প্রতিবেশী মিসর, তিউনিসিয়ায় মানবিক সংকট তৈরির শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
২০১১ সালে ক্ষমতাচ্যুতের পর গাদ্দাফিকে হত্যা করে মার্কিন সমর্থিত বিদ্রোহীরা।
সংঘাতে কতো মানুষ হতাহত হয়েছে প্রকৃত সংখ্যা অনিশ্চিত। আড়াই থেকে ২৫ হাজার পর্যন্ত মানুষ মারা গিয়ে থাকতে পারে বলে বিভিন্ন সময়ের পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১১ সালে শুরু হওয়া সংঘাত এখনো চলছে।
২০১৬ সালে বাইডেন বলেন, তিনি লিবিয়া যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন।
আফগানিস্তান:
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনা ঘটে। দায়ী করা হয় আল কায়েদাকে। আল কায়েদাকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয় সে সময়কার আফগান শাসক তালেবানের বিরুদ্ধে।
ওই বছরের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ক্ষমতায় ছিলেন জর্জ ডব্লিউ বুশ। আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযান জোরদারের পক্ষে সমর্থন দিয়েছিলেন বাইডেন।
আফগান যুদ্ধে কতো মানুষ নিহত হয়েছে তার সঠিক তথ্য নেই। বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, ১ লাখ থেকে দেড় লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। চলতি মাসের ফেব্রুয়ারিতে তালেবানের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করে যুক্তরাষ্ট্র। ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে মার্কিন সমর্থিত সরকারের সঙ্গে চলছে আলোচনা। থেমে নেই তালেবান, আইএস এবং সরকারি বাহিনী ত্রিমুখী সংঘাত।
সার্বিয়া:
১৯৯৯ যুগোস্লাভিয়ায় (সার্বিয়া এবং মন্টিনেগ্রো) বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে সমর্থন দেন বাইডেন।
ওই বছরের মার্চে যুগোস্লাভিয়ায় বিমান হামলা চালায় ক্লিনটন প্রশাসন। কসোভো প্রদেশে আলবানিয়া জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দেশটির সরকারে চালানো নির্যাতনের অভিযোগে ওই হামলা চালানো হয়। ওই যুদ্ধ দেড় লাখের মতো মানুষ প্রাণ হারায়।
সম্প্রতি বাইডেনকে ‘ধারাবাহিক যুদ্ধ আহ্বানকারী’ আখ্যা দেন মার্কিন সিনেটর র্যান্ড পল। বাইডেন আরও যুদ্ধ বাধাবে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
নির্বাচনী প্রচারণায় বাইডেন জানিয়েছেন তিনি যুদ্ধমুক্ত একটি বিশ্ব চান। প্রতিশ্রুতি দেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরবকে দেয়া মার্কিন সহায়তা বন্ধ করবেন তিনি।