রাজশাহী, খুলনা বিভাগসহ দেশের ২৪ জেলায় তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে আছে রাজধানী ঢাকাও। কয়েক দিন ধরে গরমের সঙ্গে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। কিন্তু জ্বালানির অভাবে চাহিদামতো উৎপাদন করতে না পারায় বাড়ছে বিদ্যুতের ঘাটতি। বাড়ছে লোডশেডিংও।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের মূল সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড পিএলসি বাংলাদেশ (পিজিসিবি) বলছে, গত মঙ্গলবার সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে রাত ১২টার সময়—২ হাজার ১৬৮ মেগাওয়াট। আর দিনের বেলায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ২ হাজার মেগাওয়াট। গতকাল বুধবার দিনের বেলায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং বেড়ে হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট। রাতে এটি আরও বাড়তে পারে।
তবে লোডশেডিংয়ের এ তথ্যের সঙ্গে বিতরণ সংস্থার তথ্যের অমিল আছে। দেশের সবচেয়ে বড় বিতরণ সংস্থা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) তথ্য বলছে, গতকাল দুপুর ১২টার সময় তাদের লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট। একই সময়ে পিজিসিবির হিসাবে লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৪৯৩ মেগাওয়াট। এর আগে বেলা ১১টার সময় আরইবির লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ১৯৫ মেগাওয়াট।
এ বিষয়ে পিজিসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ খান প্রথম আলোকে বলেন, চাহিদার হিসাব পিডিবি ও বিতরণ সংস্থার। তারা মিলে প্রকৃত চাহিদার হিসাব করতে পারে। পিজিসিবি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নিয়ে তা সঞ্চালন করে তাদের বিদ্যুৎ দেয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমায় ঘাটতি বাড়ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, এবারের গ্রীষ্মে গরম বেশি হতে পারে। গতকাল এ বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে উত্তরের জেলা রাজশাহীতে—৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৩, টাঙ্গাইল ও মাদারীপুরে ৩৬, দিনাজপুরে ৩৬ দশমিক ৫, রাঙামাটিতে ৩৬ দশমিক ৮ ও বান্দরবানে ৩৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক বলেন, তাপপ্রবাহ বৃহস্পতিবার না বাড়লেও পরের দিন শুক্রবার বেড়ে যেতে পারে।
বিগত সরকারগুলোর রেখে যাওয়া বিপুল বকেয়ার দায় আছে। তেল কিনতে না পারায় তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। জ্বালানিসংকটের উৎপাদন ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে পিডিবি। এর মধ্যে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। কয়লার অভাবে পটুয়াখালীর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বন্ধ। চট্টগ্রামের বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র অর্ধেক উৎপাদন করছে।
দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনসক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট। গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জ্বালানি নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। বাড়তি সক্ষমতা অলস বসিয়ে রেখে ভাড়া (ক্যাপাসিটি চার্জ) দিতে হচ্ছে। এতে সরকারের ওপর বড় রকমের ভর্তুকির চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে বিগত সরকারগুলোর রেখে যাওয়া বিপুল বকেয়ার দায় আছে। তেল কিনতে না পারায় তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। জ্বালানিসংকটের উৎপাদন ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে পিডিবি। এর মধ্যে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। কয়লার অভাবে পটুয়াখালীর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বন্ধ। চট্টগ্রামের বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র অর্ধেক উৎপাদন করছে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম প্রথম আলোক বলেন, কারিগরি ত্রুটির কারণে আদানির একটি ইউনিট থেকে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এটি উৎপাদনে ফিরতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। গরমে চাহিদাও বেড়ে গেছে। ফার্নেস তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। ডিজেলচালিত কেন্দ্রও চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যে নির্মিত আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার। ২০১৭ সালে আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি করে পিডিবি। ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট আছে এখানে। পিডিবি সূত্র বলছে, কিছুদিন ধরে গড়ে দেড় হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে আদানির কেন্দ্রটি। একটি ইউনিট বন্ধের পর উৎপাদন কমে ৭৫০ থেকে ৭৭০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।
সব সরকারের আমলেই এভাবে হিসাব করা হচ্ছে। আর ঘাটতি হলে তা গ্রামে চাপানো হচ্ছে। লোডশেডিং গ্রাম থেকে কিছুটা কমিয়ে ঢাকাতেও দেওয়া যেতে পারে।
