রাজশাহীতে প্রকাশ্যে ধূমপান করে তোপের মুখে তরুণী, ভিডিও ভাইরাল
এক উদ্যানে বসে আড্ডা দিচ্ছে আর ধূমপান করছে তরুণ-তরুণী। এ সময় তাদের লক্ষ্য করে এগিয়ে আসে শার্ট-প্যান্ট আর মাথায় টুপি পরা এক ব্যক্তি। তার পিছু নেয় আরও কয়েকজন। শুরু থেকেই মোবাইল ক্যামেরায় ভিডিও ধারণ করা হচ্ছিল। দ্রুতই আরও অনেক মানুষ জড়ো হয়।
অতঃপর সেই তরুণ-তরুণীকে উদ্দেশ করে টুপিওয়ালা সেই ব্যক্তির নেতৃত্বে শুরু হয় গালিগালাজ। প্রকাশ্যে ধূমপান করা তাদের কাছে সমস্যা নয়, সমস্যা হলো একজন মেয়ে ধুমপান করছে!
এমনই এক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। রাজশাহী নগরীর সিএন্ডবি মোড়ে সার্কিট হাউজের রাস্তার পাশে প্রকাশ্যে ধূমপান করে তোপের মুখে পড়েছেন এক তরুণী। রোববার (৬ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় এই ঘটনা ঘটেছে।
সিএন্ডবি মোড়ের পদ্মার পাড়ের সৌন্দের্যে গড়ে ওঠা রাস্তায় স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন মহলের মানুষ আসেন। কেউ হাঁটাহাটি করেন। সেখানে আছে ভ্রাম্যমাণ চা-নাস্তার দোকান। বিক্রি হয় পান-সিগারেটও। মফস্বল এলাকায় নারীর ঠোঁটে সিগারেট দেখে স্থানীয় কিছু মুরব্বি ও তরুণ সমাজের কিছু ব্যক্তিবর্গ প্রতিবাদ জানান। এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও সামাজিক প্রতিবাদের যে রীতিটি হারিয়ে যেতে বসেছিলো তা ফিরে আসায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন অনেকেই। তবে মাদক, সন্ত্রাস, ছিনতাই ও উঠতি বয়সী তরুণ বখাটেপনার ক্ষেত্রে এভাবে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে দেখা যায় না। এক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে অপরাধ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, তাদের নাজেহাল করার উদ্দেশ্যে ওই ঘটনার ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে ছাড়া হয়নি বরং ওই মহিলা যেন থানায় গিয়ে মিথ্যে অভিযোগ তাদের হয়রানি না করতে পারেন সে কারণেই করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
এই ভিডিওতে দেখা যায়, রাজশাহী সার্কিট হাউসের পাশের ফুটপাতে বসে ওই তরুণ-তরণী বসে ধূমপান করছিলেন। মেয়েটি শাড়ি ও ছেলেটি টিশার্ট-প্যান্ট পরা ছিলেন। তাদের দুজনের হাতেই সিগারেট ছিল। এ ঘটনা দেখে টুপিওয়ালা এক ব্যক্তি শুরু থেকেই তরুণীকে গালাগাল দিয়ে উদ্যান থেকে বেরিয়ে যেতে বলছিলেন। তার সঙ্গে অনেকেই তরুণী কেন ধূমপান করবে, প্রতিবাদ করছিলেন।
তরুণীকে প্রতিবাদ করতে দেখে তার রাগ আরও চড়ে যায়। তা ছাড়া পাশের লোকজনগুলো তাকে সমর্থন করে যাচ্ছিল। ভিডিও করতে দেখে ওই তরুণী ভাষ্য ছিল, ভিডিও করবেন? করেন। যা করতে পারেন করেন। আমি অপরাধ করছি না। এটা পাবলিক প্লেস। আপনি গলাবাজি করতে পারেন না। গলা উচু করে কথা বলতে পারেন না।
এ সময় ওই লোকটি অকথ্য ভাষায় কিছু শব্দ উচ্চারণ করেন। তার ভাষ্য ছিল, মেয়ে মানুষ পাবলিক প্লেসে বসে সিগারেট খাচ্ছেন, বাসায় কি এসব শিখিয়েছে। বিবেক নেই আপনাদের। আমাদের বিবেক আছে। তোরা বের হ এদিক থেকে। এভাবে দুপক্ষের তর্ক চলাকালীন কেউ একজন পেছন থেকে টুপি পরিহিত ব্যক্তিকে উদ্দেশ করে বলেন, এই আপনি কে? চুপ থাকেন। আপনি সিগারেট খাওয়া বন্ধ করতে বলতে পারেন না। আপনার সেই অধিকার নাই।
টুপি পরা ওই ব্যক্তি ফের কথা বলতে শুরু বরেন। তার ভাষ্য, আজকাল এই যে ধর্ষণ হচ্ছে, রাস্তাঘাটে মেয়েদের অপমান হচ্ছে, গায়ে হাত দিচ্ছে, এ সব কারণেই। আপনাদের মতো মেয়েদের কারণেই এমন হচ্ছে।
এ সময় কালো টি শার্ট পরিহিত ওই তরুণ তার সঙ্গীকে নিয়ে উদ্যান থেকে চলে যেতে ওঠেন। এ সময় লাল সোয়েটার পরিহিত এক ভদ্রলোক তাদের কাছে এসে চলে যেতে বলেন। তার ভাষ্য ছিল, মেয়েরা সিগারেট খাক বা নেশা করুক, গোপনে করে। প্রকাশ্যে করে না। আপনি এখান থেকে চলে যান। নাহলে আপনাকে সবাই খারাপ ভাবছে। ওই তরুণ-তরুণী চলে যেতে শুরু করলে ওই ব্যক্তিই আবার পেছন থেকে বলেন, ‘আপনার মতো মেয়েদের কারণেই আমাদের সমাজের মেয়েরা খারাপ হচ্ছে।’
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য পাওয়া যায়। অনেকে মনে করেন, ধূমপান করা কোনো অবস্থাতেই ঠিক নয়, কিন্তু এভাবে ধূমপানের জন্য কোনো নারী বা পুরুষকে হেয় করার সুযোগ নেই। আর ভিডিও করা আরো মারাত্মক অপরাধ।
ব্লগার নিঝুম মজুমদার লিখেছেন, ‘যেই মেয়েটা ধূমপান করছিলেন তাকে আমার যথেষ্ঠ সাহসী মনে হয়েছে। এত এত ঘিরে ধরা কাপুরুষ দেখেও মেয়েটা সাহস নিয়ে কথা বলেছে দেখে আমার ভালো লেগেছে।…মেয়েটা চলে আসা প্রথাতে একটা সজোরে লাথি মেরেছে দেখে আনন্দে মনটা ভরে গেলো। জয়টা মেয়েটার-ই হয়েছে।’
আরেকজন লেখেন, ‘সিগারেট শুধু নারীদের জন্য ক্ষতিকারক আর পুরুষদের জন্য ভালো- এটা তো জানতাম না!’
কেউ মনে করছেন, তরুণীকে ধুমপান করতে দেখে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালাগাল করে, ভিডিও করে সোশ্যাল সাইটে ছড়িয়ে দেওয়া চরম অসভত্যারই নামান্তর।