ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শুক্রবার ২৬ জুন ২০২৬ ১২ আষাঢ় ১৪৩৩
বিএসসি ও ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের দ্বন্দ্ব কী নিয়ে; কোন দাবিতে তারা আন্দোলনে?
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Thursday, 28 August, 2025, 1:39 PM
সর্বশেষ আপডেট: Thursday, 28 August, 2025, 1:43 PM

বিএসসি ও ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের দ্বন্দ্ব কী নিয়ে; কোন দাবিতে তারা আন্দোলনে?

বিএসসি ও ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের দ্বন্দ্ব কী নিয়ে; কোন দাবিতে তারা আন্দোলনে?

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বুয়েট) আরও কয়েকটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা অভিমুখী লংমার্চকে কেন্দ্র করে বুধবার (২৭ আগস্ট) রাজধানীতে লংকাকাণ্ড ঘটে গেছে। শিক্ষার্থীদের আটকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও জলকামান ব্যবহার করেছে। আহত হয়েছেন অনেক শিক্ষার্থী। আইনশৃঙ্খখলা বাহিনীর সদস্যরাও আহত হয়েছেন শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধে। প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনে পৌঁছানো যায়, এমন সব সড়ক বন্ধ ছিল কয়েক ঘণ্টা। আবার প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ের সামনের সড়কেও প্রবেশ বন্ধ রাখে পুলিশ। এতে শহরে ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়। নগরবাসীকে তীব্র গরমে যানজটে আটকে থেকে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে। অন্যদিকে এই আন্দোলন চট্টগ্রামসহ অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়েছে। 

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকৌশল পেশায় বিএসসি ডিগ্রিধারী ও ডিপ্লোমাধারীদের পেশাগত দাবির যৌক্তিকতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানকে প্রধান করে ৮ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে সরকার। তবে এই কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছেন বুয়েটসহ অন্যান্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তিন দফা দাবিতে দেশের সব প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে 'কমপ্লিট শাটডাউন' কর্মসূচিও পালন করছেন তারা। 

বিএসসি ডিগ্রিধারী ও ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী প্রকৌশলীদের এই দ্বন্দ্ব নতুন নয়। গত বছর সরকার পরিবর্তনের পরে বিএসসি ডিগ্রিধারী প্রকৌশলীরা 'প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলন' কর্মসূচির আওতায় বারবার এসব দাবি তুলেছেন। তারা এর আগে প্রধান উপদেষ্টাসহ সরকারের অন্যান্য দপ্তরপ্রধানদের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাদের সাথে এ নিয়ে কোনো পক্ষ আলোচনার আগ্রহ দেখায়নি।

কিন্তু ঘটনা নতুন মোড় নেয় গত সোমবার। রংপুরে নেসকোর (নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি) একজন সহকারী প্রকৌশলী ও বুয়েটের তড়িৎকৌশল বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী রোকনুজ্জামানকে বেশ কয়েকজন ডিল্পোমা প্রকৌশলী হেনস্তা করেন। অভিযোগ রয়েছে, ডিপ্লোমা প্রকৌশলারা তাকে হত্যার হুমকি দেন। এরপর বুয়েটের শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদে ও নিজেদের দাবি আদায়ে রাজধানীর শাহবাগে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া বুয়েটের কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, তাদের অনেকেই পাশ করে বের হওয়ার পর বেকার বসে রয়েছেন। চাকরির সুযোগ পাচ্ছেন না। অথচ উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে তাদের আবেদনের সুযোগ নেই। আবার যেসব পদে তাদের নিয়োগের সুযোগ রয়েছে, সেখানে পর্যাপ্ত নিয়োগ হচ্ছে না।

বুয়েটসহ অন্যান্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেসব দাবি নিয়ে আন্দোলন করছেন

১. ইঞ্জিনিয়ারিং ৯ম গ্রেড বা সহকারী প্রকৌশলী বা সমমান পদে প্রবেশের জন্য সবাইকে নিয়োগ পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হতে হবে এবং ন্যূনতম বিএসসি ডিগ্রিধারী হতে হবে। কোটার মাধ্যমে কোনো পদোন্নতি নয়, এমনকি অন্য নামে সমমান পদ তৈরি করেও পদোন্নতি দেয়া যাবে না।

২. টেকনিক্যাল ১০ম গ্রেড বা উপ-সহকারী প্রকৌশলী বা সমমান পদের নিয়োগ পরীক্ষা ডিপ্লোমা ও বিএসসি ডিগ্রিধারী উভয়ের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।

৩. ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি ছাড়া প্রকৌশলী পদবি ব্যবহারকারীদের বিষয়ে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। নন-অ্যাক্রিডেট বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সগুলোকে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আইইবি-বিএইটিই অ্যাক্রিডেশনের আওতায় আনতে হবে।

