|
চীনের চোখ ধাঁধানো উন্নয়নের পেছনে যে গল্প
নতুন সময় ডেস্ক
|
|
চীনের চোখ ধাঁধানো উন্নয়নের পেছনে যে গল্প ঢাকার চীনা দূতাবাসের আমন্ত্রণে একটি সাংবাদিক প্রতিনিধি দল গত সপ্তাহে চীন সফর করে। চীনের এই উন্নতির পেছনের কারণ জানতে চাইলে চীনা গাইড ক্যাথে বাংলানিউজকে বলেন, ‘চীনের জনগণের কঠোর পরিশ্রম। সেই সাথে রয়েছে চীন সরকারের ভিশন। এই দুইয়ের সমন্বয়েই আজ এই উন্নতি।’ মাও সে তুং ১৯৪৯ সালে মাও সে তুং-এর নেতৃত্বে চীনা বিপ্লবের পর বিশেষ করে ১৯৫৮-১৯৬২ সালের মধ্যে চীনে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, এতে প্রায় ২ কোটি মানুষ অনাহারে এবং অপুষ্টিতে মারা যায়। বিপ্লবের পর মাও সে তুং চীনের কৃষি অর্থনীতিকে দ্রুত শিল্প অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড আন্দোলন শুরু করেন। এর ফলে কৃষকরা যৌথ খামারে কাজ শুরু করেন। ফলে কৃষি উৎপাদন কমে যায়। অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগও বেড়ে গিয়েছিলো। ওই সময়ে খরা ও বন্যা দেখা দেয়। ফসলের পোকা বেড়ে গিয়ে উৎপাদনও কমে যায়। তবে বিষ্ময়কর হলো, চীন সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে এখন বিশ্বে শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেং জিয়াওপিং চীনের বর্তমান উত্থানের পেছনে চীনের প্রভাবশালী নেতা দেং জিয়াওপিংয়ের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৭৮ সালের পর চীনের উন্নয়নে দেং জিয়াওপিং বেশ কয়েকটি নীতি গ্রহণ করেন। এসব নীতির মধ্যে ছিলো চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কার, যা ‘সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি’ নামে পরিচিত। মাও সেতুংয়ের কঠোর নীতি থেকে সরে এসে তিনি ব্যক্তিগত মালিকানা, বৈদেশিক বিনিয়োগ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ‘সাদা বিড়াল হোক বা কালো বিড়াল, যে বিড়াল ইঁদুর ধরে সেই ভালো’। সাদা বিড়ালের এই উক্তি দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, সমাজতান্ত্রিক বা পুঁজিবাদী—যেকোনো পদ্ধতিই হোক না কেন, যদি তা দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি আনে, তবে সেটিই ভালো। এসব নীতির মাধ্যমে চীন দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। এদিকে ২০০১ সালের ১১ ডিসেম্বর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডাব্লিউটিও) যোগদানের পর থেকে চীন বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্য রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে আমূল পরিবর্তন এনেছে। এই সদস্যপদ চীনকে বিশ্ব অর্থনীতির সাথে একীভূত করে, বর্তমানে চীন বিশ্বব্যাপী জিডিপি বৃদ্ধিতে ৩০ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখছে এবং প্রায় ১২০টি দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে চীন। আকাশছোঁয়া অট্টালিকা চীনের উন্নয়নের পেছনে আরও যেসব কারণ রয়েছে সেগুলো হলো- অর্থনৈতিক সংস্কার, শিক্ষায় আমূল পরিবর্তন, বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিকাশ, চীনা প্রেসিডেন্টের ভিশন প্রভৃতি। অর্থনৈতিক সংস্কার: ১৯৮০-এর দশকের শুরুতেই চীনের প্রভাবশালী নেতা দেং জিয়াওপিং-এর নেতৃত্বে চীন কঠোর সাম্যবাদ থেকে সরে এসে বাজার-ভিত্তিক সংস্কার শুরু করে। তারা বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য দরজা খুলে দেয় এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করে। শিক্ষায় ব্যবস্থায় পরিবর্তন: চীন সাধারণ শিক্ষার চেয়ে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এমনকি এক সময় তারা দীর্ঘ ১২ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বন্ধ রেখে তরুণদের বিভিন্ন ট্রেড কোর্সে দক্ষ করে তুলেছিল, যাতে তারা সরাসরি উৎপাদনে অংশ নিতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগ: সারা বিশ্বের বড় বড় কোম্পানি এখন চীনে বিনিয়োগে আগ্রহী। চীনে অল্প টাকায় শ্রমিক মেলা এবং সরকারি ভর্তুকির কারণে বিশ্বের হাজার হাজার কোম্পানি চীনে তাদের কারখানা স্থাপন করেছে। এর ফলে চীন বিশ্বের বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। অবকাঠামো ও প্রযুক্তি: চীন তার জিডিপির একটি বিশাল অংশ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বর্তমানে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো উচ্চপ্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার অভুতপূর্ব উন্নয়ন বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ: চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৩ সালে বিশ্বব্যাপী অবকাঠামো ও উন্নয়ন কৌশল ঘোষণা করেন। যেটা মূলত প্রাচীন ‘সিল্ক রোড’-এর আধুনিক সংস্করণ। এর লক্ষ্য সড়ক, রেলপথ, সমুদ্রবন্দর, পাইপলাইন, বিমানবন্দর এবং টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক নির্মাণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সংযোগ বৃদ্ধি করা। এই উদ্যোগের মধ্যে দিয়ে চীন নিজ দেশের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের সঙ্গেও দেশটি উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প: চীনের প্রতিটি বাড়িকে এক সময়ে একেকটি ছোট কারখানায় রূপান্তর করা হয়েছিল, যার ফলে পণ্যের উৎপাদন খরচ অবিশ্বাস্যভাবে কমে যায়। এখন অবশ্য সেখান থেকে বেরিয়ে বড় বড় কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। উন্নয়নের জন্য কঠোর পরিশ্রমে জোর দিয়েছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং। তিনি বলেছেন, অগ্রগতির পথ বন্ধুর এবং সংস্কার, উন্নয়ন, ও স্থিতিশীলতা অর্জনের কাজ কষ্টসাধ্য হলেও, আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সম্পূর্ণ আশাবাদী। চীনের শ্রমিক-শ্রেণিকে চীনা পথ ধরে চলা, চীনা চেতনা সমুন্নত রাখা ও চীনের শক্তি-সামর্থ্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক ও নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করতে হবে এবং চীনা স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। গাড়ি তৈরির কারখানা তিনি আরো বলেন, জনগণই ইতিহাস সৃষ্টি করে এবং পরিশ্রমই সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে। পরিশ্রমই মানবসমাজের বিকাশকে ত্বরান্বিত করার মূল শক্তি। সুখ কখনও আকাশ থেকে পড়ে না; স্বপ্নও আপনাআপনি বাস্তবায়িত হয় না। নিজেদের লক্ষ্য পূরণ করতে ও সুউজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করতে আমাদেরকে। সম্পূর্ণভাবে জনগণের ওপর নির্ভর করতে হবে; সর্বদা তাদের স্বার্থ রক্ষায় তৎপর থাকতে হবে; এবং অধ্যবসায়, নিষ্ঠা, ও সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরিশ্রম করতে হবে। আমরা প্রায়ই বলি, ‘ফাঁকা বুলি দেশের ক্ষতি করে, আর কঠোর পরিশ্রমই দেশের সমৃদ্ধি বয়ে আনে’ এর মানে, আমাদেরকে প্রথমে হাড়-ভাঙা পরিশ্রম করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ চীনের দ্রুত উন্নয়নের কারণ হিসেবে বলেছেন, ‘চীনের দ্রুত উন্নয়নের মূল কারণ তাদের পরিকল্পিত কাঠামোগত সংস্কার, শিল্পায়ন এবং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ। চীনের এই উন্নয়ন কেবল তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে না দেখে, বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি মডেল হিসেবে দেখা প্রয়োজন।’ |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
