|
ঢাকায় উচ্ছেদ অভিযান: ৬ মাসে ৫ বার হামলার শিকার পুলিশ
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() ঢাকায় উচ্ছেদ অভিযান: ৬ মাসে ৫ বার হামলার শিকার পুলিশ সবশেষ বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযানের সময় উত্তর সিটি করপোরেশনের গাড়িতে আগুন দেওয়ার পর, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করে হকাররা। উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, 'উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে যে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, সেটি পরিকল্পিত। ফ্যাসিবাদের দোসররা এ হামলা চালিয়েছে উল্লেখ করে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, উচ্ছেদ চলমান থাকবে।' কেন বারবার হামলার শিকার হচ্ছে পুলিশ, এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন বলেন, 'বিভিন্ন অভিযানে পুলিশ আইনের মধ্য থেকে দায়িত্ব পালন করে। তবে সুবিধাবাদী কিছু গোষ্ঠী উচ্ছেদের সময় পুলিশের ওপর হামলা করছে। পেশাদারিত্বের সঙ্গে তা মোকাবিলা করছে ডিএমপি।' তবে পুলিশ সূত্র বলছে, ৫ আগস্টের আতঙ্ক থেকেই উচ্ছেদ অভিযানে মারমুখি ভুমিকায় যেতে চাইছে না পুলিশ। বিভিন্ন ঘটনায় অ্যাকশনে যেতে বলা হলেও ভবিষ্যতে মামলা কিংবা আইনি ঝামেলায় জড়ানোর শঙ্কা থেকে শক্ত হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে পুলিশ কখন কঠোর হবে, কখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বলপ্রয়োগ করবে, এ নিয়ে বাহিনীর ভেতরেও সতর্কতা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এদিকে রাজধানীর মিরপুরে হকার উচ্ছেদ অভিযানে সংঘর্ষ এবং কয়েকটি যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বুধবার সচিবালয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'অভিযানে সিটি করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশের সঙ্গে সঠিকভাবে যোগাযোগ করেননি।' এ ঘটনায় সমন্বয়ের অভাব ছিল বলে জানান তিনি। দিনভর যা হলো মিরপুরে বুধবার মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ও পুলিশের উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে হকারদের সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ফুটপাত ও সড়ক অবৈধ দখলমুক্ত করতে এই অভিযান চালানোর সময় হকারদের বাধার মুখে পড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার দিকে মিরপুর-১০ গোলচত্বর থেকে মিরপুর-১৪ পর্যন্ত সড়কে অবৈধ দোকানপাট ও হকার উচ্ছেদে যৌথ অভিযান শুরু হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বরের হোপ মার্কেটের সামনে উচ্ছেদ চলাকালে একটি বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হলে উপস্থিত হকার ও ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও ব্যবসায়ীরা বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে উচ্ছেদ অভিযানের সময় রোলার দিয়ে দোকান ভাঙতে গেলে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। আর এই আগুনে বাইতুল কুদ্দুস জামে মসজিদের নিচে থাকা ৬-৭টি দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়। উত্তেজিত হকাররা সিটি কর্পোরেশন ও পুলিশের ওপর লাঠিসোটা ও ইটপাটকেল নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। হকারদের সংখ্যার কাছে পুলিশ একপর্যায়ে পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল বা কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। হামলাকারীরা সিটি কর্পোরেশনের ৩টি ময়লার গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং একটি এক্সকাভেটর (ভেকু গাড়ি) ও পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান ভাঙচুর করে। এই সহিংসতার ঘটনার ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীরাও হকারদের হামলার শিকার হন এবং একটি বেসরকারি টেলিভিশনের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম উচ্ছেদ অভিযান চলমান থাকার ঘোষণা দেন। যারা বাধা ও গাড়িতে আগুন দিয়েছে তাদের আইনের আওতায় আনার হুশিয়ারি দেন। বেলা আড়াইটার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে আবারও উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। অতিরিক্ত পুলিশ, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ও আনসার সদস্যদের উপস্থিতিতে এই অভিযান পুনরায় শুরু হয়। গত ৬ মাসে আরও হামলার ঘটনা এর আগে চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত উচ্ছেদের ঘটনায় পুলিশকে হুমকি ও হামলার কয়েকটি ঘটনা দেখা গেছে। গত ৭ মার্চ যাত্রাবাড়ীতে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযানে দুই ব্যক্তি দায়িত্ব পালনরত পুলিশকে আপত্তিকর মন্তব্য ও হুমকি দেন। পুলিশ দুজনকে আটক করে আদালতে হাজির করলে বিশেষ মহানগর হাকিম আদালত দুজনকেই ৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। গত ২০ মে রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীর বাউনিয়াবাঁধ এলাকায় সরকারি জমি উদ্ধার করতে গিয়ে স্থানীয়দের হামলার মুখে পড়েন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সদস্যরা। এ ঘটনায় অন্তত সাতজন পুলিশ সদস্য আহত হন। হামলার সময় পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়া হয় এবং ধাওয়া দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পিছু হটে দৌড়াতে দেখা যায়। এ সময় পুলিশের জন্য রিকুইজিশন করা ৪টি বাসের কাচ ভাঙচুর করা হয়। গত জুনের ৮ তারিখে পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায় শত বছরের পুরোনো ডিআইটি পুকুরের জায়গায় গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালিয়ে ফেরার পথে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় একটি কাউন্সিলরের কার্যালয় উচ্ছেদ না করেই অভিযান শেষ হওয়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের পর এ হামলার ঘটনা ঘটে। ওইদিন দুপুর দেড়টার দিকে গেন্ডারিয়ার ডিআইটি পুকুরপাড়ে অভিযান শুরু করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শারমিন আরার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে প্রায় ১০০ পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। অভিযান শেষে পুলিশ সদস্যরা ফিরে যাওয়ার সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের একাংশ পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এতে শ্যামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম ও তার দেহরক্ষী কনস্টেবল আহত হন। কনস্টেবলের মাথায় আঘাত লাগে এবং তাকে চিকিৎসা নিতে হয়। মিরপুরের আগে সবশেষ গত ২৬ জুলাই রাজধানীর জুরাইন এলাকায় সড়ক দখলমুক্ত করতে হকার উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে হামলার মুখে পড়ে কদমতলী থানার একটি টিম। অভিযানের সময় হকারদের একাংশ ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশের ওপর চড়াও হয় এবং দায়িত্বরত এক পুলিশ কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে জুতা নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় দুজনকে আটক করে পুলিশ। অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, 'সাম্প্রতিক পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সঙ্গে উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে ঘটনাগুলো মিলিয়ে দেখলে প্রশ্ন ওঠে, মাঠে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশই যখন হামলার শিকার হচ্ছে, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা কতটা কার্যকর আছে?' তিনি বলেন, 'পুলিশের মনোবলে ঘাটতি থাকলে বাহিনীর মধ্যে উৎসাহ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ সরকারের নেওয়া উচিত।'
|
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |
