ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৪ আশ্বিন ১৪৩৩
দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা এখনও ঢাকামুখী কেন?
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Saturday, 19 September, 2026, 10:42 AM

দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা এখনও ঢাকামুখী কেন?

দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা এখনও ঢাকামুখী কেন?

বাবার কিডনি রোগের চিকিৎসায় মাদারীপুরের শিবচর থেকে বারবার ঢাকায় ছুটতে হচ্ছে মেহেদী হাসান সাকিবকে। উপজেলা হাসপাতালে কিডনির চিকিৎসা নেই, নেই নেফ্রোলজিস্ট, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতিও নেই। ফলে বাবার চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসা ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ নেই।

পাবনায় ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে একের পর এক ডাক্তার দেখিয়েছেন মোহাম্মদ মাহতাব। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও পরে শরীরে র‍্যাশ দেখা দেওয়ার পরও সন্তানের অবস্থার উন্নতি হয়নি। শেষ পর্যন্ত ঢাকার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসতে হয়েছে তাকে। এখন ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালের বারান্দায় দিন কাটছে তার। আট দিন ধরে সন্তান আইসিইউতে।

ভোলার মোহাম্মদ মিজানের গল্পটাও আলাদা নয়। দুর্ঘটনার পর ভোলা সদর হাসপাতাল থেকে তাকে ঢাকায় জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) পাঠানো হয়। অপারেশনের পরও চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে ঢাকায় আসতে হয়েছে তাকে।

মেহেদী, মাহতাব কিংবা মিজান; রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রোগীদের অভিজ্ঞতায় ভিন্নতা থাকলেও সংকটের জায়গাটি প্রায় একই। নিজ এলাকায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কিংবা সরঞ্জাম না থাকায় শেষ ভরসা হয়ে উঠছে ঢাকা।

এর ফলে একদিকে রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ, অন্যদিকে চিকিৎসা নিতে এসে বাড়তি অর্থ, সময় ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রাজধানীর বাইরে থেকে আসা মানুষেরা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা কার্যকর না করে শুধু ঢাকার টারশিয়ারি হাসপাতাল শক্তিশালী করলে এই ঢাকামুখী প্রবণতা বন্ধ হবে না।

নিজের এলাকায় চিকিৎসা নেই

মিরপুর ২ নম্বরের কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে বাবাকে নিয়ে চিকিৎসা নিতে মাদারীপুরের শিবচর থেকে এসেছেন মেহেদী হাসান সাকিব। তার বাবা প্রায় এক বছর ধরে সিকেডি (ক্রনিক কিডনি ডিজিজ) রোগে ভুগছেন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না থাকায় রোগ ধরা পড়ার পর থেকেই তাদের ঢাকায় দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়।

মেহেদী হাসান সাকিব বলেন, ‘আমাদের বাড়ি মাদারীপুরের শিবচরে। শিবচরে উপজেলা ভিত্তিক যে হাসপাতাল আছে, সেখানে কিডনির কোনো ট্রিটমেন্ট নেই। সিকেডি (ক্রনিক কিডনি ডিজিজ) রোগীরও কোনো চিকিৎসা নেই। সর্বোচ্চ ক্রিয়েটিনিন টেস্ট করা যেতে পারে। কিন্তু ভালো কোনো ডাক্তার সেখানে নেই, নেফ্রোলজিস্ট নেই যিনি রোগীকে দেখবেন ও চিকিৎসা দেবেন। একারণেই আমাদের ঢাকায় আসতে হয়, এছাড়া কোনো উপায় নেই।’

তিনি বলেন, ‘সেখানে কিডনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও সেভাবে পাওয়া যায় না। কারণ কিডনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক গেলেও কিডনির যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়, সেগুলোর জন্য যন্ত্রপাতি কিনতে হয়। সেগুলোও সেখানে নেই। সেখানে সেভাবে প্রয়োজনীয় ইনভেস্টিগেশন করার মতো ব্যবস্থাও নেই। আমার বাবা ৯-১০ মাস ধরে কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে যতবার চিকিৎসা করিয়েছি, ঢাকায় এসেই করতে হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকায় যারা চেম্বার করেন, তাদের কাছেও গিয়েছি। বিভিন্ন জায়গায় ডাক্তার দেখানো হয়েছে।’

দেশের চিকিৎসা সুবিধা শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক না করার প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে সাকিব বলেন, ‘চিকিৎসা শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক না হয়ে সব জায়গায় থাকা উচিত। কারণ গ্রামেতো চিকিৎসা নেই বললেই চলে। শুধু কিডনি নয়, এটা মেজর একটি ডিজিজ। কিন্তু নরমাল যেসব রোগ আছে, সেগুলোর চিকিৎসাও গ্রামে হয় না। যেকোনো বিষয়েই আমাদের ঢাকায় আসতে হয়। উপজেলায় যেসব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আছে, সেখানেও ভালোভাবে ডাক্তার পাওয়া যায় না, সেভাবে চিকিৎসাও পাওয়া যায় না।’

পাবনা থেকে ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিতে এসেছেন মোহাম্মদ মাহতাব। তার ছেলে ১০ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি, আট দিন ধরে আইসিইউতে।

প্রথমে নিউমোনিয়ার চিকিৎসার জন্য পাবনা মেডিক্যালে ভর্তি করা হয় শিশুটিকে। পরে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। ডায়রিয়া ঠিক হওয়ার পর দুই দিন বাড়িতে থাকার পর আবার শরীরে লাল লাল র‍্যাশ উঠতে শুরু করে। এরপর পাবনার একটি প্রাইভেট মেডিক্যালে চিকিৎসা নেন তারা। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে সন্তানের অবস্থা আরও খারাপ হলে ঢাকায় চলে আসেন।

মোহাম্মদ মাহতাব বলেন, ‘আমার ছেলে ১০ দিন ধরে এই হাসপাতালে ভর্তি। প্রথমে পাবনায় ডাক্তার দেখিয়েছি, পাবনা মেডিক্যালে। নিউমোনিয়ার জন্য সেখানে ভর্তি ছিল। পরে আবার ডায়রিয়াও হয়েছিল। ডায়রিয়া ঠিক হয়ে যাওয়ার পর বাড়িতে নিয়ে যাই। দুই দিন বাড়িতে ছিলাম। এরপর আবার শরীরে লাল লাল গোটা (র‍্যাশ) উঠতে শুরু করে। তখন পাবনার একটি প্রাইভেট মেডিক্যালে নিয়ে যাই। পাবনাতেই দুই-তিনজন ডাক্তার দেখিয়েছি। তারা বলেছেন, ঠিক হয়ে যাবে। আমরা বলেছি যে, এখন হামের প্রাদুর্ভাব চলছে। কিন্তু তারা নিশ্চিতভাবে হাম বলেনি। ওষুধ লিখে দিয়েছেন। সে ওষুধ এনে দেওয়ার পর সমস্যা বেশি হয়েছে। ছয় দিন ধরে প্রতিদিন ডাক্তার দেখাতে হয়েছে। ছয় দিনে তিনজন ডাক্তার দেখিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেদিন ঢাকায় নিয়ে আসি, তার আগের দিন সন্ধ্যায় এবং পরদিন সকালে ৮টার সময় পাবনা মেডিক্যালে নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছি। সেখানে দেখে ডাক্তার বলেছেন, হাম নেই। তিনি ওষুধ দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ওই ওষুধগুলো এনে দেওয়ার পরই ছেলের অবস্থা একেবারে খারাপ হয়ে যায়। এরপর আমি বুঝতে পারলাম, ঢাকায় যেতে হবে। সরাসরি এখানে (শিশু হাসপাতালে) এসেছি। এখন বাচ্চা আট দিন ধরে আইসিইউতে আছে।’

ঢাকায় এসে তাদের কী পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে হচ্ছে, তা জানিয়ে মাহতাব বলেন, ‘আমরা তিনজন এসেছি—একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা। আসার পর থেকে আমরা হাসপাতালের এই বারান্দাতেই থাকি। ঢাকায় থাকার মতো আর কোনো জায়গা নেই। সবসময় ওষুধ আনতে হয়, একজনকে হাসপাতালে থাকতে হয়। প্রতিনিয়ত ওষুধ আনতে হচ্ছে। আমি যদি পাবনায় চিকিৎসাটা পেতাম, তাহলে ঢাকায় এসে এভাবে থাকতে হতো না। এখানে আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। থাকার জায়গা নেই, বসার জায়গা নেই। আর হাম হয়েছে সেটা যদি ধরে ফেলত তারা আমাদের পাবনায় কি হামের ডাক্তার নেই? আমরা তো সদরে ভর্তি ছিলাম। আর পাবনা মেডিক্যালতো বড় হাসপাতাল ওখানের।’

এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে

গত বছরের ১৯ নভেম্বর ভোলায় বাইকের দুর্ঘটনায় আহত হন মোহাম্মদ মিজান। প্রথমে ভোলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখান থেকে তাকে ঢাকায় জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। এরপর থেকেই প্রতি মাসে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে হচ্ছে তাকে। অপারেশনের পর টানা দেড় মাস ঢাকায় ছিলেন। এরপর অপারেশনের ড্রেসিং করাতে নিয়মিত আসতে হয়েছে।

মোহাম্মদ মিজান বলেন, ‘গত বছরের নভেম্বরের দুর্ঘটনার পর থেকে প্রতি মাসে এখানে আসা হয়। এই জায়গাতেই (নিটোর) অপারেশন হয়েছিল। একটানা দেড় মাস ছিলাম। এরপর অপারেশনের ড্রেসিং করাতে আসতে হয়েছে। প্রায় নয় মাস পায়ে রিং বসানো ছিল। আল্লাহর রহমতে এখন অনেকটা ভালো আছি। জোড়া লেগেছে, আজকে রিং খুলে দিয়েছে।’

ভোলায় চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর প্রথমে ভোলা সদর হাসপাতালে গিয়েছিলাম। পরে সেখান থেকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়েছে। সেখানে সাধারণ যে চিকিৎসা, সেটা দেওয়ার পর পাঠিয়ে দিয়েছে। তারা বলেছিল, ইমার্জেন্সিতে পঙ্গু হাসপাতালে (নিটোর) নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাতে, এখানে হবে না।’

চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে নিজের মতামত জানিয়ে মিজান বলেন, ‘ভোলাতে একটি মেডিক্যাল কলেজ হওয়া উচিত। এ জন্য অনেকেই আবেদন করছেন, মেডিক্যাল কলেজের জন্য আন্দোলন করছেন। সেখানে চিকিৎসাব্যবস্থা ভালো থাকতে হবে এবং সব ধরনের সরঞ্জাম থাকার ব্যবস্থা থাকতে হবে। তাহলে আমাদের কিছু হলেই ঢাকায় আসতে হবে না।’

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) রোগীদের ভিড়। ছবি: বাংলা ট্রিবিউনজাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) রোগীদের ভিড়। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

একইভাবে এলাকার চিকিৎসার ওপর ভরসা করতে না পেরে সহকর্মীকে নিয়ে গাজীপুরের ভোগরা বাইপাস এলাকা থেকে ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে এসেছেন মো. বাবুল। একটি পোশাক তৈরির কারখানায় কাজ করেন তারা। সেখানে এক দুর্ঘটনায় তার সহকর্মী পায়ে আঘাত পেলে চলে আসেন এই হাসপাতালে।

বাবুল বলেন, ‘সেখানে ডাক্তার দেখাইনি। এখানে নিয়ে এসেছেন। সত্যি বলতে সেখানে চিকিৎসা নিয়ে ভরসা পাইনি বলেই এখানে নিয়ে এসেছি।’

ঢাকাতেই কেন কেন্দ্রীভূত চিকিৎসা?

সারা দেশের রোগীরা কেন ঢাকামুখী হচ্ছেন জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সবকিছু—সেটি রাজনৈতিক হোক, প্রশাসনিক হোক, শিক্ষা সংক্রান্ত হোক বা চিকিৎসা সংক্রান্ত—সবই ঢাকা কেন্দ্রিক। বলা হয়ে থাকে, পুরো বাংলাদেশটা ঢাকার পেটে ঢুকে গেছে। চিকিৎসার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার।’

তার মতে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ এবং উচ্চতর পড়াশোনার জায়গা; চিকিৎসা ক্ষেত্রে সবকিছুই ঢাকায় অবস্থিত। মেডিক্যাল কলেজ, মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা চিকিৎসা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়গুলোও মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। এ কারণে সারা দেশ থেকে মানুষ চিকিৎসার জন্য ঢাকার দিকে ছুটে আসে।

