উত্তাল ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেগে ওঠা চরাঞ্চলে জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন গবাদিপশু পালন। কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার নদীবেষ্টিত তিন ইউনিয়নের চরাঞ্চলে হাজার হাজার পরিবার গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া পালন করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। অথচ পর্যাপ্ত সরকারি চিকিৎসাসেবার অভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছে তাদের কষ্টার্জিত এই প্রাণিসম্পদ। ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থায়ী কোনো ভেটেরিনারি চিকিৎসক বা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা না থাকায় পশু অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা পান না খামারিরা। ফলে অনেক সময় চিকিৎসার অভাবে পশুর মৃত্যুতে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন চরাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষ।
উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসের হিসাব অনুযায়ী, চরবেষ্টিত নয়ারহাট, অষ্টমীর চর ও চিলমারী ইউনিয়নে প্রায় ৯ হাজার ৬২৪টি পরিবার বসবাস করে। এসব পরিবারের কাছে রয়েছে প্রায় ২৯ হাজার ২৬০টি গরু-মহিষ, ২৮ হাজার ৯৭০টি ছাগল-ভেড়া এবং এক লাখ ১৪ হাজারের বেশি হাঁস-মুরগি। তবে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ বিভাগের দাবি, চরাঞ্চলে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি। বিপুলসংখ্যক প্রাণিসম্পদ থাকলেও চরাঞ্চলে স্থায়ীভাবে কোনো সরকারি পশু চিকিৎসাসেবা কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, চরাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই পাঁচ থেকে ১০টি পর্যন্ত গরু-মহিষ পালন করা হয়। কোনো পশু অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য তাদের মাইলের পর মাইল নদীপথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা সদরে যেতে হয়। বর্ষাকালে উত্তাল ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিয়ে অসুস্থ পশুকে সদরে নেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। রাতের বেলায় নৌযান না পাওয়া গেলে জরুরি চিকিৎসাসেবা নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। অনেক সময় উপজেলা সদরে নেওয়ার পথেই নৌকা বা ট্রলারের ওপর অসুস্থ পশুর মৃত্যু হয়।
চরের কড়াই বরিশাল গ্রামের খামারি জেল হক জোদ্দার বলেন, ‘গরু-ছাগল পাল্যাই আমাগো সংসার চলে। পশুডা অসুস্থ হইলে পাশে কোনো ডাক্তার পাই না। নৌকা ভাড়া কইরা সদরে নিতে নিতে পশুর অবস্থা শেষ হইয়া যায়। একটা গরু মরা মানে আমাগো সংসারের মেরুদণ্ড ভাইঙা পড়া।’
একই সংকটের কথা জানান খামারি জমির আলী। তিনি বলেন, বন্যা ও নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে কোনোভাবে পশু পালন করে সংসার চালান তারা। কিন্তু পশুর রোগবালাই দেখা দিলে চিকিৎসার অভাবে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
স্থানীয় খামারিরা জানান, সরকারি চিকিৎসক না থাকায় নিয়মিত টিকাদান, কৃমিনাশক প্রয়োগসহ রোগ প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় সেবা থেকেও অনেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন। বাধ্য হয়ে তারা স্থানীয় অনভিজ্ঞ ‘হাতুড়ে’ পশু চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। এতে ভুল চিকিৎসায় পশুর মৃত্যুর ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
কড়াই বরিশাল এলাকার খামারি আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমার ৯০ হাজার টাকা দামের গরুটার পেট ফুলে গিয়েছিল। নৌকা না পাওয়ায় সদরের পশু হাসপাতালে নিতে পারিনি। পরে চরের এক হাতুড়ে ডাক্তার চিকিৎসা দিলেও গরুটাকে বাঁচানো যায়নি। চরে যদি সরকারি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তার থাকতেন, তাহলে হয়তো এত বড় ক্ষতি হতো না।’
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কার্যালয়ে অনুমোদিত ১১টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন সাতজন। গুরুত্বপূর্ণ চারটি পদ শূন্য রয়েছে। জনবল সংকটের পাশাপাশি চরাঞ্চলের দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে সেখানে নিয়মিত প্রাণিসম্পদ সেবা পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, চরের মানুষের আয়ের প্রধান অবলম্বন গবাদিপশু অসুস্থ হলে তাদের দুর্ভোগের শেষ থাকে না। তাই দ্রুত ইউনিয়ন পর্যায়ে উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা পদায়ন করা প্রয়োজন। স্থায়ীভাবে চিকিৎসক নিয়োগ না দেওয়া পর্যন্ত বিশেষ নৌ ভেটেরিনারি মেডিকেল টিমের মাধ্যমে চরাঞ্চলের পশুর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. বীরেন্দ্রনাথ রায় বলেন, সীমিত জনবল নিয়েও চরাঞ্চলের মানুষের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিয়নে স্থায়ীভাবে প্রাণিসম্পদ বিভাগের জনবল পদায়ন এবং শূন্য পদগুলো পূরণ করা সম্ভব হলে চরাঞ্চলের পশু চিকিৎসাসেবার সংকট অনেকটাই কমে আসবে।