নানা ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ জেলা সব সময় আলোচনায় থাকে। এই প্রাণঘাতী করোনা আক্রমণের সময়েও আলোচনায় নারায়ণগঞ্জ। দাবি করা হচ্ছে, নারায়ণগঞ্জ থেকে কভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এভাবে ২০১৪ সালেও সাত খুনের ঘটনায় আলোচনায় এসেছিল নারায়ণগঞ্জ। সাত খুন নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস তো বটেই দেশের ইতিহাসেও ন্যাক্কারজনক ঘটনার একটি। খুনের অভিযোগে প্রমাণসহ মারাত্মক প্রশ্নবিদ্ধ হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এলিট ফোর্স র্যাব। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল অপহরণের পর খুন ও শীতলক্ষ্যায় বস্তায় ভরে লাশ ভাসিয়ে দেওয়া, ৩০ এপ্রিল একে একে লাশ ভেসে ওঠার সেই ঘটনা আজো ভুলতে পারেনি বন্দরনগরীর মানুষ।
ঘটনার পর র্যাবের তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার, প্রধান আসামি নূর হোসেনকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা, আদালতের রায়প্রদানসহ টান টান উত্তেজনায় পার হয়ে গেছে ৬ বছর। ছয় বছরেও রায় কার্যকর হয়নি খুনিদের। তাই প্রিয়জন হারানোর বেদনায় আজো ভারাক্রান্ত স্বজনদের হৃদয়। তারা দ্রুত রায় কার্যকর দেখতে চায়।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন কালের কণ্ঠকে জানান, আলোচিত সাত খুন মামলায় ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, র্যাব ১১-এর চাকরিচ্যুত সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার এম মাসুদ রানাসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদানের আদেশ দেন। পরে উচ্চ আদালতে ২০১৮ সালে ২২ আগস্ট ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বহাল রেখে বাকি আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা বহাল রাখা হয়। বর্তমানে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রয়েছে। যেহেতু ৩৫ জন আসামির সবাই আলাদা আলাদাভাবে আপিল করেছেন। তাই আপিল শুনানি শেষ করতে সময় লাগছে। তিনি বলেন, আমরা আশা করব আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা বহাল থাকবে।
তবে দেড় বছর ধরে মামলাটি আপিল বিভাগে থাকায় নিহতের স্বজনরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। নিহতদের পরিবারসহ নারায়ণগঞ্জবাসী সাত খুন মামলার রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানান।
সাত খুনে নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি কালের কণ্ঠকে বলেন, আমার প্রত্যাশা দ্রুত রায় কার্যকর হবে। করোনার এই সংকটকালে আমরা ভালো নেই। তবে ভালো থাকব যদি রায় কার্যকর হয়। নিহত মনিরুজ্জামান স্বপনের ভাই রিপন কালের কণ্ঠকে বলেন, এখনও রায় কার্যকর না হওয়ায় আমাদের ভুক্তভোগী পরিবারের মধ্যে শঙ্কা কাজ করে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি দ্রুত এ রায় কার্যকর করা হোক। এ রায়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক যে আর যেন কোনো নূর হোসেনের সৃষ্টি না হয়। জাহাঙ্গীরের স্ত্রী নুপুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ৬ বছর পেরিয়ে গেল অথচ স্বামী হত্যার রায় দেখতে পারলাম না। আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি সেটারও খোঁজ কেউ নেয় না।
তাজুল ইসলামের বাবা আবুল খায়ের কালের কণ্ঠকে বলেন, যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তারা নরপশুর চেয়ে খারাপ। দেশের কাছে, প্রশাসনের কাছে ও বিচার বিভাগের কাছে দাবি থাকবে খুব দ্রুত রায় কার্যকর করা হোক। মৃত্যুর আগে সন্তান হত্যার বিষয়টি আমি কখনো ভুলতে পারব না। আমার সন্তান হারানোর বেদনা আমিই বুঝি।
ছয় বছর পূর্বে ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনা ঘটেছিল। ওই দিন নারায়ণগঞ্জ আদালতে মামলায় হাজিরা দিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জের বাড়িতে ফেরার পথে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ফতুল্লার লামাপাড়া এলাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও সিনিয়র আইনজীবী চন্দন সরকার, চন্দন সরকারের গাড়িচালক ইব্রাহিম, যুবলীগ নেতা মনিরুজ্জামান স্বপন, স্বপনের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর, নজরুলের সহযোগী তাজুল ইসলাম ও বন্ধু সিরাজুল ইসলাম লিটনকে অপহরণ করা হয়। অপহরণের তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল নজরুলসহ ছয়জন ও ১ মে লিটনের লাশ শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ও নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন।