ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শনিবার ২০ জুন ২০২৬ ৬ আষাঢ় ১৪৩৩
দিল্লির শিশু বাজার: ছেলে ৮ লাখ, মেয়ে বিক্রি হয় চার লাখে
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Saturday, 20 June, 2026, 8:39 PM

 ভারতের রাজধানী শহর দিল্লিতে চক্রটি এভাবে রীতিমতো একটি শিশু বাজার গড়ে তুলেছিল।  ছবি: ফেসবুক

ভারতের রাজধানী শহর দিল্লিতে চক্রটি এভাবে রীতিমতো একটি শিশু বাজার গড়ে তুলেছিল। ছবি: ফেসবুক

রাজস্থানে জন্ম নেওয়া এক সদ্যজাত শিশুকে পাচার করে দিল্লিতে আনা হয় এবং এরপর হরিয়ানায় অন্য এক দম্পতির কাছে কয়েক লাখ টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়। আর এর সব কিছু ঘটে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে। একটি শিশুর জীবন ও ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়ে যায় বাবা-মায়ের দুর্দশা আর অপরাধীদের লোভের কাছে।

দিল্লি পুলিশ এমনই একটি শিশু পাচারকারী চক্রকে আটক করেছে, যারা অসচ্ছল দম্পতিদের কাছ থেকে মাত্র চার-পাঁচ দিনের নবজাতকদের সংগ্রহ করে রাজধানী শহরে সন্তানহীন দম্পতিদের কাছে কয়েক লাখ টাকায় বিক্রি করত।

চক্রটি এভাবে রীতিমতো একটি শিশু বাজার গড়ে তুলেছিল। সেই বাজারে একটা মেয়ে শিশু বিক্রি হতো তিন থেকে চার লাখ টাকায়। আর ছেলে শিশু ছয় থেকে আট লাখ টাকায়।
 
কীভাবে চক্রটি ধরা পড়ল

মধ্য দিল্লির পাহাড়গঞ্জের এক বাসিন্দার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের অভিযান শুরু হয়। ওই বাসিন্দা লক্ষ্য করেন, এক নারী নিয়মিতভাবে এলাকায় আসছেন এবং প্রতিবারই তার কোলে আলাদা আলাদা শিশু।
 
পুলিশ এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ দেখে এবং গোয়েন্দা তথ্য সক্রিয় করে তদন্ত শুরু করে। কয়েকদিনের অনুসরণের পর পুলিশ ওই নারীর ওপর নজরদারি করে। তদন্তে জানা যায়, জ্যোতি ওরফে কমলেশ নামে ওই নারী শিশু পাচারের সঙ্গে জড়িত।
 
ছদ্মবেশে অভিযান
 
পুলিশ কমলেশের সঙ্গে একটি ক্রয়-চুক্তির অজুহাতে যোগাযোগ করে। একজন মহিলা পুলিশ অফিসার ছদ্মবেশে ক্রেতা সেজে শিশু কিনতে চান। বৈঠকের তারিখ ঠিক হয় এবং দামদর হয়। ‘টোকেন অ্যামাউন্ট’ হিসেবে ২০ হাজার টাকা ঠিক হয়। ৫ জুন কমলেশ ছদ্মবেশী পুলিশের কাছে এক নবজাতককে হস্তান্তর করার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রেফতার হয়।
 
তার জিজ্ঞাসাবাদ থেকে পুলিশ হতবাক হয়ে যায় এবং তদন্ত চালিয়ে একটি বহুরাজ্যীয় চক্রের সন্ধান পায়। এই চক্র রাজস্থান ও গুজরাটের দরিদ্র দম্পতিদের কাছ থেকে শিশু কিনত বা চুরি করত এবং মধ্যপ্রদেশ ও হরিয়ানায় সন্তানহীন দম্পতিদের কাছে বিক্রি করত।
 
কমলেশকে নিরবচ্ছিন্ন জিজ্ঞাসাবাদের ফলে পুলিশ তার দুই সহযোগী শালু ও ললিতের সন্ধান পায়। পরে প্রতিভা ও বিপিনেরও সন্ধান মেলে, যারা শিশু সংগ্রহ এবং বিক্রির চুক্তি করার কাজে জড়িত ছিল। 
 
প্রতিভা ও বিপিনকে ধরা হয় যখন তারা শিশু সংগ্রহকারীর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন। পুলিশ তাদের কাছ থেকে প্রায় ৩ লাখ টাকা উদ্ধার করে। দুই সপ্তাহের নিরবচ্ছিন্ন জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ পাঁচটি এমন শিশু উদ্ধার করে, যাদের সবার বয়স এক মাসেরও কম।
 
এখন পুলিশের সামনে বড় প্রশ্নগুলো দাঁড়িয়েছে: এই শিশুরা কোথা থেকে আসছে? কে তাদের সোর্স করছে? রাজধানীতে তাদের কোথায় রাখা হতো? এবং তাদের কাদের কাছে বিক্রি করা হতো?
 
পাচারের হটস্পট হাসপাতাল

গ্রেফতার আসামিদের কয়েকদিনের জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ পশ্চিম দিল্লির একটি হাসপাতালের সন্ধান পায়। রোহিনীর বেগমপুরে অবস্থিত হিরার মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল। এই হাসপাতাল পুরো চক্রের ‘নার্ভ সেন্টার’ হিসেবে বেরিয়ে এসেছে এবং এর মালিক ডা. বিবেকী হলেন এর মূল চালিকাশক্তি।
 
সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্টের ডিসিপি রোহিত রাজবীর সিং জানান, পাচারকারীরা শিশুদের ডা. বিবেকীর হাসপাতালে রাখত যতক্ষণ না তাদের সন্তানহীন দম্পতিদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
 
ডা. বিবেকী এই পুরো চক্রের মূল চালিকাশক্তি। তিনি শিশুদের সংক্রান্ত নথিপত্র জাল করতে সাহায্য করতেন। জন্ম সনদ, ডেলিভারি ডকুমেন্ট, ইনভয়েস — সবকিছু তার হাসপাতালে জালিয়াতি করে তৈরি করা হতো, যাতে মনে হয় শিশুরা এখানেই জন্মেছে, সিং যোগ করেন।
 
নবজাতকের দাম

পুলিশের তদন্তে দেখা গেছে, একটি মেয়ে শিশুকে প্রায় এক লাখ টাকায় সংগ্রহ করে তিন থেকে চার লাখ টাকায় বিক্রি করা হতো। অন্যদিকে, একটি ছেলে শিশুকে প্রায় দুই লাখ টাকায় কিনে ছয় থেকে আট লাখ টাকায় বিক্রি করা হতো।
 
ডিসিপি সিং জানান, এসব চুক্তি ডা. বিবেকীর হাসপাতালেই সম্পন্ন হতো। তিনি শিশু কিনতে আগ্রহী দম্পতি এবং পাচারকারীদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতেন।
 
সরবরাহের উৎস
 
আটক ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ গুজরাটের সাবরকান্থা থেকে সাবাভাই গামার ওরফে কালিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ জানায়, উদয়পুরের বাসিন্দা গামার রাজস্থানের পালি এবং সাবরকান্থার অসচ্ছল দম্পতিদের কাছ থেকে নবজাতক ‘কিনে’ দিল্লির ডা. বিবেকীর হাসপাতালের মাধ্যমে সন্তানহীন দম্পতিদের কাছে বিক্রি করতেন।
 
পুলিশ উদ্ধার হওয়া শিশুদের জৈবিক বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে, যাতে বোঝা যায় তারা স্বেচ্ছায় শিশু বিক্রি করেছেন, জোর করে বাধ্য করা হয়েছে, নাকি শিশুদের চুরি করা হয়েছে। ডিসিপি সিং বলেন, যদি পরিবারগুলো স্বেচ্ছায় পাচারকারীদের কাছে শিশু বিক্রি করে থাকেন, তাহলে তাদেরকেও মামলায় অভিযুক্ত করা হবে।
 
তদন্তে জানা গেছে, গামার ও তার চক্র গত এক বছরে অন্তত ৩০টি নবজাতক পাচার করেছে। এসব শিশু মধ্যপ্রদেশ ও হরিয়ানার দম্পতিদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।
 
পুলিশ হরিয়ানার পানিপথ থেকে সানি অরোরা ও রিতু অরোরা দম্পতিকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করেছে। মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়র থেকেও এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যারা এই চক্রের কাছ থেকে শিশু কিনেছিলেন। পুলিশ বলছে, এই পরিবারগুলোকেও মামলায় অভিযুক্ত করা হবে।
 
যমজ সাজিয়ে ৯ লাখে বিক্রি 

ডিসিপি সিং একটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে বলেন, চক্রটি এক দম্পতিকে প্রতারণা করেছিল যারা ছেলে শিশু চেয়েছিলেন। সে সময় চক্রের কাছে একটি ‘অতিরিক্ত’ মেয়ে শিশু ছিল, যা দ্রুত বিক্রি করতে চাইছিল।
 
তারা ওই দম্পতির কাছে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে শিশুকে যমজ সাজিয়ে মোট নয় লাখ টাকায় বিক্রি করে। আসলে শিশু দুটি যমজ ছিল না এবং ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে আনা হয়েছিল।
 
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে কমলেশ ও প্রতিভা আগেও শিশু পাচার মামলায় জড়িত ছিলেন। প্রতিভা হিরার মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল এবং অন্যান্য ল্যাবে ল্যাব টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করতেন। পুলিশের মতে, তিনিই ডা. বিবেকীর হাসপাতাল এবং পাচার সিন্ডিকেটের মধ্যে যোগসূত্র ছিলেন।  
 
আরেক আসামি অম্বতি গুরুগ্রামে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন এবং শিশু সংগ্রহ নেটওয়ার্কের সদস্য ছিলেন। ডিসিপি সিং বিশেষভাবে তিনজন মহিলা পুলিশ কর্মকর্তা — সাব-ইন্সপেক্টর প্রগতি, যামিনী এবং হেড কনস্টেবল সুষমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, যাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় এই চক্র ভাঙা সম্ভব হয়েছে।
 
উদ্ধার হওয়া শিশুরা 
 
উদ্ধার হওয়া পাঁচটি শিশুকে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি (সিডব্লিউসি)-র কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে তারা সিডব্লিউসি’র পালনা কেন্দ্রে রয়েছে। 
 
যত্ন ও সুরক্ষার প্রয়োজনে থাকা শিশু দের কল্যাণের একমাত্র সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে সিডব্লিউসি কাজ করে। এটি উদ্ধারকৃত শিশুদের আশ্রয় নিশ্চিত করে এবং তাদের বিশেষ দত্তক সংস্থা, শিশু গৃহে রাখা অথবা আইনত দত্তকের জন্য মুক্ত ঘোষণা করার ব্যবস্থা করে।
 
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status