রিকশাচালক থেকে যেভাবে ‘হ্যাকিং গুরু’ হয়ে ওঠেন ওহিদুল
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Wednesday, 23 September, 2026, 9:48 PM
রিকশাচালক থেকে যেভাবে ‘হ্যাকিং গুরু’ হয়ে ওঠেন ওহিদুল
মাদ্রাসায় হেফজ শেষ না করেই রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন ওহিদুল মোল্লা। তবে বেশি দিন এ পেশায় থাকেননি। জীবিকার তাগিদে শুরু করেন রিকশা চালানো। পাঁচ বছর আগে রিকশাচালকের পেশা ছেড়ে হ্যাকিং কার্যক্রম ও মাদক ব্যবসা শুরু করেন।
অল্প সময়ের ব্যবধানে ওহিদুলের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে একটি হ্যাকার চক্র। এলাকায় ‘হ্যাকিং গুরু’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ওহিদুল কয়েক বছরের ব্যবধানে বাড়ি–গাড়ির মালিক হন, গড়ে তোলেন মহিষ ও কবুতরের খামার।
ওহিদুলের এই উত্থানের গল্প বলছিলেন তাঁরই চাচাতো ভাই সেন্টু মোল্লা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে গ্রামের প্রধান সড়ক থেকে নিজের বাড়ি পর্যন্ত সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছিলেন ওহিদুল। গত সোমবার দিবাগত রাতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি লালপুর উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের মোহরকয়া গ্রামের প্রয়াত রব্বেল মোল্লার ছেলে।
ওহিদুলের গ্রেপ্তারের বিষয়টি এখন এলাকার মানুষের মুখে মুখে আলোচিত হচ্ছে। তাঁর উত্থানের গল্প জানতে গিয়ে আজ বুধবার তাঁর পরিবারের সদস্য, জনপ্রতিনিধি ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কথা হয়। তাঁর চাচাতো ভাই সেন্টু মোল্লা বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমানের সঙ্গে ওঠাবসা করেন। তিনি বলেন, ওহিদুলের বাবা কৃষিকাজ করতেন। বাবার জীবদ্দশায় শৈশবে ওহিদুল গ্রামের মাদ্রাসায় পড়তেন। বাবার মৃত্যুর পর হেফজ শেষ না করেই রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন।
সেন্টু মোল্লার ভাষ্য, কয়েক দিন পর রাজমিস্ত্রির সহকারীর কাজ ছেড়ে রিকশা চালানো শুরু করেন। এ সময় এলাকার হ্যাকারদের সঙ্গে তাঁর সখ্য তৈরি হয়। প্রায় পাঁচ বছর আগে তিনি রিকশা চালানো ছেড়ে দিয়ে হ্যাকিং কার্যক্রম শুরু করেন। অল্প দিনের মধ্যেই হয়ে ওঠেন একজন দক্ষ হ্যাকার। হু হু করে তাঁর সম্পদ বাড়তে শুরু করে। মোহরকয়ায় বাবার বাড়ি থাকলেও বিলমাড়িয়ায় পদ্মা নদীর ধারে পাকা বাড়ি করেছেন। তাঁর খামারে লাখ টাকা দামের কবুতর ও মহিষ আছে।
গ্রেপ্তার এড়াতে পুলিশের ওপর নজরদারি করার জন্য গ্রামের প্রধান সড়ক থেকে বাড়ি পর্যন্ত ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছিলেন ওহিদুল। কবুতরের ঘরের আড়ালে নিজের থাকার জন্য দামি আসবাব ব্যবহার করতেন। শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও সিসিটিভি মনিটর ছিল সেই কক্ষে।
এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, উঁচু ইটের প্রাচীরবেষ্টিত বাড়িতে ঢোকার ফটক একটাই। এ জন্য স্থানীয় লোকজন তেমন একটা যাতায়াত করেন না। তবে বিভিন্ন এলাকা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত তরুণদের যাতায়াত ছিল সেখানে।
নাম প্রকাশ না করে ওহিদুলের একজন প্রতিবেশী প্রথম আলোকে বলেন, বাড়ির আশপাশে এত সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, কবুতরচোর ঠেকানোর জন্য ক্যামেরা লাগিয়েছেন।
হ্যাকিং ও মাদক ব্যবসার কারণে অল্প সময়ে টাকাপয়সার মালিক হন ওহিদুল। তিনি দামি গাড়ি নিয়ে এলাকায় চলাফেরা করতেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে লালপুরে ভাড়ায় চালিত একটি প্রাইভেট কারের চালক বলেন, ওহিদুল গাড়ি ভাড়া নিয়ে পাবনা ও রাজশাহীতে যেতেন। কখনো কখনো সারা রাত গাড়িতে করে ঘুরে বেড়াতেন। দামদর করে জিনিস কিনতেন না। খাবার হোটেলের কর্মচারীদের হাজার হাজার টাকা বকশিশ দিতেন। ভাড়ার বাইরে তাঁদের ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা বকশিশ দিতেন।
ওহিদুল মোল্লা এলাকায় ‘হ্যাকিং গুরু’ হিসেবে পরিচিত বলে জানান লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, তাঁর কাছে শিখে অনেকেই এই কার্যক্রমে জড়িয়েছেন। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর কাছ থেকে ৬৮টি সিম পাওয়া গেছে। এসব সিম ও নম্বর হ্যাকিং কার্যক্রমে ব্যবহার করা হতো। তাঁকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে পুলিশ অন্যদের জানাতে চায়, লুকিয়ে থাকার কৌশল অবলম্বন করেও কেউ ছাড় পাবে না।