চিকিৎসাসেবায় পূর্ণাঙ্গ টিম না থাকার কথাও বলেন ডা. লেলিন। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসাসেবা হচ্ছে একটি টিমওয়ার্ক বা দলগত কাজ। যেমন একজন চিকিৎসক বা ডাক্তারের বিপরীতে তিনজন নার্স থাকবে এবং পাঁচজন সহযোগী কর্মী; টেকনিশিয়ান, টেকনোলজিস্ট ইত্যাদি থাকবে। অর্থাৎ চিকিৎসার প্রথম দলটি হবে মোট নয় জনের। কিন্তু বাংলাদেশের চিকিৎসা প্রধানত ডাক্তারকেন্দ্রিক, ডাক্তারনির্ভর হয়ে গেছে।’

‘এর ফলে হাসপাতাল বা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে বাথরুম কেন নোংরা, ওষুধ কেন নেই, কেন দোতলায় প্যাথলজির পরীক্ষা দিয়ে তিনতলা থেকে রিপোর্ট নিতে হয়; এসবের দায়ও চিকিৎসকের ওপর বর্তায়। এই যে চিকিৎসকের ওপর দায় বর্তায়, এটি চিকিৎসককে চাপগ্রস্ত করে’, যোগ করেন তিনি।

কেন চিকিৎসকরা রোগীদের ঢাকায় রেফার করেন, তা উল্লেখ করে এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ যেহেতু বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিকতা গড়ে ওঠেনি, এ কারণে রোগীর যেকোনও নেতিবাচক প্রভাব, সেটি মৃত্যু হোক বা অসুস্থতা বেড়ে যাওয়া হোক; এসবের দায় ডাক্তারের ওপর চাপায়। আর যত ছোট জায়গা, ডাক্তারকে তত বেশি লক্ষ্যবস্তু করা হয়। তার ওপর নানা ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগ, এমনকি শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনও করা হয়। ফলে একটি অংশের দায়ভার এড়ানোর জন্য চিকিৎসকরা রোগীকে ঢাকার দিকে রেফার করেন।’

ডেঙ্গু রোগী (ছবি ফোকাস বাংলা)ডেঙ্গু ও হাম চাপ বাড়িয়েছে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে

তিনি আরও বলেন, ‘এছাড়া বাংলাদেশের অধিকাংশ জায়গায় চিকিৎসক সরকারি বা বেসরকারিভাবে রয়েছেন। কিন্তু পূর্ণ চিকিৎসা দেওয়ার জন্য যে আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো প্রয়োজন, তার উপকরণ বা আয়োজন নেই। ফলে এ কারণেও রোগীদের ঢাকায় আসতে হয়। সব মিলিয়ে আমরা বলবো, ঢাকাই বাংলাদেশের চিকিৎসার কেন্দ্রবিন্দু। এজন্য যত আয়োজন, সেটি ডাক্তার হোক, জনবল হোক, প্রশিক্ষণ হোক বা যন্ত্রপাতি হোক; সবকিছু ঢাকায় করা হয়েছে। এজন্য লোকজন ঢাকার দিকে আসে।’

ঢাকাকেন্দ্রিক চিকিৎসা কমিয়ে আনতে করণীয় প্রসঙ্গে ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘এখন আমাদের কাজ হচ্ছে ঢাকার পেট থেকে বাংলাদেশটাকে বের করে আনা। এজন্য অন্যান্য সেবার মতো চিকিৎসাসেবাকেও বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে উপজেলাভিত্তিক এবং জেলাভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা প্রণয়ন করা এবং বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে এটি ঘটতেই থাকবে।’

উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কমপ্লেক্সে রোগীরা কেন সন্তুষ্ট হচ্ছেন না, এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এর কারণ হচ্ছে, একজন ডাক্তারের বিপরীতে তিনজন নার্স এবং পাঁচজন টেকনোলজিস্ট-টেকনিশিয়ান থাকবে; সেটি বাংলাদেশের কোনও উপজেলা স্বাস্থ্য প্রকল্প বা জেলা পর্যায়ে নেই।’

