ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শুক্রবার ১৯ জুন ২০২৬ ৪ আষাঢ় ১৪৩৩
ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি: আতিউরসহ ৬৪ জন ও প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করে দেওয়া হচ্ছে অভিযোগপত্র
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Thursday, 18 June, 2026, 3:19 PM

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

প্রায় এক দশকের দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (চার্জশিট) পেশ করতে যাচ্ছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম এই আর্থিক জালিয়াতির ঘটনায় দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে মোট ৬৪ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে।

অভিযুক্তদের এই তালিকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমানসহ ১০ জন বাংলাদেশি নাগরিকের নাম রয়েছে।

এছাড়াও ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, চীন, জাপান, ভারত ও উত্তর কোরিয়ার বেশ কিছু ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানকে এই মামলার আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মামলাটির তদন্তের দায়িত্বে থাকা সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন জানান, আমাদের পক্ষ থেকে তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ শেষ হয়েছে এবং এতে কোনো ঘাটতি রাখা হয়নি। আশা করছি খুব দ্রুতই এটি আদালতে দাখিল করতে পারব।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ইতোমধ্যে অভিযোগপত্রের একটি খসড়া তৈরি করে আইনি পর্যালোচনার জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।

পেছনের ঘটনা কী?

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক লেনদেন মাধ্যম সুইফটের অপব্যবহার করে ৩৫টি জালিয়াতিপূর্ণ বার্তা পাঠানোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে (ফেড) রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়।

এর মধ্যে একটি বার্তার মাধ্যমে শ্রীলঙ্কার একটি ভুয়া অলাভজনক সংস্থার (এনজিও) অ্যাকাউন্টে ২০ মিলিয়ন ডলার স্থানান্তরের চেষ্টা করা হলেও, বানানের ভুল নজরে আসায় শেষ মুহূর্তে সেই অর্থ ছাড় আটকে যায়।

তবে অবশিষ্ট চারটি বার্তার মাধ্যমে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের মাকাতি শহরের রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকের (আরসিবিসি) জুপিটার স্ট্রিট শাখায় ভুয়া নথিপত্র দিয়ে খোলা চারটি ব্যাংক হিসাবে পাচার করা হয়।

খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সেই অর্থ ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়া হয় এবং ফিলরেম মানি রেমিট্যান্স এজেন্সির সহায়তায় স্থানীয় মুদ্রা পেসোতে রূপান্তর করে তিনটি ক্যাসিনোতে খালাস করা হয়।

পরবর্তীতে একটি ক্যাসিনোর মালিকের কাছ থেকে দেড় কোটি ডলার উদ্ধার করে বাংলাদেশ সরকারের কোষাগারে ফেরত আনা সম্ভব হলেও, বাকি অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়ায় তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। জুয়ার টেবিলে হাতবদল হতে হতে সেই বিপুল পরিমাণ অর্থ শেষ পর্যন্ত কোথায় বিলীন হয়েছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।

এই অর্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে বর্তমানে নিউ ইয়র্কের আদালতে আরসিবিসির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি আইনি লড়াই চলছে। সেখানে অর্থ পাচার, জালিয়াতি, তহবিল চুরি, আত্মসাৎ এবং এসব অপরাধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করার মতো গুরুতর সব অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, রিজার্ভের টাকা চুরির এই মিশনে আসামিরা নাম না জানা ‘উত্তর কোরীয় হ্যাকারদের’ চক্রকে ব্যবহার করেছিল। ‘নেস্টেগ’ ও ‘ম্যাকট্রাক’ এর মতো ক্ষতিকারক ম্যালওয়্যার পাঠিয়ে হ্যাকাররা প্রথমে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট নেটওয়ার্কে অনধিকার প্রবেশ করে। এরপর নিউ ইয়র্ক ফেড থেকে সেই অর্থ সরিয়ে নিউ ইয়র্ক ও ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টগুলোতে পাঠানো হয়।

ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এই সাইবার চুরির ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। তবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এই নজিরবিহীন জালিয়াতির খবর জানতে পারে ঘটনার প্রায় এক মাস পর, ফিলিপাইনের একটি সংবাদপত্রের রিপোর্টের মাধ্যমে।

গুরুতর এই ঘটনাটি গোপন রাখার দায়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান নিজের পদ থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন; পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল আনা হয়।

পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের তৎকালীন যুগ্ম পরিচালক জুবায়ের বিন হুদা ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ মতিঝিল থানায় একটি এজাহার দায়ের করেন। তবে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ এবং তথ্য ও প্রযুক্তি আইনে রুজু হওয়া সেই মামলায় প্রাথমিকভাবে সুনির্দিষ্টভাবে কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি।

শুরু থেকেই সিআইডি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই মামলার তদন্ত চালিয়ে আসছে। সর্বশেষ গত ১৮ মে এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা ৯৫ বারের মতো পিছিয়েছে আদালত। সেদিন বিজ্ঞ আদালত আগামী ২ জুলাই প্রতিবেদন দাখিলের নতুন দিন ধার্য করে দেয়।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর গত বছরের জানুয়ারিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই সংবেদনশীল মামলার তদন্তভার নিজেদের হাতে নিতে সিআইডিকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছিল। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তদন্তের দায়িত্ব হস্তান্তরে সম্মতি না দেওয়ায়, শেষ পর্যন্ত সিআইডির পক্ষ থেকেই এই ঐতিহাসিক মামলার চূড়ান্ত চার্জশিট দেওয়া হচ্ছে।

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, সুদীর্ঘ অনুসন্ধানের পর এই অভিযোগপত্র তৈরিতে ডিজিটাল ফরেনসিক রিপোর্ট, ফিলিপাইনের এমএলএআর, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই-এর প্রতিবেদন, জাপান ও ভারতের পরামর্শ, শ্রীলঙ্কা থেকে অর্থ ফেরত পাওয়ার আইনি নথি, সুইফটের তথ্য-উপাত্ত, তদন্তের বিস্তারিত তথ্যপ্রমাণ ও ১৬১ ধারায় রেকর্ড করা জবানবন্দি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে।

প্রায় দশ হাজার পৃষ্ঠার মামলার ডকেট ও খসড়া অভিযোগপত্রে আসামিদের অপরাধের সপক্ষে বিপুল পরিমাণ তথ্যপ্রমাণ সংযুক্ত করা হয়েছে।

সিআইডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, খসড়া অভিযোগপত্রটি প্রস্তুত করার পর গত মার্চেই চূড়ান্ত আইনি মতামতের জন্য তা অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরে পাঠানো হয়। সেখান থেকে অনুমোদন পেয়ে ফেরত আসলেই তা দ্রুত আদালতে পেশ করা হবে। এছাড়া যদি নতুন কোনো আইনি নির্দেশনা আসে, তবে সে অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

অভিযোগপত্রে যেসব বাংলাদেশির নাম থাকছে

তদন্তকারী দলের প্রতিবেদনে তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমানের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া এবং অপরাধের আলামত নষ্ট করার চেষ্টার মতো অভিযোগ আনা হয়েছে।

এছাড়া তৎকালীন ইনস্টিটিউট অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সভাপতি আনিস এ খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মহাব্যবস্থাপক কে এম আবদুল ওয়াদুদ, সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক রেজাউল করিম, তৎকালীন উপমহাব্যবস্থাপক মেজবাউল হক, সাবেক নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা, ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের সাবেক উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা, ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম, ডিপার্টমেন্ট অব কারেন্সি ম্যানেজমেন্টের মহাব্যবস্থাপক মো. সুলতান মাসুদ আহম্মেদ এবং গভর্নর সচিবালয়ের মহাব্যবস্থাপক এ এফ এম আসাদুজ্জামানের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ফিলিপাইনের যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অভিযুক্ত

রিজার্ভ চুরির এই বৈশ্বিক ষড়যন্ত্রে ফিলিপাইনের নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নাম এসেছে কাম সিন ওং, মায়া সান্তোস দেগুইতো, রাউল ভিক্টর বি তান, ব্রিজিট আর কাপিনা, নেস্তর ও পিনেদা, রোমুয়ালদো এস আগারাডো, অ্যাঞ্জেলা রুথ এস টরেস, লোরেঞ্জো তান, মিস ন্যান্সি, জাও কিওগ, ডেনিস সি ব্যানকোড, ইসমায়েল আর রেইস, সাবিনো এম ইকো, লিজেন্ড জে রাসেলা, রিচার্ড ইনসাইন, উইলিয়াম সোঁ গো (প্রয়াত), সালুদ রেইস বাউতিস্তা শেবা, মিশেল বাউতিস্তা কনকন, অ্যান্টনি এ পেলেজো, জন ইউ, লুইস ফাব্রেগাস খো, ম্যান পো চান, মিং ই সাইমন সি, রোজালিও পরানতা তান্দুয়ান, এনরিকে কে রাজোন, টমাস আরাসি, জোসে এডুয়ার্ডো জে আলারিলা, ক্রিশ্চিয়ান আর গনজালেস, ডোনাটো সি আলমেইদা এবং ফ্লিন্ট রিচার্ডসনের।

প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকায় রয়েছে আরসিবিসি (রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন), ফিলরেম সার্ভিস করপোরেশন, সেঞ্চুরিটেক্স ট্রেডিং, আব্বা কারেন্সি এক্সচেঞ্জ ইনকরপোরেশন, বিকন কারেন্সি এক্সচেঞ্জ ইনকরপোরেশন, মাইডাস ক্যাসিনো এবং সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনো।

শ্রীলঙ্কার ৭ ব্যক্তি ও একটি সংস্থা

শ্রীলঙ্কার অভিযুক্ত নাগরিকদের তালিকায় রয়েছেন হেগোডা গামাগে শালিকা পেরেরা, ইমিয়াগে ডন মিউরিন রানাসিংহে, রামানায়েক আরাচ্চিге ডন প্রদীপ রোহিত দামকিন, булুগাহা আরামবেগেদারা সাঞ্জিবা তিসা বান্দারা, ওয়েরাপুলি মুহান্দিরামге প্রিয়াঙ্কা জয়দেব, লুয়াইস হান্নাদিগে শিরানি ধম্মিকা ফার্নান্দো এবং নিশান্ত নলক ওয়ালাকুলু আরাচ্চি।

সেখানকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে নাম রয়েছে বিতর্কিত শালিকা ফাউন্ডেশনের।

এছাড়া ভারতীয় নাগরিক নীলাভান্নান মাদুক্কুর আনন্দন, প্রীতম রেড্ডি, সুধীন্দ্র আত্রেশ ও রাকেশ আস্তানা; উত্তর কোরিয়ার সাইবার অপরাধী পার্ক জিন হিয়োক ও হ্যাকার সংগঠন লাজারাস গ্রুপ; চীনের তিন নাগরিক ডিং ঝিজে, গাও শুহুয়া ও ওয়েইকাং জু এবং জাপানের নাগরিক সাসাকির নাম চূড়ান্ত অভিযোগপত্রে রাখা হচ্ছে।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status