ট্রান্সফরমার বিকল, ৬ দিন ধরে অন্ধকারে জামে মসজিদসহ ১২ পরিবার
মোঃ আল আমিন আকন, বাউফল
প্রকাশ: Monday, 28 September, 2026, 3:44 PM
ট্রান্সফরমার বিকল, ৬ দিন ধরে অন্ধকারে জামে মসজিদসহ ১২ পরিবার
বিদ্যুৎহীনতায় চরম দুর্ভোগ, পড়াশোনা ও ইবাদতে ব্যাঘাত; ২৯ হাজার টাকা জরিমানার দাবিতে ক্ষোভ বাউফলে ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে প্রায় ছয় দিন ধরে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় মানবেতর দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন একটি কলোনির ১২টি পরিবার। একই ট্রান্সফরমারের আওতাধীন একটি জামে মসজিদেও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
এতে একদিকে যেমন মুসল্লিদের নামাজ ও ইবাদত-বন্দেগিতে সমস্যা হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বৃদ্ধ, শিক্ষার্থীসহ পরিবারের সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গত বৃহস্পতিবার সকালে হঠাৎ কলোনির ট্রান্সফরমারটি বিকল হয়ে যায়। এরপর থেকেই পুরো কলোনির বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। একদিন-দুইদিন নয়, প্রায় ছয় দিন ধরে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থাকার পরও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে চরম ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে ১২টি পরিবারের মধ্যে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিদ্যুৎ বর্তমানে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। রান্না, পানি সরবরাহ, মোবাইল ফোন চার্জ, ফ্যান, আলো, পড়াশোনা থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব কাজই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে টানা কয়েক দিন বিদ্যুৎ না থাকায় কলোনির বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে কলোনির জামে মসজিদে বিদ্যুৎ না থাকায় মুসল্লিদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। নামাজের সময় মসজিদে আলো ও বৈদ্যুতিক সুবিধা না থাকায় ইবাদত করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন মুসল্লিরা। একই সঙ্গে রাতে শিশু ও বৃদ্ধদেরও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
কলোনির বাসিন্দারা জানান, এখানে কয়েকজন প্রভাষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বসবাস করেন। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়াও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দিনের বেলায় প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ ছাড়া থাকা এবং রাতে পর্যাপ্ত আলো না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
অফিসে একাধিকবার গিয়েও সমাধান হয়নি
ভুক্তভোগীরা জানান, সমস্যা দেখা দেওয়ার পর তারা বাউফল পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করেন। এমনকি পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের ডিজিএমের কাছেও একাধিকবার গিয়ে দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনের অনুরোধ জানিয়েছেন তারা। কিন্তু অভিযোগ, একাধিকবার যোগাযোগের পরও এখন পর্যন্ত ট্রান্সফরমার প্রতিস্থাপন করা হয়নি।
ভুক্তভোগীদের দাবি, পল্লী বিদ্যুৎ অফিস থেকে জানানো হয়েছে, কলোনিতে ওভারলোডের কারণে ট্রান্সফরমারটি বিকল হয়েছে। এ কারণে তাদের কাছে ২৯ হাজার টাকা জরিমানা দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
তাদের আরও দাবি, ওই টাকা পরিশোধ করা হলে দ্রুত ট্রান্সফরমার প্রতিস্থাপন করা হবে বলে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এমনকি টাকা সকালে পরিশোধ করলে বিকেলের মধ্যেই ট্রান্সফরমার প্রতিস্থাপনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলেও জানান ভুক্তভোগীরা।
‘দোষ যদি ওভারলোডের হয়, দায় কার?’
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের প্রশ্ন, একটি ট্রান্সফরমার কেন বারবার ওভারলোডের ঝুঁকিতে পড়বে এবং সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব কী? ট্রান্সফরমারের সক্ষমতা অনুযায়ী সংযোগ ও লোড ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
তাদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকার কারণে ক্ষতির মুখে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। অথচ দ্রুত সমস্যার সমাধান না করে উল্টো মোটা অঙ্কের জরিমানার কথা বলা হচ্ছে। তাদের ভাষায়, বিদ্যুৎ না পেয়ে একদিকে দুর্ভোগ, অন্যদিকে জরিমানার চাপ, সব মিলিয়ে তারা দ্বিমুখী সংকটে পড়েছেন।
ভুক্তভোগীরা আরও বলেন, ট্রান্সফরমার বিকল হওয়ার প্রকৃত কারণ কী, সেটি নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। যদি সত্যিই ওভারলোডের কারণে ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে থাকে, তাহলে ওভারলোডের কারণ নির্ধারণ, লোড ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শুধু জরিমানা আদায় করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
দ্রুত সমাধান চায় ১২ পরিবার
প্রায় ছয় দিন ধরে বিদ্যুৎহীন থাকা পরিবারগুলো দ্রুত ট্রান্সফরমার প্রতিস্থাপন করে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে ২৯ হাজার টাকা জরিমানার দাবির ভিত্তি, হিসাব ও আইনগত যৌক্তিকতা স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছে তারা।
তাদের প্রশ্ন, একটি ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে গেলে একটি জামে মসজিদসহ ১২টি পরিবারকে দিনের পর দিন বিদ্যুৎহীন থাকতে হবে কেন? জরুরি ভিত্তিতে মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনা করে বিকল্প ব্যবস্থা করা সম্ভব কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ভুক্তভোগীদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ট্রান্সফরমার প্রতিস্থাপন করবে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করবে। পাশাপাশি ২৯ হাজার টাকা জরিমানার দাবির বিষয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করা হবে।
টানা ছয় দিন বিদ্যুৎহীন থাকা ১২ পরিবার ও একটি জামে মসজিদের এই দুর্ভোগ আর কতদিন চলবে, এখন সেটিই ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন।