|
যে ছিল আমার.. - সুনৃতা মাইতি
|
|
যে ছিল আমার শুক্রবার দুপুর একটা নাগাদ ক্লাস থাকে এম এমের। তাঁর ক্লাসে সবাই উপস্থিত থাকে। একটু পরেই ঢুকবেন তিনি। এখন ক্লাসে হট্টরোল চলছে। পেছনের বেঞ্চে বসে প্রেমিকপ্রবর কুশল গাইছে, "তু নজম নজম সা মেরে, হোঠোঁ পে ঠেহর যা, ম্যায় খাব খাব সা তেরি, আখো মে জাগু রে তু ইশক ইশক সা মেরে, রুহ মে আ কে বস যা" তার হালফিলের প্রেমিকা নয়না অবশ্য ইকনমিক্স অনার্সের ক্লাসে। টেলিপ্যাথি বলে যদি কিছু থাকে, প্রফিট অ্যান্ড লস ভুলে সে-ও নড়েচড়ে বসছে হবে। বাঁদিকের সেকেন্ড বেঞ্চে বসা অনিকেত স্রগ্ধরার দিকে তাকায়, "বুঝলি! সকালে বাড়ির সামনে এমএম জগিং করতে বেরোন প্রতিদিন। এম এম তো ফিটনেস ফ্রিক। তো এ মালটাও নাকি ইদানীং রোজ সকালে ওই দিক দিয়ে ঘুরঘুর করে।" কথাগুলো শুনেই স্রগ্ধরার পাশে বসা তোর্সা এক গালে টোল ফেলে হেসে গড়িয়ে পড়ে। সেদিকে তাকিয়ে স্রগ্ধরা বিরক্ত গলায় বলে, "শুভদীপকে দেখতে কিন্তু দুর্দান্ত, বল! ওর কি কম বয়সি মেয়ের অভাব!" "ওই ম্যামের যা আছে সেটা কি তোদের মতো কম বয়সি মেয়েদের আছে?" শ্রবণ নামের ফক্কড়ে ছেলেটি চোখ মটকে বলে। এরপর অবধারিত ভাবে চারদিক থেকে "কী আছে কী আছে!" রব ওঠে। তোর্সা অবধি জিজ্ঞাসু মুখে তাকায় শ্রবণের দিকে। মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে শ্রবণ বলে, "এক্সপেরিয়েন্স আবার কী!" দুই ভুরুর মাঝখানে ভাঁজ ফেলে স্রগ্ধরা বলে, "ভাগ! ম্যাম তো আনম্যারেড!" "তো! আনম্যারিড মানেই কি ইনেক্সপেরিয়েন্সড হতে হবে নাকি!" ফের মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে শ্রবণ। "আসলে কিছু না। পাতি ইডিপাস কমপ্লেক্স আর কি! এম এম কীরকম নাকউঁচু টাইপ, দেখিস না? পাত্তা দিচ্ছে বল্লেই হল? ওয়ান সাইডেড পুরো," স্রগ্ধরা গুছিয়ে বসে বলে। অনিকেত জোরে জোরে মাথা নাড়ে, "না-না আমি ড্যাম শিয়োর। এম এম-ও নড়ে গেছেন আমি খবর পেয়েছি। রিলায়েবল সোর্স ভাই" ডানদিকের থার্ড বেঞ্চে চুপচাপ বসেছিল শুভদীপ। ইদানীং তার খুব লজ্জা করে ফার্স্ট বেঞ্চে বসতে। ক্লাসে কীসব গুজুরগুজুর চলে তাকে নিয়ে। বেশ বোঝে সে। সেকেন্ড বেঞ্চের পৃথুলা অনসূয়ার আড়ালে বসে নির্নিমেষে এম এমকে দেখাটাই তার বেশি শ্রেয় মনে হয় আজকাল। অবশেষে এম এম ক্লাসে ঢুকলেন একরাশ বকুল ফুলের সুগন্ধ ছড়িয়ে। শুভদীপের মনে হল, "শি ওয়াকস ইন বিউটি লাইক দ্য নাইট! অফ ক্লাউডলেস ক্লাইমস অ্যান্ড স্টারি স্কাইস।" ক্লাচারের শক্ত শাসন উপেক্ষা করে তাঁর শুভ্র মুখের সামনে লতিয়ে পড়েছে অবাধ্য একগুচ্ছ ছোট্ট ছোট্ট চুল। মুখে বিনবিনে ঘাম। পাতলা লিনেন শাড়ি ভেদ করে অল্প-অল্প দৃশ্যমান তার নিটোল কোমরের খাঁজ। আর তিনি অ্যাটেনডেন্সের খাতা সামনে রেখে একপ্রস্থ হালকা চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন চারদিকে। দৃষ্টিতে অনুসন্ধিৎসা। যেন বহুকাল ধরে খুঁজে চলেছেন কোনও এক প্রতীক্ষিত চেনা মুখ। তারপর তাঁর দৃষ্টি অবধারিতভাবে এসে থামে শুভদীপে। শুভদীপের সারা শরীর ঝনঝন করে ওঠে। অনিকেত, তোর্সা, শ্রবণ আর স্রগ্ধরার দল মিটিমিটি হাসে। এ ওকে ঠেলতে থাকে। এম এমের চোখের দৃষ্টি স্থির হয়ে আসে। মাথা নিচু করে তিনি খাতা দেখছেন। আদুরে ঠোঁটদুটোকে চেপে রেখেছেন সজোরে। পাছে তরলিত হৃদয়ের একছটাকও ছলকে যায়। সবাই বুঝে যাবে যে! অনিকেত সবজান্তার মতো তোর্সার কানে ফিসফিস করে উঠল, "বলেছিলাম না! আগ দোনো তরফ সে লগি হ্যায়! আমি তো প্রতিদিনই এম এম এর কাণ্ড লক্ষ করছি। তার ওপর ওই সকালের জগিংটগিং আর এই মালটা! ওটা তো হাঁ হয়েই থাকে।" সত্যিই এই মুহূর্তে শুভদীপ সব ভুলে মধুরার দিকে তাকিয়ে আছে অপলক। তার শয়নে-স্বপনে মধুরা। শুভদীপ প্রায়ই নিজেকে দেখে থেমস নদীর ধারে অক্সফোর্ডের ছাত্রদের সঙ্গে নাটকের মহড়ায়, কিংবা কান্ট্রিসাইডের সবুজ ঘাসের শয্যায় একান্ত নির্জন এক দুপুরে। সবখানে তার হাত ধরে পাশে থাকে মধুরা নাম্নী এক ললনা। কলেজ থেকেই শুক্রবার করে সরাসরি অনার্সের টিউশন পড়তে যায় শুভদীপ। আর সন্ধেবেলায় বাড়ি ফিরে দেখে বাড়িতে চাঁদের হাট বসেছে। ডাইনিং রুমে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আড্ডা মারছে মা আর তার ল্যাদখোর বন্ধুরা। উইকএন্ড কাল-পরশু। বাবা বোধ হয় এখনও তাস পিটিয়ে বাড়ি ফেরেনি। ভাইয়ের ঘরে তারস্বরে চলছে এমটিভি, আর তার কমার্শিয়াল ব্রেকের মাঝে-মাঝে বন্ধুদের সম্মিলিত র্যাপ আর বিটবক্সিং প্র্যাক্টিস। কী ঝামেলা রে বাবা! একটু নিরিবিলিতে থাকার জো নেই! শুভদীপ মায়ের আড্ডাখানা পেরিয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ায়। পেছন থেকে কানে আসে রানুমাসির গলার স্বর, "শুভটাকে দেখতে একদম অতনুদার মতো, না রে সুতপা!" ফ্রেশ হয়ে ঘরের দিকে যেতে যেতে থমকে যায় শুভদীপ। মা ডাকছে, "এই ফেসবুকটা একটু দেখে দে তো রে শুভ! কী সব পাসওয়ার্ডে গন্ডগোল বলছে।" মা টা যে কী না! ফেসবুকটাও একলা খুলতে পারে না। শুভদীপ অনিচ্ছুক মুখে মায়ের মোবাইলটা হাতে নেয়। অমনি রানুমাসি তড়বড় করে ওঠে, "হ্যাঁ রে শুভ! তোদের ডিপার্টমেন্টে মধুরা মুখার্জি বলে কেউ নতুন জয়েন করেছে?" চোখ সরু করে মোবাইল থেকে মুখ তুলে তাকায় শুভদীপ। ধড়াস ধড়াস করে ওঠে তার বুক। গলাটা শুকিয়ে আসে। আড়ষ্ট জিভ নাড়িয়ে কোনওরকমে সে বলে, "হ্যাঁ" "তা কেমন পড়ায় রে?" রানুমাসি আগ্রহী দৃষ্টিতে তাকায় "ভা ভালই তো" ফ্যাসফ্যাসে গলায় উত্তর দেয় সে। ওরা কি কিছু জানতে পেরেছে? মাই গড! পড়িমড়ি করে মায়ের মোবাইলে ফেসবুক খুলে দিয়ে অকুস্থল থেকে পালাতে চায় সে। অথচ কান থাকে আলোচনায়। পেছনে একগাদা মিলিত হাসির অনুরণন। আর অজন্তামাসির গলা, "ভালই পড়াবে। ব্রাইট স্টুডেন্ট ছিল তো! এতদিন পরে হোম টাউনে স্কোপ পেল। তাও আবার নিজের কলেজে। শুনলাম তো এখনও নাকি ওইরকম দুর্দান্ত চেহারা মেনটেন করেছে। উফ, অতনুদার উপরে যা ব্যথা ছিল! আর একটু হলেই অতনুদা টাল খেয়ে যেত।" অমনি রানুমাসি কলকল করে উঠল, "সুতপা সে চান্স দিলে তো? সাততাড়াতাড়ি হাইজ্যাক করল অতনুদাকে, তারপর খাইয়ে দিল কালীবাড়ি কেস! তারপর তো ওই বলির পাঁঠা দিয়েই বাকি জীবন" কথা শেষ হওয়ার আগেই হাসির হুল্লোড় ওঠে। দাঁড়িয়ে পড়ে শুভদীপ। স্থাণুবৎ। এম এম মায়ের ব্যাচমেট! বাবার প্রতি ক্রাশ ছিল তাঁর! শরীরের মধ্যে একটা অস্থির কম্পন টের পায় সে। কে যেন টুঁটি টিপে ধরতে চায় তার। সকালবেলার মধুরার চোখের আর্তি ভেসে ওঠে। ভেসে ওঠে ক্লাসের মধুরা মুখোপাধ্যায়ের বিষাদঘন মুখ। শেক্সপিয়রের সনেটে অবগাহন করেছেন তিনি। থরথর করে কাঁপছে তাঁর রক্তিম ওষ্ঠাধর, |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
পাইকগাছায় কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি লিঃ এর ব্যবস্থাপনা পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন
খাগড়াছড়িতে প্রাইম ব্যাংক জাতীয় স্কুল ক্রিকেটের ফাইনালে পুলিশ লাইন্স স্কুল চ্যাম্পিয়ন, সাইফাতের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি
সাজেকও বাঘাইছড়ির দূর্গম পাহাড়ি গ্রামে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট
তেঁতুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক সমিতির দ্বি- বার্ষিক নির্বাচন
