অচেনা প্রাণীর আক্রমণে এক জনের মৃত্যু, আতঙ্কে ৬ গ্রামের মানুষ
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার হরিনাথপুর ইউনিয়নের তালুক কেঁওয়াবাড়ী গ্রামের বাসিন্দাদের চোখে-মুখে এখন আতঙ্কের ছাপ। গ্রামের ছোট-বড় সবাই চলাফেরা করছেন লাঠি নিয়ে। আতঙ্কে অনেক অভিভাবক সন্তানের বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।
আতঙ্কে অনেক অভিভাবকই সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া-আসা করছেন। শুধু যে এ গ্রামেই এই অবস্থা তা নয়, আতঙ্ক ছড়িয়েছে পড়েছে আশপাশের আরও ছয় গ্রামে। গ্রামবাসীকে রক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
গ্রামবাসী জানান, প্রায় এক মাস আগে এক অচেনা-অজানা প্রাণীর আক্রমণে একজনের মৃত্যু হয়। এ পর্যন্ত আহত হয়েছেন অন্তত নয়জন। এমনকি এই প্রাণীর আক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি কুকুরও। আক্রমণের শিকার হয়ে দুটি কুকুরেরও মৃত্যু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে হরিনাথপুর ইউনিয়নে গিয়ে জানা যায়, ঘটনার শুরুটা হয় ২৯ সেপ্টেম্বর। এ দিন হরিনাথপুর গ্রামের ৫৫ বছর বয়সী ফেরদৌস রহমান রুকু নামের এক বৃদ্ধ দুপুরে অচেনা ওই প্রাণীটির আক্রমণের শিকার হন। এর কিছু সময় পরই প্রাণীটির আক্রমণের শিকার হন প্রতিবেশী আমরুল ইসলাম (৩১) ও সুমি বেগমও (৪০)। একইদিন কেঁওয়াবাড়ী গ্রামের আফছার আলী (৩৫) ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া গ্রামের হামিদ মিয়াও (৪০) আক্রান্ত হন প্রাণীটি দ্বারা। ইতোমধ্যে সদরের হরিণাবাড়ী, পলাশবাড়ী উপজেলার তালুকজামিরা, দেওয়ানের বাজার, তালুক কেঁওয়াবাড়ী, কুমেদপুর, মরা দাতেয়া গ্রামে প্রাণীটিকে দেখা গেছে।
গত রবিবার (২৪ অক্টোবর) আক্রমণের শিকার হয় তালুক কেঁওয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র মো. রাব্বী শেখ (১২)। এর পরদিন সোমবার সন্ধ্যায় হরিনাথপুর গ্রামের মনজিলা বেগমকে (৫০) আক্রমণ করে প্রাণীটি। স্থানীয়দের কেউ এটিকে বলছেন শিয়াল, আবার কেউ বা বলছেন হায়েনা। যারা এই প্রাণীটিকে দেখেছেন তারা বলছেন, প্রাণীটি দেখতে কুকুর বা শিয়ালের মতো। মোটা ধরনের প্রাণীটির গায়ের রং লাল, সাদা ও ধূসর। লম্বা লেজ। মুখটাও লম্বাটে। এর মধ্যে ফেরদৌস রহমান রুকু মারা যান গত ১৮ অক্টোবর।
ফেরদৌস রহমান রুকুর ভাই সাইফুল ইসলাম টিপু বলেন, বাড়ির পাশে বাঁশঝাড়ে ঘাস কাটতে গেলে আক্রমণের শিকার হন তিনি। তার নাক ও পশ্চাৎদেশের মাংস ছিঁড়ে ফেলে প্রাণীটি। এরপর তাকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে সেলাই শেষে জলাতঙ্ক ও টিটেনাস টিকা দিয়ে ভর্তি না করিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে আরও দুইদিন গিয়ে জলাতঙ্কের আরও দুই ডোজ টিকা দিয়ে আনা হয়। দিনদিন অবস্থা অবনতির দিকে গেলে তাকে ১৭ অক্টোবর রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ঘটনার পর কোন জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের কেউ আসেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
প্রাণীটির আক্রমণের শিকার মো. রাব্বী শেখের মা রুমি বেগম (২৭) বলেন, অচেনা এই প্রাণীর আক্রমণে পার্শ্ববর্তী গ্রামের এক ব্যক্তি মারা গেছেন। আমার ছেলেও আক্রমণে আহত হয়েছে। এখন আতঙ্কে আছি, যদি কিছু হয়ে যায়। একই আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেন অন্যান্য আহত ব্যক্তিরাও।
তালুক কেঁওয়াবাড়ী গ্রামের সাইদুর রহমান বলেন, প্রাণীটি হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলকে আক্রমণ করে না। আক্রমণ করে শুধু নিরীহ মানুষ ও কুকুরকে। আমার বাড়ির দুইটি কুকুরের ঘাড়ে আক্রমণ করে। পরে সে স্থানে ঘা সৃষ্টি হয়। গত ১৫ অক্টোবর কুকুর দুটি মারা যায়। প্রাণীটির ভয়ে সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতেও ভয় পাচ্ছেন অনেকে। অনেকে আবার সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসছেন, ছুটির পর আবার সাথে করে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। মানুষ দিনের বেলাতেও চলাচল করতে ভয় পাচ্ছে। লাঠি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে হরিণাবাড়ী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মো. রাকিব হোসেন বলেন, এটা কোন ধরনের প্রাণী তা বলা মুশকিল। কেননা, অনেকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছেন এটিকে। আমরা স্থানীয়দের সতর্ক থাকতে বলছি।
জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মাছুদার রহমান সরকার জানান, খাদ্যের অভাব ও বন উজাড় হওয়ায় প্রাণীটি লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে।
গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মতিন বলেন, এ বিষয়ে বন বিভাগকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তাদের পরামর্শে যদি কোন বিশেষজ্ঞকে আনার প্রয়োজন হয়, আমরা সে উদ্যোগও নেব। অচেনা প্রাণীর আক্রমণ থেকে গ্রামবাসীকে রক্ষায় গ্রামপুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে ইতোমধ্যে জরুরি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।