|
বন্যার কবলে ৯ জেলা, প্রাণহানি ৬ জনের, ৩৫ লাখের বেশি পানিবন্দি
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() বন্যার কবলে ৯ জেলা, প্রাণহানি ৬ জনের, ৩৫ লাখের বেশি পানিবন্দি বন্যাকবলিত জেলাগুলো হলো— কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রাম। নিহতরা হলেন, নাঙ্গলকোট পৌরসভার কেরামত আলী (৪৫), চৌদ্দগ্রাম উপজেলার শাহাদাত হোসেন (৩৪), ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার অজ্ঞাত ব্যক্তি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া উপজেলার সুবর্ণা আক্তার (১৯), কক্সবাজারের রামু উপজেলার সাচিং মারমা (২৬) ও আমজাদ হোছন (২২)। নয় জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, গৌমতি, মুহুরী, মেঘনা, মনু, কুশিয়ারা, ধলাই, জুড়ী, খোয়াই ও সুরমাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আশার বাণী শুনিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। সংস্থাটির মতে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে এবং দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে ভারী বৃষ্টিপাত কমে আসতে পারে। এতে উন্নতি হতে পারে বন্যা পরিস্থিতির। বিভিন্ন জেলা থেকে বন্যা পরিস্থিতির সবশেষ তথ্য জানিয়েছেন ঢাকা টাইমসের প্রতিনিধিরা— কুমিল্লা: কুমিল্লার বুড়িচংয়ে গোমতী নদীর পানিতে কিং বাজেহুড়া গ্রামটি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ৭০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বানভাসিদের সাহায্যে কাজ করছেন স্থানীয় প্রশাসন। এ ছাড়া, বুধবার বিকালে তিতাস উপজেলার আসমানিয়া বাজারসংলগ্ন কাঠের সেতু এলাকায় তীব্র স্রোতে গোমতী নদীর ওপর নির্মিত একটি বেইলি ব্রিজ ভেঙে গেছে। নোয়াখালী: নোয়াখালীতে বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। জেলার আট উপজেলার সবগুলোই প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়েছে প্রায় ২০ লাখ মানুষ। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির। খাদ্য সংকটও চরম আকার ধারণ করেছে। বন্যার সঙ্গে ভারী বর্ষণ অব্যাহত রয়েছে এ জেলায়। বুধবার (২১ আগস্ট) ভোর ছয়টা থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত জেলায় ৭৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। ফেনীর মুহুরি নদীর পানি প্রবেশ করায় জেলার সেনবাগ, কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাট উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুন্সী আমির ফয়সাল জানান, মুহুরি নদীর পানি প্রবেশের কারণে ছোট ফেনী নদীতে জোয়ার স্বাভাবিকের তুলনায় পাঁচ-ছয় ফুট উচ্চতায় বইছে। ফলে বন্যার পানি নদীতে নামতে পারছে না। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মীরা রানি দাস জানান, এবারের বন্যায় চলতি আমন ও আউশ মৌসুমে জেলায় ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। জেলা প্রশাসক মাহবুবুর রহমান জানান, মুহুরি নদীর পানির কারণে জেলার বেশির ভাগ এলাকা পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। ইতোমধ্যে ইউনিয়ন ও পৌরসভা মিলে ৮৭টি এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি প্রায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার মানুষ। বন্যার্তদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ৩৮৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে ইতোমধ্যে প্রায় ৩৮ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। ফেনী: ফেনীতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ায় জেলার সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে জেলার অধিকাংশ এলাকা। একই সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বন্যাদুর্গত মানুষজনের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে বন্যাকবলিত এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে স্পিডবোট নিয়ে কাজ শুরু করেছে সেনাবাহিনী। একইসঙ্গে বিজিবি সদস্য ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক পরিবারের শত শত স্বেচ্ছাসেবক দিনব্যাপী উদ্ধার অভিযান পরিচালনা ও খাদ্য সহায়তা প্রদান করছে। ফেনীর জেলা প্রশাসক মুছাম্মৎ শাহীনা আক্তার বলেন, বন্যায় উদ্ধারকাজে সহযোগিতার জন্য সেনাবাহিনী ও কোস্টগার্ডের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সেনাবাহিনী ছয়টি স্পিডবোট নিয়ে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছেন। আরও ছয়টি স্পিডবোট ফেনীর পথে রয়েছে। বিজিবির সদস্যরাও কাজ করছেন। কোস্টগার্ডও উদ্ধার তৎপরতায় যুক্ত হচ্ছে। লক্ষ্মীপুর: কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও উজানের অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে লক্ষ্মীপুরে চারটি পৌরশহরসহ নিম্নাঞ্চলের ৪০টি এলাকা। ২১ আগস্ট সকাল থেকে মেঘনায় অস্বাভাবিক জোয়ারের পানি লোকালয় প্রবেশ করতে শুরু করে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় সাড়ে চার লাখ বাসিন্দা। মৌলভীবাজার: ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারে বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। জেলার মনু নদীর পানি বিপৎসীমার ১৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শহরে প্রবেশ করছে মনু নদের পানি। যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে শহর তলিয়ে যাওয়ার আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। সতর্কতায় মাইকিং করা হচ্ছে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে। জেলা প্রশাসক ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয়রা শহরের বাঁধ রক্ষায় কাজ করছেন। এদিকে মনু নদীর কুলাউড়া, রাজনগর ও সদর উপজেলার অংশে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিরক্ষা বাঁধে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে আতঙ্কে আছেন নদীপাড়ের মানুষ। জেলার সব কটি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৩ লাখ মানুষ। কুশিয়ারা, মনু, ধলাই ও জুড়ী নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ধলাই ও মনু নদের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে জেলার বেশ কিছু রাস্তার ওপর পানি এসে সড়ক যোগাযোগ বিঘ্নিত হচ্ছে। তলিয়ে গেছে পাকা আউশ ধান, আমন ধানের চারা ও মাছের খামার। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাবেদ ইকবাল বলেন, অব্যাহত বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার সব কটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক ড. উর্মি বিনতে সালাম বলেন, ‘শহরের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান পরিদর্শন করছি। মাইকিং করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদেরকে মালামাল নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। সব উপজেলায় নগদ অর্থ ও ত্রাণ পাঠানো হয়েছে। হবিগঞ্জ: উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে হবিগঞ্জ জেলাতেও। ইতোমধ্যে চুনারুঘাট, মাধবপুর, শায়েস্তাগঞ্জ ও হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সাড়ে ৬ হাজার পরিবারের ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এসব এলাকার মানুষের জন্য ১১৬টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) সকালে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সুমি রানি পাল এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, চুনারুঘাট উপজেলার বাল্লা পয়েন্টে খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমার ২০১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, শায়েস্তাগঞ্জ পয়েন্টে বিপৎসীমার ১২৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং সদর উপজেলার মাছুলিয়া পয়েন্টে সন্ধ্যায় বিপৎসীমার ১৯৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। সুনামগঞ্জ: সুনামগঞ্জে ভারী বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে বৃদ্ধি পেয়েছে সুরমাসহ অন্যান্য নদীর পানি। বুধবার ১২ সেন্টিমিটার বেড়েছে সুরমা নদীর পানি। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। স্থানীয়দের মতে, পানি বাড়তে থাকলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। খাগড়াছড়ি: খাগড়াছড়িতে গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে ভেঙে পড়েছে সিঙ্গিনালা গ্রামের ৪০ বছরের পুরানো সেতু। এতে মহালছড়ির সঙ্গে মুবাছড়ি ইউনিয়নের সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় খাগড়াছড়ির সঙ্গে রাঙামাটির সাজেক, লংগদু ও বাঘাইছড়িতে সড়ক যোগাযোগও বন্ধ রয়েছে। জেলায় পানিবন্দি এখনো প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। নষ্ট হয়ে গেছে ফসলের খেত। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৯৮টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে প্রশাসন। এদিকে বন্যাদুর্গত এলাকায় খাবার, মোমবাতি ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। চট্টগ্রাম: পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে প্লাবিত হয়েছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, রাউজান ও হাটহাজারীর বেশির ভাগ গ্রামীণ এলাকা। ডুবে গেছে সড়ক, ফসলের জমি ও মাছের পুকুর। পানি বন্দী হয়ে পড়েছে আড়াই থেকে তিন লাখ মানুষ। তিন উপজেলার সঙ্গে জেলার যোগাযোগও ভেঙে পড়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে গেছে হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও রাউজানের আঞ্চলিক সড়ক। এসব এলাকার গ্রামীণ রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি ও ফসলি জমিতে কোথাও কোমরসমান, আবার কোথাও বুকসমান পানি দেখা গেছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয়রা। পানি প্রবেশ করায় বন্ধ হয়ে গেছে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় পূর্বাঞ্চলীয় কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ফেনী জেলার ভারতীয় ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এবং ত্রিপুরা রাজ্যের অভ্যন্তরীণ অববাহিকায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হয়েছে। ফলে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ফেনী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম জেলার নিম্নাঞ্চলে বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি ঘটেছে। তবে আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও এর কাছাকাছি উজানে ভারী বৃষ্টির প্রবণতা কমে আসতে পারে। এ সময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হতে পারে। এছাড়া আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও কাছাকাছি উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে আসতে পারে। এ সময় এ অঞ্চলের ফেনী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম জেলার বন্যা পরিস্থিতিরও কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
আলফাডাঙ্গায় ২৮ জুন ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন: সফল করতে প্রস্তুতি সভা সম্পন্ন
স্মার্টফোন বিস্ফোরণে আতঙ্ক, টঙ্গীতে ভিভো ফোনে অল্পের জন্য রক্ষা পেল পরিবার
সেনাবাহিনীর উদ্যোগে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
সাতক্ষীরায় রাফাতের মৃত্যুর ঘটনার সঠিক তদন্ত পূর্বক দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবিতে মানববন্ধন
