ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
মঙ্গলবার ১৬ জুন ২০২৬ ২ আষাঢ় ১৪৩৩
পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার নতুন দিগন্ত : ব্যারিস্টার কাজী ইসতিয়াক হোসাইন জিসান
মোঃ মোবারক হোসেন, খাগড়াছড়ি
প্রকাশ: Tuesday, 16 June, 2026, 7:42 PM

পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার নতুন দিগন্ত : ব্যারিস্টার কাজী ইসতিয়াক হোসাইন জিসান

পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার নতুন দিগন্ত : ব্যারিস্টার কাজী ইসতিয়াক হোসাইন জিসান

দীর্ঘমেয়াদি ইজারা, ডিজিটাল প্রশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। 

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় অঞ্চল। প্রাকৃতিক সম্পদ, পর্যটন, কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প ও সীমান্তভিত্তিক বাণিজ্যের কারণে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বাজার ফান্ড ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন ও সংস্কার এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।

তিনি ফেসবুক পোষ্টে লিখেন, পার্বত্য অঞ্চলের শহর ও গ্রামীণ বাজার এলাকার জমি বন্দোবস্ত, নিয়ন্ত্রণ এবং রাজস্ব আদায়ের প্রধান আইনি ভিত্তি হলো Chittagong Hill Tracts Regulation, 1900 এবং এর অধীনে প্রণীত Bazar Fund Manual, 1937। দীর্ঘদিন ধরে এই বিধান বাজার ফান্ড পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বর্তমান সময়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বিনিয়োগ চাহিদার সঙ্গে এর অনেক বিধান আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তি এবং পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী বাজার ফান্ড ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব জেলা পরিষদের অধীনে ন্যস্ত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা ধরনের জটিলতা ও সমন্বয়হীনতা বিদ্যমান। এর ফলে নীতিগত সংস্কার, আধুনিকায়ন এবং সেবার মানোন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারেনি।

একসময় বাজার ফান্ডের জমি দীর্ঘমেয়াদি, এমনকি ৯৯ বছরের জন্যও বন্দোবস্ত দেওয়া হতো। ফলে ব্যবসায়ীরা নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ করতে পারতেন এবং ব্যাংকগুলোও এসব সম্পত্তিকে অর্থায়নের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করত। বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইজারার মেয়াদ ১০ বছর বা তারও কম হওয়ায় ব্যাংকগুলো ঋণ প্রদানে অনাগ্রহী। এতে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহে ব্যর্থ হচ্ছেন এবং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো ইজারা বা নবায়ন প্রক্রিয়ার জটিলতা। হেডম্যানের সুপারিশ, সার্কেল চিফের প্রত্যয়ন এবং জেলা প্রশাসকের অনুমোদনসহ একাধিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়। অথচ এসব ধাপের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ও সরকারি ফি কাঠামো সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত নয়। ফলে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়।

খালি প্লট, ইজারার অবস্থা কিংবা আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কিত তথ্য সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য নয়। এতে প্রকৃত উদ্যোক্তা, বিশেষ করে তরুণ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পিছিয়ে পড়েন। একই সঙ্গে জনমনে একটি অস্বচ্ছ ও অকার্যকর ব্যবস্থার ধারণা তৈরি হয়। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাজার ফান্ড প্রশাসকের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের নিষ্পত্তির কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।

তবে বাজার ফান্ড ব্যবস্থার আধুনিকায়ন কোনোভাবেই পার্বত্য শান্তি চুক্তির পরিপন্থী নয়। বরং এটি প্রথাগত নেতৃত্ব ও আধুনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। হেডম্যান ও সার্কেল চিফদের একটি স্বচ্ছ ও ডিজিটাল কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা হলে তাদের আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা আরও শক্তিশালী হবে।

একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা নিশ্চিত হলে পার্বত্য অঞ্চলের স্থানীয় ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা এবং বিনিয়োগকারীরা অধিক নিরাপত্তা লাভ করবেন। ব্যাংকগুলো ঋণ প্রদানে উৎসাহিত হবে এবং শিল্প ও বাণিজ্যে নতুন গতি সৃষ্টি হবে।

এক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে।

প্রথমত, বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতের জন্য বাজার ফান্ডের ইজারার মেয়াদ ন্যূনতম ২০ থেকে ৩০ বছর নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এতে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারবেন এবং ব্যাংক অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।

দ্বিতীয়ত, আবেদন, ফি পরিশোধ, যাচাই-বাছাই ও অনুমোদনসহ পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতে হবে। অনলাইনে খালি প্লটের তথ্য উন্মুক্ত করা হলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং অনিয়ম কমবে।

তৃতীয়ত, প্রতিটি প্রশাসনিক ধাপের জন্য নির্দিষ্ট সরকারি ফি এবং সর্বোচ্চ সময়সীমা আইনগতভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। একইসঙ্গে আপিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও বাধ্যতামূলক সময়সীমা থাকতে হবে।

চতুর্থত, স্থানীয় স্থায়ী বাসিন্দা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য অগ্রাধিকারমূলক নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে একই প্লটের জন্য একাধিক যোগ্য আবেদনকারী থাকলে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ লটারির মাধ্যমে ইজারা প্রদান করা অধিক গ্রহণযোগ্য ও ন্যায়সংগত পদ্ধতি হতে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে বাজার ফান্ড সংস্কারের বিকল্প নেই। একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বাজার ফান্ড নীতিমালা শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং পর্যটন বিকাশে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

সময়ের দাবি হলো—পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহ্য, প্রথাগত নেতৃত্ব ও সাংবিধানিক কাঠামোর প্রতি সম্মান রেখে বাজার ফান্ড ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করা। প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়িত হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু একটি সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবেই নয়, বরং বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status