|
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কমবে, মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার শঙ্কা আইএমএফের
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি সংকট ও ঋণের বোঝায় বাড়ছে ঝুঁকি
সায়ীদ আবদুল মালিক, থাইল্যান্ড থেকে
|
![]() বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কমবে, মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার শঙ্কা আইএমএফের আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অক্টোবর ২০২৬-এর ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে এসব পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। ‘রেজিলিয়েন্স আন্ডার স্ট্রেইন, আর্জেন্ট চয়েসেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৭ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। ২০২৭ সালে তা কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো বেশি চাপে আইএমএফের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা সামলে এগোলেও সব দেশ সমানভাবে তা মোকাবিলা করতে পারছে না। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের সুবিধা পাওয়া দেশগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও জ্বালানি আমদানিনির্ভর এবং প্রযুক্তি খাতে কম সম্পৃক্ত দেশগুলো বেশি চাপে পড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব এখনো বিশ্ব অর্থনীতিতে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ, মজুত ব্যবহার এবং সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন পরিস্থিতি সামাল দিতে সহায়তা করেছে। এআই প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে ভূমিকা রাখছে। তবে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা জ্বালানি সরবরাহে নতুন বিঘ্ন ঘটলে দাম আরও বাড়তে পারে। এতে উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হবে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও বিনিময় হারের ওপর চাপ বাড়তে পারে। জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধি নিম্ন আয়ের দেশগুলোর সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। সংঘাত ও বাণিজ্য উত্তেজনায় বাড়ছে ঝুঁকি আইএমএফ সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চপর্যায়ে থাকতে পারে। জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, সাইবার আক্রমণ এবং চরম আবহাওয়াও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটিয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে। এ ছাড়া বাণিজ্য বিরোধ, শুল্ক বৃদ্ধি ও উৎপাদনব্যবস্থায় পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারি ঋণের উচ্চ বোঝাও অর্থনীতির অন্যতম ঝুঁকি। বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো খাতে অর্থের চাহিদা বাড়ায় সরকারগুলোর আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলায় তাদের হাতে থাকা অর্থের পরিমাণ সীমিত হয়ে পড়তে পারে। এআই বিনিয়োগে সম্ভাবনা, রয়েছে ঝুঁকিও এআই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করছে। প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবার বাণিজ্যও এর সুবিধা পাচ্ছে। তবে এআই খাতে অতিরিক্ত আশাবাদ ভবিষ্যতে আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ। এ খাতে বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা বা উৎপাদনশীলতা অর্জিত না হলে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। এতে শেয়ারবাজারে দরপতন ও আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। প্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোও এর প্রভাবের মুখে পড়তে পারে। তবে এআই বিনিয়োগ প্রত্যাশার চেয়ে বেশি স্থায়ী হলে এবং উৎপাদনশীলতা দ্রুত বাড়লে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ভর্তুকির পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার পরামর্শ জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় সবার জন্য ব্যাপক ভর্তুকির পরিবর্তে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সাময়িক, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির সময় বাজারদর কৃত্রিমভাবে কমিয়ে রাখার ব্যবস্থা নিতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার তুলনায় তিন থেকে ২২ গুণ পর্যন্ত বেশি সরকারি অর্থ ব্যয় হতে পারে। এতে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই মূল্যসংকেত বজায় রাখা, সরকারি অর্থের দক্ষ ব্যবহার এবং সংকটের সময় দ্রুত সম্প্রসারণযোগ্য সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। রাজস্ব ও জ্বালানি নিরাপত্তায় জোর আইএমএফের মতে, ঋণনির্ভর করছাড় স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে সরকারি রাজস্ব কমিয়ে অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলো এতে বেশি সমস্যায় পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে রাজস্ব আয় বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং সরকারি ঋণ টেকসই পর্যায়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও প্রতিটি দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলায় জ্বালানির উৎস বহুমুখী করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে আইএমএফ। একই সঙ্গে একক সরবরাহকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বাণিজ্যিক অংশীদার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সব দেশে উৎপাদন ফিরিয়ে নেওয়া বা আমদানি বন্ধ করে দেওয়া সংকটের কার্যকর সমাধান নয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে এবং নির্ভরতা আরও কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বরং বহুমুখী বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। সব মিলিয়ে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই বিশ্ব অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। আইএমএফের মতে, ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলায় সরকারি আর্থিক সক্ষমতা জোরদার করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোও জরুরি।
|
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |
