|
সাকিব আল হাসানকে ফেরানো - বিসিবির আন্তরিক উদ্যোগ নাকি 'পাবলিসিটি স্টান্ট'
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() সাকিব আল হাসানকে ফেরানো - বিসিবির আন্তরিক উদ্যোগ নাকি 'পাবলিসিটি স্টান্ট' ২০২৪ সালের অক্টোবরে ভারতের বিপক্ষে কানপুর টেস্টের পরে আর বাংলাদেশের হয়ে মাঠে নামতে পারেননি সাকিব। নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে ও সংবাদমাধ্যমে সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের দেওয়া বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে উঠে এসেছে, মূলত রাজনৈতিক কারণেই তাকে দলে ডাকা হচ্ছে না। এরই মাঝে অকস্মাৎ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত অনেককেই অবাক করেছে। সেটিও এসেছে এমন এক সময়ে যেদিন বাংলাদেশ ক্রিকেট দল আনুষ্ঠানিকভাবে ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া টি-২০ বিশ্বকাপ খেলা থেকে বিরত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার একদম হুট করেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রায় আট ঘণ্টা ব্যাপী এক সভার পরে রাত প্রায় ১০টার দিকে এক সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা এসেছে। কোন প্রেক্ষিতে দলে ঢুকতে পারেন সাকিব? বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের মিডিয়া কমিটির প্রধান আমজাদ হোসেন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, "সাকিবের এভেইলেবিলিটি, ফিটনেস ও সংশ্লিষ্ট ভেন্যুতে উপস্থিত থাকার সক্ষমতা থাকলে ভবিষ্যতে তাঁকে দলে নেওয়ার বিষয়টি বোর্ড ও নির্বাচক প্যানেল বিবেচনা করবে।" আমজাদ হোসেন জানান, "জাতীয় দলে ফেরার ব্যাপারে সাকিবের আগ্রহের কথাও বোর্ডকে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে হোম ও অ্যাওয়ে দুই ধরনের সিরিজে খেলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং সাকিব জানিয়েছেন, উভয় ক্ষেত্রেই তিনি এভেইলেবল থাকতে চান।" বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়, সাকিবের সঙ্গে আলোচনা করেই এই অবস্থানে আসা হয়েছে। পরিস্থিতি, সময়সূচি ও ভেন্যু বিবেচনায় রেখে ভবিষ্যতে তাঁর অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে বাস্তব পরিস্থিতি ও নির্বাচকদের মূল্যায়নের ওপর। এখনও রাজনৈতিক বিবেচনা রয়েছে সাকিব আল হাসান ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হয়ে যাওয়া বিতর্কিত নির্বাচনে মাগুরা-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। মনোনয়নপত্র নেওয়ার পর থেকেই সাকিব আল হাসানের দিকে সমালোচনার আঙ্গুল উঠতে শুরু করে। মূলত প্রশ্ন ওঠে একজন রানিং ক্রিকেটার সংসদ সদস্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হয়ে দুই দিকেই সামলাতে পারবেন কি না। একই সাথে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের আমলের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তো ছিলোই, তার সাথে যুক্ত হয়েছে জুলাই আন্দোলনের ঘটনায় সাকিব আল হাসানের 'নির্লিপ্ত থাকার দায়'। ২০২৪ সালের জুলাই অগাস্টে হয়ে যাওয়া ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় সাকিব আল হাসান ছিলেন কানাডায়, তিনি আগেই কানাডার একটি টি-টোয়েন্টি লীগে নাম লিখিয়েছিলেন। সারা দেশব্যাপী সংকটময় সময়ে সাকিব আল হাসানের স্ত্রী উম্মে আল হাসান শিশির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্টে লিখেছিলেন, 'টরন্টোতে একটি সুন্দর দিন কাটালাম'। যেখানে দেখা