বিয়ের পর মনোয়ারা যখন স্বামীর ঘর ছাড়েন তখন তিনি দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আর কোলে আঠারো মাসের সন্তান। এরপর প্রায় অর্ধশতাব্দী কেটে গেছে। কঠিন সংগ্রাম করে কোনোমতে টিকে আছেন।
ধানের মৌসুমে ধান কুড়ানো, মুড়ির মৌসুমে মুড়ি ভাজার কাজ, শালুক তুলে বিক্রি—টিকে থাকতে আরো কত কি-ই না করেছেন তিনি।
ছেলেরাও বড় হয়ে ফেলে গেছে মাকে। সর্বশেষ বন্যা দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে মনোয়ারার ছোট্ট ঘরটি। লড়তে লড়তে এবার যেন অসহায় আত্মসমর্পণের পালা মনোয়ারার। দুঃখগাথা কথা বলতে গেলেই এখন কান্নায় মিইয়ে আসে তাঁর গলা।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের ঘোড়ামারা গ্রামে থাকেন মনোয়ারা। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া সামান্য জমিটুকু তাঁর একমাত্র সম্বল। মনোয়ারার দুঃখের খবর গ্রামের কারোরই অজানা নয়। তাই বাড়ি খুঁজে পেতে সময় লাগে না। তাঁর ছোট্ট ঘর দেখলে কবি জসীমউদ্দীনের ‘আসমানী’ কবিতার লাইনগুলো মনে পড়ে যাবে যে কারো। ভাঙা ঘরটি পুরোপুরি বিধ্বস্ত করে দিয়েছে বন্যা। তবু তিনি প্লাস্টিকের চালের বস্তা কুড়িয়ে তাতে জোড়াতালি দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছেন।
ঘরের ঠিকানায় সহজে পৌঁছা গেলেও মনোয়ারার সন্ধান পেতে খানিকটা বেগ পেতে হয়। তবে গ্রামের লোকজন দ্রুতই তাঁকে খুঁজে নিয়ে আসে। পুরো নাম কী সেটা মনোয়ারা নিজেও জানেন না। বার দুয়েক জিজ্ঞাসা করলে খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বলেন, ‘মনোয়ারাই তো, আর কোনো নাম নাই। ’ বয়সও জানেন না। বললেন, ‘আইডি কার্ডে তো পঞ্চান্ন। ’ পাশ থেকে আরেক মহিলা বললেন, ‘আরো বেশি হবে।’ টানা জীবন সংগ্রামে ভেঙে যাওয়া শরীর বলে মনোয়ারার বয়স ষাটের ঘর পেরিয়েছে অনেক আগেই।
কেমন আছেন এমন প্রশ্নে মনোয়ারার জবাব, ‘বন্যায় ঘরদোর যা আছিল, নিছেগা। দুইডা ধান জমাইয়া রাখছিলাম। বন্যায় লইয়া গেছে। কোনতা (কিছু) নাই। খালি জানডা নিয়া কোনো মতে আরেক বাড়িত গিয়া উঠছিলাম। ’ ঘর বন্যায় ভেঙে গেছে, থাকেন কোথায় এমন প্রশ্নে বললেন, ‘আমার চাচাতো ভাইয়ের ভাতিজার ঘরের নাতির বাসায় থাকি।’ পরিবারে আর কে আছে এমন প্রশ্নে মুহূর্তে চোখের কোণে পানি জমে, ‘আমি এখলাই (একাই)। আমার কেউ নাই। দুইডা ছেলে আছিল। একটা অনেক আগেই ফালাইয়া থইয়া গেছেগি। আরেকটা প্রতিবন্ধী। হেও দূরে থাকে। আল্লাহ ছাড়া আমার কেউ নাই।’
মনোয়ারা বলেন, ‘এর হের কাছ তাকি আনিয়া খাই। কোনো সময় ইটা-হিটা খুঁজিয়া বিক্রি করিয়া পঞ্চাশ-ষাট টাকা পাই। ইতা দিয়া (এসব দিয়ে) কোনো মতে চলার চেষ্টা করি।’ এ রকম নানাভাবে আয় করে চলার চেষ্টা প্রতিনিয়ত করতে হয় তাঁকে। তিনি বর্ণনা দিলেন, ‘বাড়িত কোনো সময় উরি (শিম) গাছ লাগাইয়া, কদু (লাউ) গাছ লাগাই। ইটিন বেচিয়া (এসব বিক্রি করে) চলি।’ ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তাঁর, বললেন ‘৩০০ টাকার কার্ড দিছে। মেম্বারে কুছতা (কিছুই) দেয় না। ৩০০ টাকা আরেকজনের কাছ তাকি ধার নিয়া কার্ড দিয়া ৩০ কেজি চাউল তুলি। এর মাঝে ১৫ কেজি নিজে খাই আর বাকি ১৫ কেজি বিক্রি করিয়া অন্য খরচের টাকা জোগাড় করি। একা তো। অত চাউল লাগে না।’
স্বামী কোথায় এমন প্রশ্নে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন মনোয়ারা। তারপর চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘আমার জীবনটা একটা কিচ্চা (গল্প)। হাছন রাজার কিচ্চা। জামাই (স্বামী) থাকতেই একটা ছেলেরে আঠারো মাসের কোলে নিয়া আর আরেকটা ছেলের দুই মাসের পেটে নিয়া বাপের বাড়ি আইছলাম। বাপে আর যাইতে দিছইন না।’ তিনি জানান, বাবার বাড়িতে আসার পরই তিনি অনটনে পড়ে যান। বাবা যত দিন ছিলেন মেয়েকে কিছুটা দেখভাল করার চেষ্টা করেছেন। মাথা গোঁজার সামান্য যে জায়গা ওটা বাবাই দিয়েছেন তাঁকে। কিন্তু পুরোটা জীবনই তাঁকে কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। ছেলেরা খোঁজ নেয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পুতাইন পালছিলাম অকারণে। এরা নিজরারে লইয়াই ব্যস্ত। আমার খোঁজ কেউ লয় না।’ ঈদ প্রসঙ্গে তিনি বললেন, ‘ঈদ আমার জীবন তাকি হারাই গেছে বহু বছর আগে। কেউ যদি পেট ভইরা খাইতে দেয়, ইটাই আমার ঈদ।’ কালের কণ্ঠ