ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
রোববার ৩০ আগস্ট ২০২৬ ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩
যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক ভেনেজুয়েলার ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেস কে?
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Tuesday, 6 January, 2026, 4:58 PM

যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক ভেনেজুয়েলার ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেস কে?

যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক ভেনেজুয়েলার ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেস কে?

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যখন যুক্তরাষ্ট্র নৈশ অভিযান চালায়, তখন তারা শুধু ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেফতার করে নিউ ইয়র্কগামী নৌযানে তোলেনি, তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকেও গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।

৬৯ বছর বয়সী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ভেনেজুয়েলার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখা হয়। কারণ তিনি নিজেই একজন দক্ষ রাজনৈতিক কুশীলব। গত কয়েক দশক ধরে তিনি ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক গতিপথ ও ভাগ্য নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে এসেছেন।

দেশটির ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে বহু বছর ধরে কাজ করার পর ২০১৩ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার স্বামী নিকোলাস মাদুরো জয়ী হলে, মাদুরোকে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ও মাদুরোর অবস্থান আরও দৃঢ় করতে তিনি পর্দার আড়াল থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দেশটির ফার্স্ট লেডি হিসেবে মাদুরো তাকে "ফার্স্ট ওয়ারিয়র" নামে ডাকতেন।

প্রকাশ্যে তিনি তুলনামূলকভাবে আড়ালে থাকলেও সমালোচকদের মতে, কঠোর শাসনব্যবস্থার বিপরীতে একটি পরিবারকেন্দ্রিক ভাবমূর্তি তুলে ধরতেন সিলিয়া ফ্লোরেস।

সিলিয়া ফ্লোরেস 'কন সিলিয়া এন ফামিলিয়া' নামক একটি টিভি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতেন এবং মাঝে মাঝে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে স্বামীর সঙ্গে তাকে সালসা নাচতেও দেখা যেত।

তবে পর্দার আড়ালে তিনি মাদুরোর অন্যতম প্রধান পরামর্শদাতা এবং কীভাবে মাদুরো ক্ষমতায় টিকে থাকবেন, সেই কৌশল তৈরিরও প্রধান কুশীলব বলে মনে করা হয়।

সিলিয়া ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে কোকেন পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো (ডান) ও ভেনেজুয়েলার ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেস (বাঁ দিকে) হাত তুলে হাসিমুখে  সম্ভাষণ জানাচ্ছেন। 

এখন তিনি তার স্বামীর সঙ্গে নিউ ইয়র্কের একটি আদালতে মাদক পাচার ও অস্ত্র সংক্রান্ত অভিযোগের মুখোমুখি হবেন। সিলিয়া ফ্লোরেস ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে নিকোলাস মাদুরোর সঙ্গে পরিচিত হন।

সে সময় ফ্লোরেস একজন উদীয়মান আইনজীবী ছিলেন এবং ১৯৯২ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িতদের পক্ষে মামলা লড়ছিলেন। ওই অভ্যুত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন উগো চ্যাভেজ, যিনি পরে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হন।

নিকোলাস মাদুরো তখন চ্যাভেজের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তখনই তার সাথে সিলিয়া ফ্লোরেসের দেখা হয়। মাদুরো স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, "জীবনের এক পর্যায়ে সিলিয়ার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়।"

"তিনি কয়েকজন কারাবন্দি দেশপ্রেমিক সামরিক কর্মকর্তার আইনজীবী ছিলেন। পাশাপাশি তিনি কমান্ডার উগো চ্যাভেজেরও আইনজীবী ছিলেন। আর কারাগারে কমান্ডার চ্যাভেজের আইনজীবী হওয়া বেশ কঠিন কাজ ছিল," বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, "সংগ্রামের সেই দিনগুলোতেই তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়, আর তখনই তিনি আমার নজর কাড়েন।"

এর পর থেকে তাদের দু'জনের জীবন ও রাজনীতি চ্যাভেজ এবং তার রাজনৈতিক আন্দোলন 'চাভিসমো'র সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে যায়। ১৯৯৮ সালে উগো চ্যাভেজ প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর সিলিয়া ফ্লোরেস দ্রুত রাজনীতিতে উপরের সারিতে উঠে আসেন।

২০০০ সালে তিনি ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে যোগ দেন এবং ২০০৬ সালে অ্যাসেম্বলির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। টানা ছয় বছর তিনি কার্যত একদলীয় একটি পার্লামেন্টের নেতৃত্ব দেন। সে সময় প্রধান বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করেছিলো, তাদের বক্তব্য ছিল নির্বাচনগুলো অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না।

