যথাযথ মর্যাদায় আজ ৬ ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম হানাদারমুক্ত দিবস পালিত
যথাযথ মর্যাদায় আজ ৬ ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম হানাদারমুক্ত দিবস পালিত হয়েছে। ৯ মাস সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের পর ১৯৭১- সালের আজকের এই দিনে কুড়িগ্রামের বীরমুক্তিযোদ্ধারা পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে কুড়িগ্রামকে হানাদারমুক্ত মুক্ত করে।
দিবসটি পালন উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা কমান্ড ও ১৯ টি সাংস্কৃতিক সংগঠন আজ সকালে শহরের স্বাধীনতার বিজয় স্তম্ভে পুষ্পার্ঘ্য অর্পন ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ মূলক আলোচনা সভার মধ্যদিয়ে দিবসটি পালন করে। এসময় বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা আহবায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ নুরুজ্জামানের সভাপতিত্বে এবং সদর কমান্ডের আহবায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুল বাতেন সরকারের সঞ্চালনায় এক স্মৃতি চারণ মূলক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বক্তব্য রাখেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ মাসুদ রানা, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ ইসমাইল হোসেন, এনডিসি এবিএম মেজবাহ উদ্দিন,সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ হাবিবুল্যা, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুল হাই সরকার (বীর প্রতীক), বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর আব্দুস সালাম(অবঃ), বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুন অর রশিদ, প্রবীন সাংবাদিক সফি খান, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড কুড়িগ্রাম জেলা সভাপতি মাহবুবুর রশীদ তালুকদার স্বপন, সহ সভাপতি নব কুমার সরখেল ববি, সাধারণ সম্পাদক আমানুর রহমান খোকন, ১৯ সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মধ্যে অনিরুদ্ধ প্রণয় প্রান্তিক, রাজ্য জ্যোতি, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম সদস্য সচিব হেলাল আহমেদ, প্রাথমিক সহকারি শিক্ষক সমিতির সদস্য সচিব আব্দুল মুমিন বাবু সহ প্রমূখ।
উল্লেখ্য বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায়, ১৯৭১- সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম দিকে ২৮ মার্চ কুড়িগ্রাম সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্বে জেলা শহরের গওহর পার্ক মাঠে এক বিশাল জনসমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখান থেকে আহম্মদ আলী বকসী, অধ্যাপক হায়দার আলী, তাছাদ্দুক হোসেন ও মহির উদ্দিন আহম্মদকে নিয়ে স্থানীয় কমান্ড গঠন করা হয়। তাদেরই নির্দেশে বিভিন্ন থানা থেকে গোলাবারুদ, অস্ত্র সংগ্রহ করে তৎকালীন মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি আহম্মদ হোসেন সরকারের রাজারহাট উপজেলাধীন টগরাইহাট গ্রামের বাড়িতে অস্ত্র মজুদ করা হয়। এরপর ওই বাড়িতে স্থানীয় যুবক ও ছাত্রদের যুদ্ধের কলাকৌশল শেখানো হয়। পরবর্তীতে ওই বাড়ি থেকে প্রথমে পুলিশ-আনসার-ছাত্র ও স্থানীয় যুবকদের মধ্যে অস্ত্র বিতরণ করে কুড়িগ্রাম অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করা হয়। ২৮ মার্চ রংপুরের ইপিআর উইং এর সহকারী অধিনায়ক ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গার এক বাড়িতে অবস্থান নেন। সেখান থেকে সংবাদ পাঠান রাজারহাট আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে। ২৯ মার্চ সকালে তৎকালীন আওয়ামীলীগ নেতা জহির উদ্দিন আহমেদ, আছমত উল্লাহ্ ব্যাপারী ও আলী মনসুর সেখানে যান। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিনের সাথে বৈঠক শেষে কুড়িগ্রাম আওয়ামী লীগকে বিষয়টি অবগত করেন। ৩০ মার্চ ক্যাপ্টেন নওয়াজেশের নির্দেশে ওই উইং এর অধিনস্থ অধিনায়ক সুবেদার নুর মোহাম্মদ, সুবেদার আ. মান্নান, সুবেদার আরব আলী ও বোরহান উদ্দিন তাদের সহযোদ্ধা ইপিআরদের নিয়ে রাজারহাট হয়ে কুড়িগ্রাম শহরে আসেন। ১ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ ঠেকাতে তিস্তা ব্রীজের অপর পাশে মুক্তিযোদ্ধারা একটি শক্তিশালী ঘাঁটি তৈরি করেন। এসময় ইপিআর সদস্যরা রাজারহাট পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্যাম্প তৈরি করেন। ৪ এপ্রিল পাকবাহিনী হারাগাছ দিয়ে তিস্তা নদী পার হয়ে লালমনিরহাটে অবস্থান নিলে মুক্তিযোদ্ধারা তিস্তার পূর্বপাড়ের ঘাঁটি রাজারহাট থেকে কুড়িগ্রামে নিয়ে আসেন। অবশেষে কুড়িগ্রামের সর্বত্র পাক হানাদার বাহিনীর সাথে কুড়িগ্রামের বীর মুক্তিযুদ্ধোদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধারা বিগ্রেডিয়ার যোশীর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৬ষ্ঠ মাউন্টেড ডিভিশনের সহযোগিতায় পাকবাহিনীর উপর পাল্টাআক্রমণ চালিয়ে ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর আজকের এই দিনে কুড়িগ্রাম হানাদার মুক্ত করেন। এদিন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল চাপের মুখে পাকিস্তানি সেনারা পরাজয় মেনে নিয়ে কুড়িগ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সর্বস্তরের জনগণ একত্রিত হয়ে কলেজ মোড়ের অভার হেড পানির ট্যাংকে প্রথম স্বাধীনতার বিজয় পতাকা উত্তোলন করেন বীরপ্রতীক আব্দুল হাই সরকার।