তাদের ভাষায়, 'ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীরা প্রকৌশলী হতে পারেন না। ইঞ্জিনিয়ার ট্যাগ শুধুমাত্র বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য বরাদ্দ থাকতে হবে।'

ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের দাবি কী

এদিকে বুধবার ৭ দফা দাবিতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র-শিক্ষক পেশাজীবীরা। এই সংগঠনটি এক সপ্তাহ আগে ২০ আগস্টও একই দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানব বন্ধন করেন।

তাদের অন্যতম দাবি হলো:

১. ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য সংরক্ষিত উপ-সহকারী প্রকৌশলী বা সমমান পদ সংরক্ষণ।

২. ১৯৭৮ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপনের আলোকে উপ-সহকারী প্রকৌশলী বা সমমান পদ থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি ৫০ শতাংশে উন্নীত করা।

৩. প্রকৌশল কর্মক্ষেত্র ফিল্ড ও ডেস্ক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিভাজনপূর্বক ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার ও ডেস্ক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের নিযুক্তকরণ।

এর বাইরে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের আরও চারটি দাবি রয়েছে।

সমস্যা কোথায়

এই দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করে জানা গেছে, শিক্ষাগত যোগ্যতার পার্থক্য, চাকরি পাওয়া ও চাকরির পরে পদোন্নতির সুযোগ নিয়ে এই দুই ধরনের প্রকৌশলীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে।

বুয়েটসহ অন্যান্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলছেন, তারা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে প্রতিযোগিতামুলক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ৬ বছর লেখাপড়া করে পাশ করার পর বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারের স্বীকৃতি পান। তাদের কারিকুলাম, পঠন পদ্ধতি সবই আন্তর্জাতিক প্রকৌশল মানের। ফলে চার বছরের ডিপ্লোমা পড়াশোনা করে এসে কেউ তাদের মতো প্রকৌশলী দাবি করবেন, এটা তারা চান না। আর সরকারি চাকরির ১০ম গ্রেডের পদ উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের পাশাপাশি তাদের নিয়োগেরও সুযোগ উন্মুক্ত করা হোক। আবার দশম গ্রেড থেকে পদোন্নতিতে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জন্য সরকার যে কোটা রেখেছে, সেটি তুলে দিয়ে পরীক্ষার মাধ্যমে পদোন্নতি দেওয়া হোক।

অন্যদিকে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা বলছেন, 'ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার' শব্দটি রাষ্ট্রের ব্যবহার করা, এটি তাদের সৃষ্টি নয়। কারা কোন স্তরের লেখাপড়া শেষ করে ডিপ্লোমা পড়বেন, সেটিও সরকার ঠিক করে। রাষ্ট্রে কারিগরি শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে সরকার এসব নিয়ম করেছে এবং তাদের কারিকুলাম ঠিক করেছে। চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রেও সরকার যোগ্যতা নির্ধারণ করেছে। এক্ষেত্রে অন্য একটি কারিকুলামে পড়া শিক্ষার্থীদের আপত্তির কারণ নেই।

ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা বলেন, ১৯৭৮ সালে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য 'উপ-সহকারী প্রকৌশলী/সমমান'পদ নির্ধারণ করে এবং উপ-সহকারী প্রকৌশলী থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতিতে ৩৩ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করে। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য নির্ধারিত 'উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদটি ১০ম গ্রেডে উন্নীত করে দ্বিতীয় শ্রেণি পদমর্যাদা দেওয়া হয়।

কারা বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার

দেশে উচ্চতর প্রকৌশল বিদ্যা অর্জনের জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পাঁচটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে—বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট)। প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষাদান ও গবেষণার জন্য বিশেষায়িত।

এর বাইরে দেশে বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। যেমন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউব), আহ্ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, আহ্ছানিয়া মিশন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি। এছাড়া কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে প্রকৌশল অনুষদ। প্রায় ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের অনুষদ আছে বলে জানান শিক্ষার্থীরা।

এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করা শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ভর্তি হয়ে ৬ বছর লেখাপড়া করে অনার্স ও মাস্টার্সের সমমানের প্রকৌশল ডিগ্রি অর্জন করেন।

কারা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার

ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হলেন তারা, যারা স্বীকৃত পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট বা কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এই শিক্ষা মূলত একটি চার বছর মেয়াদি কারিগরি কোর্স যা তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরি করে। বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোতে এই কোর্স সম্পন্ন করা যায়। যেকোনো শাখায় এসএসসি বা মাধ্যমিক পাশ করে এই পর্যায়ে ভর্তি হওয়া যায়।

ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পর তারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হতে পারেন। তবে এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় দেশে কম। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ানিং পাশ করার পর ভর্তির সুযোগ রয়েছে। 

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status