যাচ্ছিল সাকিব হাস্যোজ্জ্বল এবং সময়টা উপভোগ করছেন, বিষয়টি ভালোভাবে নেননি সেই সময়কার আন্দোলনে থাকা ছাত্রদের অনেকেই। সেই পোষ্টের পরে সাকিব আল হাসানের প্রতি ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। অভ্যুত্থানের পর আরও অনেকের মতোই সাকিবের নাম জড়িয়ে যায় হত্যা মামলায়। এছাড়া শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায়ও আছে সাকিবের বিরুদ্ধে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরেও সাকিব আল হাসান বিদেশের মাটিতে পাকিস্তান ও ভারতের বিপক্ষে দলে ছিলেন। তবে সমস্যা শুরু হয় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দেশের মাটিতে সিরিজের সময়। অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মিরপুর টেস্ট দিয়ে অবসর নেওয়ার ঘোষণা দিলেও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক ও বিক্ষোভের কারণে দেশে ফেরা হয়নি তাঁর। সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, যদি সাকিব আল হাসান দেশে ফিরলে জনরোষের শিকার হন সেক্ষেত্রে সরকারের কিছু করার নেই। সেই সময় দলের সঙ্গে যোগ দিতে দুবাই হয়ে ঢাকায় ফেরার পথে সরকারের অনুমতি না পাওয়ায় মাঝপথ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যেতে হয় তাঁকে। পরবর্তীতে সাকিব আল হাসান ও সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে বাদানুবাদ বাংলাদেশের গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আসিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, সাকিব আল হাসান যাতে বাংলাদেশের জার্সি গায়ে আর খেলতে না পারেন সেই নির্দেশনা দেয়া হবে। বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিনে একটি ছবি পোষ্ট করে লিখেছেন, "শুভ জন্মদিন আপা"। তখন তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে লিখেন, "একজনকে পুনর্বাসন না করায় সহস্র গালি খেয়েছি। আমি নির্বাচন করেছিলাম, রাজনীতিতে লিপ্ত হইনি।" আসিফ মাহমুদের পোস্টের পর সাকিবও ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি লেখেন, "শেষমেশ কেউ একজন স্বীকার করে নিলেন, তাঁর জন্যই আমার আর বাংলাদেশের জার্সি গায়ে দেওয়া হলো না, বাংলাদেশকে খেলতে পারছিলাম না!" এমনিতেই সাকিব আল হাসান তার ক্যারিয়ার জুড়ে নানা ধরনের বিতর্ক তৈরি করেছেন, মাঠে ও মাঠের বাইরে। কখনো মারমুখী অবস্থায় দেখা গেছে, কখনো টিভি ক্যামেরায় অসঙ্গত অঙ্গভঙ্গি করে শাস্তি পেয়েছেন। এছাড়া নিজের কাঁকড়া ব্যবসা ক্ষেত্রে কর্মীদের বেতন না দেয়া থেকে শুরু করে শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারির মতো অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সাকিবের বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে হত্যা মামলা ও দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদকের মামলাও আছে, যদিও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাকিব আল হাসান ছিলেন দুদকের শুভেচ্ছাদূত। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কেটেছে? বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সম্প্রতি জানিয়েছে, দল নির্বাচন প্রক্রিয়ায় তাকে আবারও বিবেচনায় রাখা হবে এবং জাতীয় দলে ফেরার দরজা খোলা রয়েছে। এমনকি তাকে কেন্দ্রীয় চুক্তির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। বিসিবির এই ইতিবাচক অবস্থানের পরও সাকিবের ফেরাকে ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটছে না। এই বিষয়ে বিসিবির মিডিয়া কমিটির প্রধান আমজাদ হোসেন বলেন, "সাকিবের রাজনৈতিক বিষয়টি সরকার দেখবে, বিসিবির এখতিয়ার নয়''। তবে সরকার না চাইলে পরিস্থিতি বদলাবে কি না, এ নিয়ে বিসিবি স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। তার মানে সাকিব আল হাসানের জন্য ২০২৪ সালে যেমন প্রশ্ন ছিল, এখনও প্রশ্নটা রাজনৈতিকই। বিসিবির পরিচালক আসিফ আকবরের বক্তব্যেই সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট। তিনি জানিয়েছেন, সাকিব দেশের বাইরে যাওয়ার ইচ্ছার কথা বোর্ডকে জানিয়েছেন এবং এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে সরকার পরিবর্তন হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আসিফ আকবর বলেন, বর্তমান সরকার যদি বিষয়টিতে সম্মতি দেয়, তাহলে সাকিবের ফেরায় সমস্যা নেই। কিন্তু নতুন সরকার এসে ভিন্ন অবস্থান নিলে বিসিবির কিছু করার থাকবে না। তবে ঠিক এই ইস্যুতেই বিসিবির পরিচালক আসিফ আকবরের ভিন্ন বক্তব্য ছিল কয়েক মাস আগেও। সেই সময় তিনি বলেছিলেন, সাকিব আল হাসান যদি অনুশোচনা করেন, ক্ষমা চান, তাহলে তিনি দলে ফিরতে পারেন। সেই সময় তিনি বলেছিলেন সাকিব আল হাসানের দলে ফেরার কোনও সম্ভাবনা দেখেন না তিনি। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আসিফ আকবর বলেছিলেন, "সাকিব যদি অনুশোচনাহীন থাকে, তবে আমি সম্ভাবনা দেখি না বাংলাদেশের হয়ে ক্রিকেট খেলার। বর্তমান অ্যাটিটিউডে সেভাবে থাকলে আমি নিজেও চাইব না সাকিব খেলুক।" ক্রিকেট বোর্ডের 'পাবলিসিটি স্টান্ট'? বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতেই সাকিব আল হাসানের ইস্যু সামনে নিয়ে এসেছে। সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোরের ক্রীড়া বিভাগের প্রধান আরিফুল ইসলাম রনি মনে করেন, ক্রিকেট বোর্ড এখন স্মরণকালের সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় আছে। ক্রিকেটীয় কূটনীতিতে হেরে আইসিসির ভোটাভুটিতে হেরেও বিসিবি ঘোষণা দিয়েছে আইসিসির সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে। কোনও আইনি লড়াইয়ে যাবে না। এমন সময়ে দেশের ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার ও সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ডকে বিসিবি ইচ্ছা করে সামনে এনেছে বলেই মনে করছেন রনি। এটাকে ক্রিকেট বোর্ডের একরকম 'পাবলিসিটি স্টান্ট' মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এদিকে ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাঝহারুল ইসলাম বলেন, "এই ক্রিকেট বোর্ড কিছুদিন আগেই সংবাদ সম্মেলনে সাকিব আল হাসানের নাম এলে প্রশ্ন এড়িয়ে যেতো। এখন নিজেরাই সাকিবের ইস্যু নিয়ে এসে কথা বলছেন।" ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের পরে সাকিব আল হাসানের নাম লেখা ব্যানার বা প্ল্যাকার্ড লেখাও মাঠে নিয়ে ঢুকতে পারেননি দর্শক- এমন ঘটনাও ঘটেছে। বাঁধা দিয়েছেন প্রশাসন ও পুলিশ, এবং তাদের প্রশ্ন করা হলে উত্তর এসেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড থেকেই এমনটা বলা হয়েছে। ফলে বিসিবির বর্তমান অবস্থানকে বেশ রহস্যময় বলে বর্ণনা করছেন মাঝহারুল ইসলাম। কারণ সাকিব আল হাসান নিজেই সম্প্রতি এক পডকাস্টে জানিয়েছিলেন তিনি তিন ফরম্যাটে আর একটি সিরিজ খেলে অবসরে যেতে চান। সেক্ষেত্রে অবসরে যেতে চাওয়া একজন ক্রিকেটারকে নিয়ে কেনো কেন্দ্রীয় চুক্তির কথা ভাবা হচ্ছে সেটাও একটা প্রশ্ন, বলছেন ইসলাম। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
