|
রাজনীতির ‘ধারেকাছে না থাকা’ তরুণেরা কী কারণে বাস পোড়াতে গেলেন?
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() রাজনীতির ‘ধারেকাছে না থাকা’ তরুণেরা কী কারণে বাস পোড়াতে গেলেন? তাদের দাবি, একই ঘটনায় পালাতে গিয়ে তুরাগ নদে পড়ে নিহত তরুণও কখনো কোনো দল করেনি। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা না থাকা ঢাকার ফ্ল্যাটবাড়ির গণ্ডিতে বেড়ে ওঠা এই তরুণেরা রাতে কেন বাস পোড়াতে গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের দাবি, আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের স্থানীয় এক নেতা তাদের ‘পার্টি করার’ অর্থ দিতে চেয়েছিলেন, সেই ‘প্রলোভনে’ পড়েই এই তরুণেরা মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে গিয়েছিলেন বাসে আগুন দিতে। জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিচারের রায় ঘনিয়ে আসায় ১০ থেকে ১৩ নভেম্বর বিক্ষোভ ও ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি দেয় কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকা আওয়ামী লীগ। এই কর্মসূচি ঘিরে সোমবার থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাসে-ট্রেনে আগুন দেওয়া ও হাতবোমার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে শাহআলী থানাধীন মিরপুর বেড়িবাঁধ সড়কের পাশে রাখা একটি বাসে আগুন দেওয়ার সময় স্থানীয় লোকজন ধাওয়া দিলে তুরাগ নদে পড়ে মারা যান আব্দুল্লাহ আল সাইয়াফ (১৮) নামে এক তরুণ। এ সময় ধরা পড়েন রুদ্র মোহাম্মদ নাহিয়ান আমির সানি (১৮) নামে আরেক তরুণ। তাদের সঙ্গে থাকা আরেকজন পালিয়ে যায়। নিহত সাইয়াফ মিরপুরের নেভাল একাডেমি কলেজে উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে (বাণিজ্য বিভাগ) পড়তেন। আর গ্রেপ্তার হওয়া সানি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল একাডেমিয়ার শিক্ষার্থী। শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে সাইয়াফের বাবাসহ স্বজনেরা জড়ো হয়েছিলেন ময়নাতদন্তের পর লাশ বুঝে নিতে। সাইয়াফের বাবা মো. আলমগীরের ছোট বাটন ফোনটাতে বারবার ফোন আসছিল। একই কথা বলছিলেন তিনি, “আমার পুতে নাই, মাগরিবের টাইমে ওর এক বন্ধু আইসা ডাইকা নিয়া গেল। রাইতে পুলিশ ফোন কইরা কয়, পুতে আমার হাসপাতালে। আইসা দেখি, পুতে আমার নাই।” আলমগীর বলেন, বিকালে যখন তিনি মাগরিবের নামাজ পড়তে বের হচ্ছিলেন তখন বাড়ির নিচতলার গ্যারেজে সাইয়াফের একজন বন্ধুকে দেখেছিলেন যে সাইয়াফকে ডাকতে এসেছিল। রাত ৮টার দিকে মায়ের সঙ্গে কথা হয় সাইয়াফের। তখন মাকে বলেছিলেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসায় আসবেন তিনি। এর ১৫ মিনিট পরে ফোন দিয়ে আর সাইয়াফকে পাওয়া যায়নি। রাত ১টার দিকে একজন পুলিশ কর্মকর্তা সাইয়াফের মায়ের ফোনে ফোন দিয়ে জানায় ছেলে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আছেন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে এসে ছেলের লাশ পেয়েছেন তিনি। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সাইয়াফ যুক্ত ছিলেন না দাবি করে মর্গে উপস্থিত পরিবারটির একজন ঘনিষ্ঠ স্বজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, গত ২০ বছরের বেশি সময় ধরে সাইয়াফের বাবারা মিরপুরেই থাকেন। এখানে তাদের নিজেদের বাড়ি। এখানেই সাইয়াফের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়। এসএসসিতে ‘গোল্ডেন’ এ প্লাস পেয়েছেন। তিনি বলছিলেন, ছেলে যাতে পড়াশোনায় ভালো করে সেজন্য সেই ছোটবেলা থেকে সাইয়াফের বাবা-মায়ের চেষ্টার অন্ত নেই। স্কুল-কোচিং সারাদিন ছোটাছুটি। সাইয়াফ যে প্রতিষ্ঠানে পড়তেন তাদেরও রয়েছে শৃঙ্খলার কড়াকড়ি। এমন পরিবেশে, এই বয়সে সাইয়াফের পক্ষে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে মনে করেন তাদের