দেশের জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যাও অপ্রতুল বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘এখন বাংলাদেশে সব মিলিয়ে স্বাধীনতার পর থেকে না, একদম পাকিস্তানের মধ্যে এখন পর্যন্ত দেড় লাখের মতো চিকিৎসক বাংলাদেশে বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন নিয়েছেন। তার মধ্যে একটি অংশ মৃত্যুবরণ করেছেন, একটি অংশ অবসরপ্রাপ্ত, একটি অংশ দেশের বাইরে। সব মিলিয়ে রোগী দেখেন এমন চিকিৎসকের সংখ্যা বাংলাদেশে কমবেশি ৯০ হাজার বা তারও কম। ফলে এই ৯০ হাজার ডাক্তার দিয়ে ১৮ কোটি মানুষের দেশের সমস্ত মানুষকে চিকিৎসা দেওয়ার আয়োজন সম্ভব নয়।’

ডা. লেলিন আরও বলেন, ‘এটা সম্ভব জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে হতো, যদি স্বাধীনতার পর থেকে পূর্ণাঙ্গ একটি স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হতো এবং সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ডাক্তার, নার্স ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়ানো হতো এবং উপজেলা ও জেলা ভিত্তিক চিকিৎসাকে পূর্ণতা দেওয়া হতো। কিন্তু এখন তো তার বিন্দুমাত্র আয়োজনও কোথাও নেই। ফলে যারা চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন, তারাও যেমন আশাহত হন, অন্যদিকে যারা চিকিৎসাসেবা দেন, তারাও অসুবিধার সঙ্গে চিকিৎসাসেবা দেন। ফলে কী দাঁড়ায়, এগুলোতে রোগী নিশ্চিতভাবেই সন্তুষ্ট বা তৃপ্ত হন না। এ কারণেই তারা ঢাকামুখী হন।’

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা খুবই অবহেলিত। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যদি আমরা রোগীদের যথেষ্ট পরিমাণে সেবা দিতে পারতাম এবং তার সঙ্গে সংযুক্ত রেখে সেকেন্ডারি স্বাস্থ্য চিকিৎসা, যেমন উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স, জেলা হেলথ কমপ্লেক্স; সেখানে ব্যবস্থা করতে পারতাম, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো।’

তিনি বলেন, অবহেলার কারণে মানুষও এগুলোকে হাসপাতাল মনে করে না। মানুষ সোজা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ আর ঢাকার বড় বড় হাসপাতালকে চিকিৎসা কেন্দ্র মনে করে। সরকারও তাই মনে করে।

‘কোনও একটা স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে আমাদের কর্তাব্যক্তিদের আপনাদের প্রস্তুতি কেমন আছে প্রশ্ন করলে তারা বলবে, আমরা ডাক্তারদের ছুটি বাতিল করেছি, আমাদের যন্ত্রপাতি আরও বিদেশ থেকে নিয়ে আসছি, অভাব হবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি। মানে আমাদের যারা হাইয়াস, তারাও মনে করেন যে টারশিয়ারি লেভেলের হাসপাতালটাকে ঠিক রাখতে পারলে সব ঠিক।’

তার ভাষ্য, মানুষ মনে করে ডাক্তারের সবচেয়ে লম্বা ডিগ্রি যার, তিনি সর্দি থেকে শুরু করে ব্রেন অপারেশন—সব করবেন। প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি লেভেলের চিকিৎসকদের তারা মনে করে না যে তারা তাদের সমস্যা দূর করবেন। আর স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ও সরকারও মনে করে, প্রাথমিক পর্যায়ে দুই-চারটা প্যারাসিটামল ট্যাবলেট দিলেই হলো।

এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আর যে ফিল্ডওয়ার্কার, যে স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অসংখ্য রোগ প্রতিরোধের কাজ করে, স্বাস্থ্য উন্নয়নের কাজ করে.ওষুধের চিকিৎসা ছাড়া আমাদের কর্তাব্যক্তি এবং মানুষ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আর কিছু মনে করে না।’

ট্যাবলেট বা অপারেশনের জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে স্বাস্থ্যকে দেখতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কাজেই প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা, স্বাস্থ্য উন্নয়নমূলক চিকিৎসা, তারপরে ইন্টারভেনশন চিকিৎসা। যখন ওষুধ বা অপারেশন, তারপরে পুনর্বাসনমূলক, তারপরে হচ্ছে উপশমমূলক স্বাস্থ্য; এগুলোকে যদি সরকার গুরুত্ব দেয় এবং মানুষকে এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেকমিউনিটি ক্লিনিকের জন্য কিছুটা উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি হয়েছিল তাহলে ভালো।’

তিনি বলেন, ‘মানুষকে এভাবে জানাতে হবে কোথায় কী, কোথায় অভিযোগ করা যায়। তাহলে আমাদের ওই সব জায়গা থেকে ৯০ শতাংশ রোগী ভালো হয়ে যাবে, ১০ শতাংশ রোগী আসবে বড় বড় হাসপাতালে। এই পলিসি, পাল্টানোর দৃষ্টিভঙ্গি যদি আমরা না করি, তাহলে সমস্যার সমাধান নেই।’

বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ না থেকে সরকারকে কাজে দেখাতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের বর্তমান যারা নির্বাচনে ক্ষমতায় এসেছেন, নির্বাচনে জয়লাভ করে তাদের ম্যানিফেস্টোতে খুব সুন্দরভাবে এসব কথাগুলো লেখা আছে। কিন্তু বাস্তবে আমার চোখে পড়ছে না। এই পরিবর্তনের লক্ষ্যে প্রতিমন্ত্রী এবং উপদেষ্টা মহোদয় ছাড়া আমি আর কোনও পরিবর্তন দেখছি না। তারা বক্তৃতায় এ কথা বলেন। আমি যে কথাগুলো বলছি। কিন্তু উনাদের তো করতে হবে, জিনিসটা করে দেখাতে হবে। বাস্তবায়িত কোনও কিছু না করে বলতে থাকলে খুব একটা পরিবর্তন হবে না।’

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘ভ্যাকসিন, ডায়াগনস্টিক, অ্যান্ড থেরাপিউটিক্স, মানে ইন্টারভেনশন, ওষুধ বা অপারেশন; এই তিনটা জিনিসই আপনার প্রাথমিক লেভেলে অ্যাভেইলেবল থাকতে হবে। কিন্তু আমাদের শুধুমাত্র ভ্যাকসিনটাই অ্যাভেইলেবল, ইউনিভার্সাল ডায়াগনস্টিকও না।’

তিনি বলেন, হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে মানুষের যত রকম স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া যায়, সেটা বাড়ির কাছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দিতে হবে। হাসপাতালে যাবে একদম ক্রিটিক্যাল ফেজে, যখন আইসিইউ লাগবে, জটিল অপারেশন, ব্রেন সার্জারি, হার্ট সার্জারি—সেগুলোর জন্য স্পেশালাইজড হাসপাতাল, টারশিয়ারি লেভেল হাসপাতাল লাগবে। ‘এই ফিলোসফিটা যদি আমরা বর্তমান সরকার বিলিভ করে, আর কিছু লাগবে না।’

সরকারের পরিকল্পনা

এদিকে গত ১৫ আগস্ট রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে ৫০০ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধন শেষে বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমি মনে করি স্বাস্থ্য সেবা সহজলভ্য এবং সবার জন্য সমানভাবে প্রাপ্য হওয়া অত্যন্ত জরুরি। উন্নত চিকিৎসা যদি শহরের বিত্তবান মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তাহলে সেটিকে পূর্ণাঙ্গ আধুনিক স্বাস্থ্য সেবা বলা যাবে না। সুতরাং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং প্রান্তিক মানুষের কাছে সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।’

চিকিৎসা সুবিধা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন রোগী যাতে যেকোন চিকিৎসার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করে রাজধানীতে আসতে না হয় এজন্য সরকার ইহেলথ কার্ডের মাধ্যমে একটি আধুনিক ও কার্যকর রেফারেন্স সিস্টেম গড়ে তোলার পাশাপাশি চিকিৎসা সুবিধা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করছে।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে এযাবতকালে সর্বোচ্চ বেশি বরাদ্দ দিয়ে বর্তমান সরকার প্রমাণ করেছে সরকার সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়তে চায়। এটি স্রেফ একটি স্লোগান নয় বরং সরকার দেশে একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়। যাতে করে মানুষ দেশের ভেতরে সকল রকমের স্বাস্থ্য সেবা পায়।’

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status