প্রকাশ: Thursday, 24 September, 2026, 10:59 AM সর্বশেষ আপডেট: Thursday, 24 September, 2026, 11:06 AM
আসলে কোন কারণে হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন তারা?
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার যে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি কেন ঘটেছে সে রহস্য এখনও উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার তিন মাস পার হতে চললেও এখনও জানা যায়নি প্রকৃত কারণ। এখনও পুলিশ বলছে, তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলে ঘটনার প্রকৃত কারণ জানানো হবে।
পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ কিংবা প্রকৃত রহস্য এখনও উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। এর প্রধান কারণ সন্দেহভাজন প্রধান অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। আবার তার ব্যবহার করা পরিচয়পত্র ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় তদন্তে সময় লাগছে। অন্তর মজুমদার আগে ওই ভবনের আশপাশে ভাড়া থাকতেন এবং তার একটি ভুয়া পরিচয়পত্রের তথ্য পুলিশের কাছে এসেছে। কেন পরিচয় লুকিয়ে ছিলেন, তারও তদন্ত চলছে। অন্তর একা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন নাকি তার পেছনে অন্য কেউ আছে, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তবে অভিযুক্ত ব্যক্তির মাদকাসক্তি, নিহতদের সঙ্গে তার পূর্বপরিচয়, স্বর্ণালংকার লুট, অর্থ লেনদেন ও পূর্ববিরোধ—এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য কারণ হিসেবে এগুলোই সামনে রেখে তদন্ত করছে পুলিশ। তবে কোনও একটি কারণের পক্ষে নিশ্চিত প্রমাণ পায়নি তারা। ফলে হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।
একাধিক বিষয় গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ অনুসন্ধানে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের বক্তব্যসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করছে পুলিশ। সিআইডি ছায়া তদন্ত করলেও বর্তমানে আর তা করছে না।
তদন্তে এখনও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। হত্যার সময় বাসার ভেতরে ঠিক কী ঘটেছিল, অভিযুক্ত ব্যক্তির লক্ষ্য একজন ছিলেন নাকি পুরো পরিবার, হত্যার আগে কোনও বাগবিতণ্ডা হয়েছিল কিনা কিংবা পূর্বপরিচয় থাকা সত্ত্বেও কেন এমন ভয়াবহ হামলা চালানো হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার রহস্য কী, যা বললেন প্রতিবেশীরামা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার রহস্য কী, যা বললেন প্রতিবেশীরা
রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এই নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো রায়পুরবাসীকে শোকাহত ও আতঙ্কিত করেছে। মানুষ জানতে চায়, কী কারণে এমন ঘটনা ঘটলো।’
স্বর্ণালংকার লুটের সন্দেহ
নিহতদের পরিবারে বেঁচে থাকা একমাত্র সন্তান সিফাতের দাবি, তার মায়ের কাছে কিছু স্বর্ণালংকার ছিল। সেগুলো লুট করার উদ্দেশ্যেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটতে পারে বলে তার সন্দেহ। তবে এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত ছিল কিনা, সেটিও তদন্ত করে বের করার দাবি জানান তিনি।
সম্প্রতি এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে একটি টেলিভিশনের অনুসন্ধানী দল বাড়িওয়ালার ছেলের সম্পৃক্ততার কথা বললেও পুলিশ এ বিষয়ে কিছু বলেনি। এ বিষয়ে কোনও খবর পাননি বলেও জানান সিফাত।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর) আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া বলেছিলেন, ‘সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে যা হবে, আমরা তা মেনে নেবো। এর সঙ্গে যদি অন্য কেউ জড়িত থাকে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এ ঘটনাকে পুঁজি করে কোনও ধরনের সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা করা যাবে না।’
এখনও আতঙ্ক কাটেনি
এদিকে, ঘটনার তিন মাস পার হতে চললেও রায়পুরে আতঙ্ক কাটেনি। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি এখনও চায়ের দোকান, বাজার ও অলিগলিতে ঘুরেফিরে আলোচনায় আসছে।
মা ও তিন মেয়েকে হত্যা, অভিযুক্ত সেই ছেলেটির বিষয়ে যা জানা গেলোমা ও তিন মেয়েকে হত্যা, অভিযুক্ত সেই ছেলেটির বিষয়ে যা জানা গেলো
রায়পুর শহরের দেনায়েতপুর এলাকার বাসিন্দা ও শিক্ষার্থী মাহবুব হোসেন জানান, ঘটনার খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। ঘরের ভেতরে মা ও তিন মেয়ের রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। সেই দৃশ্য এখনও তার চোখে ভাসে। ঘটনার রাতে তিনি ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি। অথচ ঘটনার রহস্য এখনও উদঘাটন হয়নি। এটি পুলিশের দায়িত্বে অবহেলা ছাড়া আর কিছুই নয়।
