পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার বর্ণনা বদলাবে, এবার যেভাবে থাকছে
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Wednesday, 14 October, 2026, 4:59 PM
পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার বর্ণনা বদলাবে, এবার যেভাবে থাকছে
আগামী শিক্ষাবর্ষের (২০২৭ সাল) পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসসহ বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আনছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কিত বর্ণনাও।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এ বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি সরকারের সময়ে পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনা দাঁড়াচ্ছে তিন ধরনের।
আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপা হচ্ছে। পরিমার্জন শেষে এখন ছাপার কাজ চলছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছুসংখ্যক বই ছাপাও হয়েছে।
আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা যুক্ত করা হচ্ছে। এ ছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা একটি নিবন্ধও রাখা হচ্ছে পাঠ্যবইয়ে।
বই হাতে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা
২০২৭ সালের সপ্তম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের প্রথম অধ্যায় ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও গণ-আন্দোলন’। এ অধ্যায়ে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। একপর্যায়ে স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধের সূচনা এবং ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের কথা বলা হয়েছে।
স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের সূচনা সম্পর্কে বইটিতে বলা হয়েছে, ‘১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, চালায় হত্যাযজ্ঞ। পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক রাজারবাগ পুলিশ লাইনস আক্রান্ত হলে পুলিশ লাইনস বেইজ হতে আক্রমণের সংবাদ তারবার্তার মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয় ঐ রাতেই। দেশের মানুষ নেতৃত্বশূন্যতায় দিশেহারা ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। এ প্রেক্ষাপটে ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার খবর জেনে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মেজর জিয়াউর রহমান “উই রিভল্ট” বলে চট্টগ্রামে বিদ্রোহ করেন। তারপর রাত ২টা ১৫ (২৬শে মার্চ) মিনিটে ব্যাটালিয়নের সব বাঙালি অফিসার ও সৈনিকদের একত্র করে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দেন। এ ঘোষণার পর আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। চট্টগ্রামের কালুরঘাটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপিত হলে মেজর জিয়াউর রহমান ২৭শে মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও লিবারেশন আর্মির সর্বাধিনায়ক হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তার এই ঘোষণার মাধ্যমে দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর রেডিওর মাধ্যমে তিনি আরেক ঘোষণায় শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশ লিবারেশন আর্মির অস্থায়ী সর্বাধিনায়ক হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিপাগল বাঙালিকে স্বাধীনতার দীপ্তমন্ত্রে উজ্জীবিত করে। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর জনযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাধ্যমে পাকিস্তানিদের ২৪ বছরের শোষণ আর বৈষম্যের অবসান ঘটে। ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।’
ইতিহাসের পাশাপাশি বাংলা এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়েও নতুন বিষয়বস্তু যুক্ত হচ্ছে। চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে দুটি করে মোট চারটি নতুন বই। এর মধ্যে চতুর্থ শ্রেণির দুটি নতুন বই হলো ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’। আর ষষ্ঠ শ্রেণির দুটি বই হলো ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যা ছিল
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে পাঠ্যবই ও শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করে। ওই সরকারের সময়ে প্রণীত সপ্তম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের একই অধ্যায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় অর্জনের বর্ণনা রয়েছে। বইটি চলতি শিক্ষাবর্ষে পড়ানো হচ্ছে।
এ বিষয়ে বইটিতে বলা হয়েছে, ‘১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, চালায় হত্যাযজ্ঞ। পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক রাজারবাগ পুলিশ লাইনস আক্রান্ত হলে পুলিশ লাইনস বেইজ হতে আক্রমণের সংবাদ তার বার্তার মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করা হয় ঐ রাতেই। ২৬শে মার্চ তারিখে মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর তিনি ২৭শে মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর জনযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাধ্যমে পাকিস্তানিদের ২৪ বছরের শোষণ আর বৈষম্যের অবসান ঘটে। ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।’
রাষ্ট্রের ইতিহাসের পরিবর্তন প্রত্যেক সরকারই করে। ভবিষ্যতেও হয়তো করবে। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চার নামে এখানে ইতিহাসের চেয়ে রাজনীতির চর্চাই বেশি হয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার আরেক রকম বর্ণনা ছিল।
এনসিটিবির ওয়েবসাইটে ২০২৩ ও ২০২৪ সালের সপ্তম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইটি নেই। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের ২০২২ সালের পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনা আছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, চালায় হত্যাযজ্ঞ। পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক রাজারবাগ পুলিশ লাইনস আক্রান্ত হলে পুলিশ লাইনস বেইজ হতে আক্রমণের সংবাদ তারবার্তার মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করা হয় ঐ রাতেই। বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের মাধ্যমে পাকিস্তানিদের ২৪ বছরের শোষণ আর বৈষম্যের অবসান ঘটায় বাঙালি। ফলে ৩০ লক্ষ শহিদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।’
স্বাধীনতার ঘোষণাসহ ইতিহাসের কয়েকটি ক্ষেত্রে সরকার বদলালে বর্ণনাও বদলে যায়। ফলে একেক সরকারের সময়ে শিশুরা একেক রকম বর্ণনা পাঠ করে। অবশ্য অনেকের মতে, ইন্টারনেটের যুগে মানুষের কাছে এখন বিপুল তথ্য রয়েছে।
আরও যেসব পরিবর্তন
আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা যুক্ত করা হচ্ছে। এ ছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা একটি নিবন্ধও রাখা হচ্ছে পাঠ্যবইয়ে।
ইতিহাসের পাশাপাশি বাংলা এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়েও নতুন বিষয়বস্তু যুক্ত হচ্ছে। চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে দুটি করে মোট চারটি নতুন বই। এর মধ্যে চতুর্থ শ্রেণির দুটি নতুন বই হলো ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’। আর ষষ্ঠ শ্রেণির দুটি বই হলো ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’।
শিশুরা শেখে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা
স্বাধীনতার ঘোষণাসহ ইতিহাসের কয়েকটি ক্ষেত্রে সরকার বদলালে বর্ণনাও বদলে যায়। ফলে একেক সরকারের সময়ে শিশুরা একেক রকম বর্ণনা পাঠ করে। অবশ্য অনেকের মতে, ইন্টারনেটের যুগে মানুষের কাছে এখন বিপুল তথ্য রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গবেষক আফসান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, রাষ্ট্রের ইতিহাসের পরিবর্তন প্রত্যেক সরকারই করে। ভবিষ্যতেও হয়তো করবে। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চার নামে এখানে ইতিহাসের চেয়ে রাজনীতির চর্চাই বেশি হচ্ছে। আর তা হয় রাজনৈতিক স্বার্থে। সমস্যাটি এখানেই। তবে মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রের ইতিহাসই সব নয়। সমাজের ইতিহাস বা অপ্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসও রয়েছে। অথচ সেই ইতিহাসের চর্চা তেমন গুরুত্ব পায় না; বরং সমাজের ইতিহাস চর্চায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।