ঘাটতি বেশি গ্রামে
বিদ্যুৎ খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা এবার সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট উঠেছে। এতেই আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াটের মতো ঘাটতি থাকছে। গরমের তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে বাড়তি চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে যাবে।
ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) ও ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)। এ দুটি সংস্থার দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, দুটি সংস্থা মিলে চাহিদা প্রায় সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। এখন পর্যন্ত বিদ্যুতের ঘাটতি নেই তাদের। তবে বিতরণ লাইনের জটিলতায় ও কারিগরি কারণে মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ–বিভ্রাট হচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়।
উত্তরাঞ্চলের শহর এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা নর্দান ইলেকট্রিক কোম্পানি (নেসকো) ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)। সংস্থা দুটি বলছে, গতকাল তাদের ঘাটতি কিছুটা বেড়েছে। এতে এক–দুই ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে কোথাও কোথাও।
তবে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে আরইবির এলাকায়। সারা দেশের গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে সংস্থাটি। গতকাল দিনের বেলায় চাহিদার তুলনায় গড়ে ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ কম পেয়েছে আরইবি। সারা দেশে ৮০টি সমিতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে তারা। এর মধ্যে ৪৮ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ কম পেয়েছে ময়মনসিংহ অঞ্চল। রংপুরে সরবরাহ কম ছিল ৪০ শতাংশ। ৩৯ শতাংশ কম সরবরাহ পেয়েছে খুলনা। এতে দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হয় কোথাও কোথাও।
নেসকো,ওজোপাডিকো বলছে, গতকাল তাদের ঘাটতি কিছুটা বেড়েছে। এতে এক–দুই ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে কোথাও কোথাও।
ঢাকার বাইরে ভুগছে মানুষ
২ মাস ৮ মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে বেশ কষ্টের মধ্যে পড়েছেন ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আসমাউল হোসনা। তিনি বলেন, গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ছয়-সাতবার বিদ্যুৎ গেছে। বিদ্যুৎ ২০ থেকে ৩০ মিনিট থেকে আবার চলে যায়। গরম বেশি হলেই এ অবস্থা তৈরি হয়।
ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ জ্যেষ্ঠ জেনারেল ম্যানেজার মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, চাহিদা ৬৬ মেগাওয়াট, সরবরাহ ৩২ থেকে ৩৫ মেগাওয়াট। লোডশেডিং করে সামাল দিতে হচ্ছে।
নেত্রকোনার কলমাকান্দার কৈলাটি ইউনিয়নের পাগলা বাজারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তালুকদার ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপক রাসেল মিয়া বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে প্রায় ১৪ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না।
চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ৪৮ শতাংশ উল্লেখ করে নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক আকরাম হোসেন বলেন, এ কারণে ঘন ঘন লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
রংপুরে গ্রামেও দিনের প্রায় সাত-আট ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১–এর ব্যবস্থাপক মুহাম্মাদ আশরাফ উদ্দিন খান বলেন, সর্বোচ্চ ৪২ শতাংশ লোডশেডিং হয়েছে।
গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ছয়-সাতবার বিদ্যুৎ গেছে। বিদ্যুৎ ২০ থেকে ৩০ মিনিট থেকে আবার চলে যায়। গরম বেশি হলেই এ অবস্থা তৈরি হয়।
আসমাউল হোসনা
রংপুরে পীরগাছা উপজেলার নব্দীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা আরিফা সুলতানা বলেন, তাঁর ছেলে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পড়াশোনা করতে পারছে না।
লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষিকাজেও প্রভাব পড়ছে। রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার কালুপাড়া এলাকার বোরো ধানচাষি আবদুল হালিম গতকাল বিকেলে বলেন, তিন দিন ধরে ধানখেতে পানি দিতে পারেননি। শ্যালো মেশিনও চালানো যাচ্ছে না। ডিজেল আনতে গিয়ে দেখেন, তেলের পাম্প বন্ধ।
জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম তামিম প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাসস্বল্পতার কথা আগে থেকেই জানা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগেই কয়লা সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা ছিল। আর পিডিবি যে চাহিদা দেখায়, তা তাদের তৈরি করা; বাস্তবের সঙ্গে এর কোনো সংগতি নেই। সব সরকারের আমলেই এভাবে হিসাব করা হচ্ছে। আর ঘাটতি হলে তা গ্রামে চাপানো হচ্ছে। লোডশেডিং গ্রাম থেকে কিছুটা কমিয়ে ঢাকাতেও দেওয়া যেতে পারে।