ধর্ষণের আলামত মেলেনি
লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা (আরএমও) অরূপ রায় বলেন, প্রাথমিকভাবে ধর্ষণের কোনও আলামত পাওয়া যায়নি। নিহত চার জনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্ত শেষে লাশগুলো পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল।
দুটি হত্যা মামলা
মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ঘটনায় রায়পুর থানায় পৃথক দুটি হত্যা মামলা হয়েছে। নিহত শাহিনুর বেগমের ছেলে জুনায়েদ ইসলাম বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। অন্য মামলাটি চার পুলিশ সদস্য আহত এবং অভিযুক্তকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় করা হয়েছে। এতে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।
নিশ্চিত নয় হত্যার কারণ
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও রায়পুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্বর্ণালংকার চুরি এবং আরও কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি মাদকাসক্ত ছিলেন বলেও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত এখনও শেষ হয়নি আমাদের। তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে হত্যার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু বলা সম্ভব নয়।’
মা ও তিন মেয়েকে হত্যায় অভিযুক্তকে যেভাবে আটকালেন এক নারীমা ও তিন মেয়েকে হত্যায় অভিযুক্তকে যেভাবে আটকালেন এক নারী
এ বিষয়ে রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়াও একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘এখনও তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত জানানো হবে।’
গত ২৫ জুন সকালে রায়পুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোডাউন রোড (দেনায়েতপুর) এলাকার পাঁচতলা ভবনের নিচতলার ভাড়া বাসায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহতরা হলেন মা শাহিনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২০), মেজো মেয়ে নাফিজা আক্তার ইকরা (১৬) ও ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। শাহিনুর বেগমের বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। তারা বেশ কয়েক বছর ধরে রায়পুরের ওই বাসায় ভাড়া থাকতেন। তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন। মেজো মেয়ে নাফিজা আক্তার ইকরা রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমি থেকে এসএসসির ফলপ্রত্যাশী ছিল। একই প্রতিষ্ঠানের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী ছিল ছোট মেয়ে শিফা আক্তার। আর একমাত্র ছেলে জুনায়েদ ইসলাম রায়পুর সরকারি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার পাশাপাশি একটি দোকানে কাজ করছেন। ২৬ জুন মা ও তিন মেয়ের লাশ কুমিল্লার হোমনা উপজেলার লটিয়া গ্রামের সামাজিক কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবরে দাফন করা হয়েছে।
শাহিনুরের স্বামী মো. কামাল হোসেন ২০১৯ সালে উপজেলার মোল্লারহাট এলাকায় রাস্তায় পড়ে থাকা তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। তিনি গ্রামে ঘুরে ঘুরে হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন শাহিনুর। অভিযুক্ত ওই যুবক নোয়াখালীর বাসিন্দা হলেও রায়পুরে ভ্যানে করে ফল বিক্রি করতেন। এক বছর আগে শাহিনুরের ওই ভবনের একটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন। সেখান থেকে তাদের মধ্যে পরিচয় হয়।
মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার রহস্য কী, এক মাসে কী পেলো পুলিশমা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার রহস্য কী, এক মাসে কী পেলো পুলিশ
নিহতদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পিটুনিতে নিহত যুবকের নাম অন্তর মজুমদার। তিনি নোয়াখালীর সুবর্ণচরের কার্তিক মজুমদারের ছেলে এবং পেশায় একজন ফল বিক্রেতা। আগে একই ভবনের পাঁচতলার একটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন এবং ওই পরিবারটির পূর্ব পরিচিত ছিল।
হত্যাকাণ্ডের পর উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে প্রধান অভিযুক্ত যুবক অন্তর মজুমদার (৩০) নিহত হন। তিনি ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতা। অন্তর মজুমদার নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার ছারামন উল্লাহ ইউনিয়নের চরফজলুল করিম গ্রামের সুজিৎ মজুমদারের ছেলে। অন্তর তার এলাকায় কয়েকজন তরুণীর সঙ্গে খারাপ আচরণের কারণে গ্রাম ও পরিবার থেকে বিতাড়িত। তবে তিনি বিবাহিত ছিলেন বলে চাচাতো ভাই টিটু মজুমদার মোবাইলে জানিয়েছেন।