ওই স্বজন। তিনি বলেন, “গ্যাঞ্জাম হচ্ছে দেখে বৃহস্পতিবার সারাদিন সাইয়াফ বাসাতেই ছিল। বিকালে বাসায় এসে তারই এক বন্ধু তাকে ডেকে নিয়ে যায়। ওর বাবা তখন মাগরিবের নামাজ পড়তে বের হচ্ছিল। ওই ছেলেটি একসময় সাইয়াফদের ওই ভবনের ছিল, এখন অন্য ভবনে থাকে।” ওই স্বজন বলেন, “এদের পেছনে এলাকার এক নেতা আছে বলে এলাকায় বলাবলি চলতেছে। পুলিশ এখন খুঁজে দেখুক। আমরা চাই সুষ্ঠু বিচার হোক। এই ছেলের জন্য ওর বাবা-মা যে কষ্ট করছে… এরকম একটা ছেলে কীভাবে এই পাল্লায় পড়ল তার তদন্ত হওয়া দরকার।” আর গ্রেপ্তার হওয়া রুদ্র মোহাম্মদ নাহিয়ান আমির সানিকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে পুলিশ বলছে, এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের স্থানীয় এক নেতার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। ‘পার্টি করার টাকা দেওয়ার’ লোভ দেখিয়ে তরুণদের এই কাজে যুক্ত করেছেন ওই নেতা। পুলিশের দারুস সালাম জোনের সহকরী কমিশনার ইমদাদ হোসেন বিপুল বলছেন, “স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতা ওদের ‘প্রভোক’ করছে। ওদের বলছে, একটা যদি বাস পোড়ানোর ভিডিও ফুটেজ আনতে পারো, তাহলে তোমাদের একটা অ্যামাউন্ট (পাঁচ হাজার টাকা) দিয়ে দেব। রাতে পার্টি করতে পারবে।” গ্রেপ্তার হওয়া রুদ্র মোহাম্মদের বাবা পোশাক ব্যবসা করতেন, এখন কবিতা লিখেন। রাজধানীর একাডেমিয়া নামের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের মাধ্যমিক (ও লেবেল) শ্রেণিতে পড়ে। একই স্কুলের উচ্চমাধ্যমিক (এ লেবেল) শ্রেণিতে পড়ে তার বড় ভাই। এই স্কুলের মাধ্যমিক থেকে ওপরের ক্লাসগুলোতে মাসিক বেতন কম করে হলেও ১২ হাজার টাকা, এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীর কোচিং বা প্রাইভেট টিউশনের জন্য অভিভাবকদের খরচ করতে হয় আরও ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। বেশ স্বচ্ছল না হলে এরকম প্রতিষ্ঠানের খরচ চালানো কঠিন পরিবারের পক্ষে। এরকম একটি পরিবারের সন্তান শুধু ‘পার্টি করার’ জন্য বাস পোড়াতে গেল, এমন প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের সহকারী কমিশনার ইমদাদ হোসেনও জিজ্ঞাসাবাদে এরকম তথ্য পেয়ে কিছুটা অবাক হওয়ার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, “জাস্ট একটা পার্টির জন্য ওটা করতে গেল, আমরা জিজ্ঞাসা করেছিলাম। ওরা বলেছে, ওই যে সেখানে ড্রিংকস-ট্রিংকসের ব্যবস্থা থাকবে।” নিহত সাইয়াফের এক স্বজন বলছেন, “এই ছেলেদের বাবা-মায়েরা যথেষ্ট স্বচ্ছল। ছেলেরা পার্টি করার টাকার জন্য এরকম করবে, এটাও মেনে নেওয়ার মতো না। তবে ওদের এখনো অনেক কিছু বোঝার ক্ষমতা হয়নি। “এখনি আমরা কিছু বলছি না। আমরা চাই পুলিশ খুঁজে বের করুক, ওদের কে সেখানে নিয়ে গেল।” এক দশক আগে ইংরেজি মাধ্যম পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে উগ্রবাদে দীক্ষিত হওয়ার কিছু প্রবণতার কথা জানায় পুলিশ। সেই সময় পুলিশের অভিযানগুলোতে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া এবং ঢাকার স্বচ্ছল পরিবারের বেশ কিছু তরুণ নিহত হন, গ্রেপ্তারও হন। সেই সময় ঢাকায় উগ্রবাদ নিয়ে কাজ করেছিলেন সাংবাদিক মুক্তাদীর রশীদ রোমিও। সেই সময়কার প্রবণতার সঙ্গে এই তরুণদের কোনো মিল আছে কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি বলছি, ‘না’। সেই সময় তাদের যুক্ততা তৈরি হয়েছিল একটা আদর্শকে কেন্দ্র করে। আদর্শিক একটা ব্যাপার ছিল তাদের মধ্যে। আমরা তাদের আদর্শিক জায়গা সঠিক না বেঠিক সে আলোচনা করতে পারি। “কিন্তু বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার হওয়া এবং নিহত তরুণের বিষয়ে পুলিশ যা বলছে তাতে কোনো আদর্শিক বিষয় নেই বলে মনে হচ্ছে। এদের বিষয়ে আরও খোঁজ-খবর নেওয়ার প্রয়োজন আছে।” |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
