ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শনিবার ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩
পৃথিবীতে আসার আগেই ডেঙ্গুতে মায়ের সঙ্গে নিভে গেল গর্ভের শিশুর প্রাণ
নতুন সময় প্রতিনিধি
প্রকাশ: Saturday, 12 September, 2026, 8:15 PM

পৃথিবীতে আসার আগেই ডেঙ্গুতে মায়ের সঙ্গে নিভে গেল গর্ভের শিশুর প্রাণ

পৃথিবীতে আসার আগেই ডেঙ্গুতে মায়ের সঙ্গে নিভে গেল গর্ভের শিশুর প্রাণ

একটুখানি স্বপ্নের ছোঁয়া, একটি নতুন জীবনের আগমনী বার্তা- সবই প্রস্তুত ছিল। আগামী ১২ অক্টোবর প্রথম সন্তানকে কোলে নেওয়ার কথা ছিল অর্পিতা দাশের (২৬)। কিন্তু এক নির্মম বাস্তবতা সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিল। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন এই মা, আর পৃথিবীর আলো দেখার আগেই নিভে গেছে গর্ভের ছোট্ট জীবনটিও।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অর্পিতা।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তিনি চট্টগ্রাম কাস্টমসের কর্মী মিঠুন চৌধুরীর স্ত্রী। এটি ছিল তাদের প্রথম সন্তান। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে জ্বর অনুভব করার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ৬ সেপ্টেম্বর অর্পিতার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা জানান, তিনি ডেঙ্গু এক্সপ্যান্ডেড সিন্ড্রোমে ভুগছিলেন। রাতে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয় এবং প্ল্যাটিলেট দেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। শুক্রবার দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। এরপর অর্পিতার গর্ভস্থ মৃত পুত্রসন্তান প্রসব হয়।

অর্পিতার মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার সুযোগ পাওয়ার আগেই একই শহরে আরেকটি পরিবারে নেমে এসেছে ডেঙ্গুর নির্মম আঘাত। সন্তান জন্ম দেওয়ার মাত্র এক মাস ছয় দিনের মাথায় ডেঙ্গুতে মারা গেছেন রাশেদা বেগম রিমা (২৯)।

সন্দ্বীপ উপজেলার বাসিন্দা রিমা ছিলেন স্বাস্থ্য সহকারী। ১০ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) সকালে চট্টগ্রাম মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে স্বাস্থ্য সহকারী পদে যোগ দেওয়া রিমার কর্মস্থল ছিল সন্দ্বীপ উপজেলার বাউরিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে।

দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পর মাতৃত্বকালীন ছুটিতে তিনি চট্টগ্রামের বাসায় অবস্থান করছিলেন। কিন্তু সেই ছুটি আর শেষ হয়নি, কর্মস্থলেও ফেরা হয়নি তার। সাড়ে চার বছরের ছেলে ও মাত্র এক মাস ছয় দিন বয়সী দুধের শিশুকে রেখে না ফেরার দেশে চলে যেতে হয়েছে তাকে।

অর্পিতা ও রিমার মৃত্যু চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ভয়াবহতার দুটি হৃদয়বিদারক উদাহরণ। সরকারি হিসাবেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রকাশিত দৈনিক ডেঙ্গু রোগীর বিবরণী অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৫৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

নতুন আক্রান্তদের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৪ জন। এরমধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৬ জন, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ১০ জন, চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ২ জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ৬ জন ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছেন আরও ১০ জন।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৯৬ জনে। এরমধ্যে সরকারি হাসপাতালে ৪১৬ জন এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ২ হাজার ৩৮০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এ সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২ হাজার ৫৬৯ জন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ২২৭ জন। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১০ জনের।

মাসভিত্তিক হিসাবেও ডেঙ্গুর প্রকোপের তীব্রতা স্পষ্ট। জুলাইয়ে ৫৩৬ জন, আগস্টে ১ হাজার ২০২ জন এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম ১২ দিনেই ৭৬০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। সেপ্টেম্বরেই মৃত্যু হয়েছে পাঁচজনের। ফলে বর্ষা মৌসুমের শেষভাগে এসে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বগতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান  বলেন, বর্তমানে আক্রান্তের হার বেশি এবং রোগী শনাক্তও হচ্ছে বেশি। এরমধ্যে প্রায় প্রতিদিনই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির পর বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার হওয়ায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ছে।

তিনি বলেন, সেপ্টেম্বরের শেষ অথবা অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর এই প্রবণতা থাকতে পারে। মশা নিধনে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে তিন মাসের পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং সিটি করপোরেশনের সঙ্গে মশা নিধনে ক্রাশ প্রোগ্রাম শনিবারের মধ্যে শুরু হবে।

ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসায় ন্যাশনাল গাইডলাইন অনুসরণ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে সিভিল সার্জন বলেন, সব উপজেলায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণও পাঠানো হয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু ওয়ার্ড হিসেবে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পাঁচটি করে শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান আরও বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও চলছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। শনিবার জামিয়াতুল ফালাহ ময়দানেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম হয়েছে। তবে শুধু সরকারি উদ্যোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; এ জন্য সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।


পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status