২০১৩ সালে চ্যাভেজ মারা গেলে সিলিয়া ফ্লোরেস প্রকাশ্যে নিকোলাস মাদুরোর পাশে দাঁড়ান। এরপরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাদুরো অল্প ব্যবধানে জয়ী হন।

এর কয়েক মাস পর এই দম্পতি বিয়ে করেন। এর মাধ্যমে তাদের বহু বছরের সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। এর আগে তারা একসঙ্গে থাকতেন এবং আগের সম্পর্ক থেকে আসা সন্তানদের বড় করছিলেন। ফ্লোরেসের ছিল তিন সন্তান, আর মাদুরোর ছিল একজন।

ভেনেজুয়েলার সাংবাদিক ও অ্যামেরিকাস কোয়ার্টারলি-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক জোস এনরিক আরিওজা বলেন, "তিনি মাদুরোর শাসনব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন।"

তিনি আরও বলেন, "ব্যক্তিগত জীবনে যেমন তিনি শুধু মাদুরোর সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিলেন, পেশাগত দিক থেকেও তিনি তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা ছিলেন। আর ক্ষমতার প্রতি তার আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রবল।" সিলিয়া ফ্লোরেসের ক্যারিয়ারে তার বিরুদ্ধে একাধিকবার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

২০১২ সালে শ্রমিক সংগঠনগুলো তার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তোলে, যে তিনি প্রভাব খাটিয়ে প্রায় ৪০ জনকে চাকরি দিয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকেই তার পরিবারের সদস্য। জবাবে সিলিয়া ফ্লোরেস বলেন, "আমার পরিবার এখানে এসেছে এবং তারা আমার পরিবার। এ নিয়ে আমি গর্বিত। আমি তাদের পক্ষে দাঁড়াবো।" ২০১৫ সালের নভেম্বরে তিনি আলোচনায় আসেন 'নার্কো নেফিউজ' মামলায়।

সে সময় তার দুই ভাগ্নে ফ্রান্সিসকো ফ্লোরেস দে ফ্রেইতাস ও এফ্রেইন আন্তোনিও ক্যাম্পো ফ্লোরেসকে হাইতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ) পরিচালিত একটি গোপন অভিযানে গ্রেফতার করা হয়। তারা যুক্তরাষ্ট্রে ৮০০ কেজি কোকেন পাচারের চেষ্টা করছিলেন।

ফ্লোরেস দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ তার ভাগ্নেদের 'অপহরণ' করেছে। তবে আদালত পরে ওই দুইজনকে মাদক পাচারের দায়ে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেয়। ২০২২ সালে বাইডেন প্রশাসনের সময় এক বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় তাদের ভেনেজুয়েলায় ফেরত পাঠানো হয়।

কিন্তু গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসন সিলিয়া ফ্লোরেসের ওই দুই ভাগ্নের পাশাপাশি তার আরেক ভাগ্নে কার্লোস এরিক মালপিকা ফ্লোরেসের বিরুদ্ধেও নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ত বলেন, "ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার সহযোগীরা যুক্তরাষ্ট্রে এত পরিমাণে মাদক পাঠাচ্ছে, যা মার্কিন নাগরিকদের ক্ষতির মুখে ফেলছে।"

তিনি আরও বলেন, ''ট্রেজারি বিভাগ শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে তাদের চলমান অপরাধের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনছে''।

সম্প্রতি প্রকাশিত অভিযোগপত্রে সিলিয়া ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে আরও যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ২০০৭ সালে কয়েক লাখ ডলার ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ঘুষের বিনিময়ে তিনি একজন বড় মাদক পাচারকারীর সঙ্গে ভেনেজুয়েলার জাতীয় মাদকবিরোধী দপ্তরের পরিচালকের বৈঠকের ব্যবস্থা করেন।

চ্যাথাম হাউজের লাতিন আমেরিকা কর্মসূচির সিনিয়র ফেলো ক্রিস্টোফার সাবিটিনি বলেন, "তার সমালোচকদের কাছে তিনি একটি গভীরভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী এবং কঠোর সরকারের অংশ হিসেবে বিবেচিত।"

তিনি আরও বলেন, "তিনি ছিলেন ক্ষমতার আড়ালের শক্তি। তবে ক্ষমতার আড়ালের মানুষদের মতোই তার ভূমিকা খুব একটা চোখে পড়তো না। ফলে আসলে তিনি কতটা শক্তিশালী ছিলেন, তা অনেকেই বুঝতে পারেনি।"

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status