|
বৃষ্টি, ভাঙা বাঁধ আর রোদহীনতায় হাওরজুড়ে বিপর্যয়
নতুন সময় প্রতিনিধি
|
![]() বৃষ্টি, ভাঙা বাঁধ আর রোদহীনতায় হাওরজুড়ে বিপর্যয় জেলার বিভিন্ন হাওরে ঘুরে দেখা গেছে, হাঁটু থেকে বুকসমান পানিতে নেমে কৃষকরা শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ফসল ঘরে তোলার। কিন্তু আবহাওয়া প্রতিকূল হওয়ায় সেই চেষ্টা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যনগর, তাহিরপুর ও শাল্লা উপজেলার পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মধ্যনগরের একাধিক স্থানে বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়ায় ইকরাছই হাওরসহ বিস্তীর্ণ এলাকার ধান ইতোমধ্যেই তলিয়ে গেছে। সদর উপজেলার দেখার হাওরেও একই চিত্র। অনেক কৃষক ভোর থেকেই পানিতে নেমে ডুবে যাওয়া ধান তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। অনেকের জমির ধান কেটে খলায় রেখে পচতে দেখছেন, আবার বাকি জমির ধান চোখের সামনে পানিতে ডুবে যাচ্ছে। বজ্রপাতের ঝুঁকি থাকলেও জীবন বাজি রেখে হাওর ছাড়তে পারছেন না কেউই। গত দুই দিনের বৃষ্টিতেই জেলার অন্তত ৫০৫ হেক্টর জমি জলাবদ্ধতায় ডুবে গেছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। স্থানীয়দের ধারণা, বাস্তবে ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি কোথাও দেড় থেকে দুই হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। নলুয়ার হাওর,মাটিয়ান হাওর সহ ধর্মপাশা ও মধ্যনগর আশপাশের এলাকাগুলোতেও একই দুরবস্থা বিরাজ করছে। অনেক কৃষক ইতোমধ্যেই ডুবে যাওয়া জমির ধান কাটার আশা ছেড়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে, যে ধান কাটা হয়েছে সেটিও শুকাতে না পারায় নষ্ট হওয়ার পথে। পরিবহন সংকট ও দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে হাওরেই ধান ফেলে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে শ্রমিক সংকট ও যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা। জমিতে পানি জমে থাকায় হারভেস্টার মেশিন প্রবেশ করতে পারছে না, ফলে সময়মতো ধান কাটাও সম্ভব হচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজেলের উচ্চমূল্য ও ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার হতাশা। মধ্যনগর সাইফুল মিয়া জানান, সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের হামিদপুর গ্রামের পাশ দিয়ে যাওয়া গ্রামীণ সড়কের জামগড়া খালের বাঁধ ভেঙে ইয়ারন বিলে পানি প্রবেশ করছে। এতে হাওরে থাকা পাকা ও আধাপাকা ধান তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে এ বাঁধটি ভেঙে পানি প্রবেশ শুরু হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এদিকে ক্রমাগত বৃষ্টিতে হাওরের বাঁধগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। মধ্যনগরের বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নে একটি খালের বাঁধ ভেঙে নতুন করে হাওরে পানি প্রবেশ করায় ইয়ারন বিলসহ আশপাশের এলাকায় তৈরি হয়েছে চরম উৎকণ্ঠা। স্থানীয়রা বলছেন, দ্রুত বাঁধ মেরামতের উদ্যোগ না নিলে বড় ধরনের ক্ষতি অনিবার্য। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি আরো বাড়বে। আকস্মিক বন্যার শঙ্কা আছে। বৃষ্টিতে বাঁধ দুর্বল হয়ে গেছে। বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে পাহাড়ি ঢলের সেই চাপ বাঁধ সামলাতে পারবে না।’এবার পাউবো ফসল রক্ষার জন্য ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরে ৭০২টি প্রকল্পের ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক জানান, এ বছর সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এ পর্যন্ত হাওরে ৫৩ হাজার ৬৪০ হেক্টর জমির ধান কর্তন করা হয়েছে। তবে জলাবদ্ধতা ও শ্রমিক সংকট রয়েছে। সব মিলিয়ে, বাম্পার ফলনের স্বপ্ন দেখা সুনামগঞ্জের কৃষকদের জন্য এ মৌসুম এখন রূপ নিয়েছে দুঃস্বপ্নে। দ্রুত আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়া এবং জরুরি ভিত্তিতে বাঁধ মেরামত না হলে হাওরাঞ্চলে ভয়াবহ কৃষি বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
